কাশগড় : কতো না অশ্রু জল বাংলা ইসলামিক বই ডাউনলোড ও রিভিউ

বাংলা ইসলামিক বই  রিভিউ   কাশগড় : কতো না অশ্রু জল 

২০১৭। এপ্রিলের শেষ।

দিনটা ছিল শুক্রবার। কাশগড়ের বিখ্যাত ঈদগাহ মসজিদ–অন্যান্য শুক্রবার লোকারণ্যে পরিণত হয়। এ শুক্রবার একটু অন্য রকম। মুয়াজ্জিন অন্তর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া সুরে সবাইকে আহ্বান জানায়নি–নামাযের দিকে এসো, কল্যাণের দিকে এসো। আর্মার্ড ক্যারিয়ারের ইঞ্জিনের গম্ভীর শব্দে থম মেরে আছে চারপাশ। একে একে আসছে ওরা প্রাগৈতিহাসিক দানবের মতো। টরেট থেকে উঁকি দিচ্ছে হেভি মেশিনগানের কুৎসিত চকচকে নল। সারিবেঁধে গিয়ে থামছে পিপলস স্কয়ারে।


বইটি কিনুনঃ Wafilife Kashgor Book


.
ছাদখোলা লরিতে বোঝাই হয়ে আসছে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত অগণিত সৈনিক। লাল এবং হলুদ প্রোপাগ্যান্ডা ব্যানার ধরে রেখেছে ওদের অনেকেই।
.
‘একতা, স্থিতিশীলতা আশীর্বাদ! বিচ্ছিন্নতাবাদ সমাজের জন্য অভিশাপ!’
একটা ব্যানারে বড় করে লেখা।
.
লাল কালিতে লেখা আরেক ব্যানার হুমকি দিচ্ছে,

‘জনগণের বিপক্ষে যাবার দুঃসাহস দেখানো সকল সন্ত্রাসীদের কচুকাটা করা হবে!’
.
অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো অতিথি যেন মিলিটারি মার্চে এসে ছন্দপতন ঘটাতে না পারে তাই ৫ লক্ষ অধিবাসীর এই শহর পুরোপুরি লকডাউন করে দিয়েছে পুলিশ। ‘আমরা প্রত্যেকটা রোড ব্লক করে রেখেছি’, আড়াআড়িভাবে ঝোলানো কারবাইনের ট্রিগারে আঙুল রেখে গর্বিত স্বরে জানাল এক পুলিশ। ঈদগাহ মসজিদের ঠিক বাইরেই ডিউটি পড়েছে ওর। তিন দিন আগে কাশগড়ের মতোই চাইনিয আর্মিকে মিলিটারি প্যারেড করতে দেখা গেছে পূর্ব তুর্কিস্তানের রাজধানী উরুমচিতে। মার্চ করতে করতে আর্মড ট্রুপস গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিয়েছে, ‘পার্টি এবং জনগণের জন্য সবকিছু উৎসর্গ করতে আমরা প্রস্তুত। দেশবাসী আপনারা নিশ্চিত থাকুন। ‘পিপলস লিবারেশন আর্মি’ এর প্রত্যেকটি সৈনিক শপথ করছে, সন্ত্রাসীদের নির্মূল করেই ছাড়ব আমরা। পালাবার পথ খুঁজে পাবে না সন্ত্রাসীরা।’
.
পূর্ব তুর্কিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের শহর আকসুতে মিলিটারি শোডাউন চলল তিনদিন ধরে। সংবাদপত্রে লেখা হলো, ‘হঠাৎ তীক্ষ্ণ স্বরে সাইরেন বাজল, চারপাশ থেকে তীব্র গতিতে ছুটে এল অসংখ্য আর্মার্ড ভেহিকল। মনে হলো খাপ থেকে যেন তলোয়ার টেনে বের করেছে কেউ।’
.
কাশগড় থেকে ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণের এক গ্রামে চৌরাস্তার মোড়ে ডিউটি দিচ্ছে মিলিশিয়ার এক সদস্য। খুব সতর্ক সে। যেকোনো সময় আক্রমণ এলে পাল্টা জবাব দিতে প্রস্তুত। পিপলস প্যারামিলিটারি আর্মড পুলিশের সবুজ, সাদা মিশেলের আর্মার্ড কার সাইরেন বাজাতে বাজাতে ছুটে গেল ওর পাশ দিয়ে। প্রাচীন সিল্ক রোডের আকর্ষণে পূর্ব তুর্কিস্তান এসেছিল ইউরোপিয়ান এক ট্যুরিস্ট। চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল সে। অজান্তেই মুখ থেকে বের হয়ে গেল, ‘এত রোড ব্লক এর আগে কখনো কোথাও দেখিনি আমি, তবে ইস্রাইলের হেবরনে মনে হয় এ রকম অবস্থা ছিল!’
.
আরও দক্ষিণে তাশকুরগানের রাস্তায় ডামি অস্ত্রের সাহায্যে বেসামরিক হান নারী-পুরুষদের প্রশিক্ষন দিচ্ছে পুলিশ। হাতেকলমে দেখিয়ে দিচ্ছে আততায়ীদের কীভাবে সংক্ষিপ্ততম সময়ে মাটিতে পেড়ে ফেলা যায়।
ওয়ান, টু, থ্রি... দাঁতমুখ খিঁচিয়ে রণহুংকার দিয়ে এক একজন নারী বা পুরুষ অসংখ্য কল্পিত শত্রুকে ‘খালাস’ করে দিচ্ছে হাতের ডামি অস্ত্র দিয়ে।
.
‘সবকিছু সীমার বাইরে চলে গেছে’, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে করুণ মুখে বলছিলেন স্থানীয় এক উইঘুর মুসলিম। ‘এত প্যারেড, এত ট্রেইনিং–এসব কিসের জন্য? হানরা আসলে কী চায়? যুদ্ধ শুরু করতে চায়?’ ,
.
ঠিক একই প্রশ্ন বোধহয় অনেকক্ষণ থেকেই আপনার মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে–পূর্ব তুর্কিস্তানে কী হচ্ছে এসব? কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাচ্ছে চীন?
.
রহস্য
কাশগড়: কতো-না অশ্রু জল

- Asif Adnan 


আজকে আমাদের বোনদের কাপড় কেটে নিচ্ছে চীনা কুকুররা। রোযা, নামায, হাজ্জ সব নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। কুরআন বিকৃত করছে। গোরস্থান ধুলোয় পরিণত করেছে। পাঁচ হাজার মসজিদ আজ নাস্তিক কমিউনিস্ট শুয়োররা মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। মসজিদগুলোকে পার্টি হাউস বানাচ্ছে। যেই মিনার থেকে তাওহিদের আহ্বান ভেসে আসত সেখানে কমিউনিস্টের নোংরা পতাকা উড়ছে।

এতকিছুর পরেও, এত ধ্বংস, এত মৃত্যু, এত রক্ত,

এত অশ্রু দেখেও আমরা চুপ করে আছি। কিছুই বলছি না!

সমস্যাটা কী আসলে আমাদের?

এতকিছুর পরেও কেন আমাদের শীতল রক্ত গরম হয় না? কেন আমরা সেই নেতাদের মুখ চেয়ে থাকি যাদের কাছে ইসলামের সামান্যতম মূল্য নেই? কেন আমরা সেই সব দরবারি আলিমদের মাথায় তুলে রাখি যারা ‘পেশাদার গিরগিটির’ মতো ক্ষণে ক্ষণে রং বদলে ফেলে?

আমরা আর কতকাল ঘুমিয়ে থাকব? আর কতকাল কাপুরুষতাকে হিকমাহ বানিয়ে নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন করব? এতকিছুর পরেও আমরা স্বপ্ন দেখি সরকারি চাকরি, বউ, বাড়ি-গাড়ি নিয়ে নির্ঝঞ্ঝাট, নির্ভাবনাময় একটা জীবনের! এতকিছুর পরেও আমরা ভাবি আল্লাহ আমাদের নিষ্ক্রিয়তার জন্য পাকড়াও করবেন না!

মসজিদে গিয়ে কয়েকটা ঢিপ মেরে, সপ্তাহান্তে হুজুরের ‘সকলেই দানের হাত বাড়িয়ে দিই’ ওয়াজ শুনে পকেট থেকে ৫ টাকার একটা কয়েন বের করে, খাদিম সাহেবের বাড়িয়ে দেওয়া দানবক্সে ফেলে দিয়েই জান্নাতে যাবার খোয়াব দেখি এতকিছুর পরেও?

ধোঁকাটা আমরা কাকে দিচ্ছি?

আসলেই কী আমরা রাসূলুল্লাহকে প্রাণের চাইতেও বেশি ভালোবাসি?
আসলেই আমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে বেশি ভালোবাসি? না ভালোবাসি ক্যারিয়ারকে?

নিজেকে বারবার প্রশ্ন করি, আমরা কাকে বেশি ভালোবাসি? আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে? নাকি টাকা-পয়সা, যশ-খ্যাতিকে?

নিজেকে প্রশ্ন করি, আমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বেশি ভালোবাসি? না ভালোবাসি বউ, সন্তান-সন্ততিকে? নিশ্চিত, নির্ভাবনাময়, প্যারাহীন একটা জীবনকে?

আমরা কী আসলেই মুসলমান হতে পেরেছি?

কাশগড়-কতো না অশ্রুজল বই থেকে নেওয়া। অশ্রুভেজা এই গল্প আমাদের মুসলিম উইঘুর ভাইবোনদের, সাম্রাজ্যবাদী নৃশংস জানোয়ার চীনের হাতে যাদের ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে প্রতিদিন। এনামুল হোসাইন ভাইয়ের লেখা আর আসিফ আদনান ভাইয়ের সম্পাদনা করা এই বইটি প্রকাশ করেছে ইলমহাউস পাবলিকেশন। বইটির নির্ধারিত মূল্য ২৬০ টাকা।

- Ilmhouse Publication


লেখকের কথা (দ্বিতীয় পর্ব) : কাশগড় : কতো না অশ্রু জল

- Enamul Hossain


হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়লেন বৃদ্ধা। ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছিলেন। সান্ত্বনা দেবার অনেক কথা মাথার মধ্যে ঘুরছিল বেনের। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বের হলো না। নীরব বেদনায় টনটন করে উঠল বুকটা। অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল ও।
.
দীর্ঘ সময় পর মুখ তুললেন বৃদ্ধা। জলভরা চোখে বেনের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। ম্লান হাসি। ব্যথাভরা হাসি।
‘আমার বৃদ্ধ স্বামীর দুর্বল শরীর এ খবর নিতে পারল না। তীব্র মাইগ্রেনে আক্রান্ত হলো সে। পরের দিন যখন খবর এল বড় বউমাকেও তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তখন একেবারে ভেঙে পড়ল।
ওকে সাহস জোগানোর চেষ্টা করলাম, ‘এখনই এত ভেঙে পোড়ো না। দেখা যাক শেষমেশ কী হয়।’
এক এক করে চলে গেল ত্রিশ দিন। ছেলে, ছেলের বউ কারও কোনো খোঁজ নেই।
.
যোগাযোগ করার চেষ্টা করলাম কারাগাশের প্রসাশনের সাথে। ফোনে এক লোককে পেলাম। নাম বলল নুরলীবেক।
‘আমার ছেলেকে কেন ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে? ছেলে, ছেলের বউ এরা কোথায় আছে?’ একটু রাগী ও অধৈর্য গলায় জানতে চাইলাম আমি।
‘ওরা রিএডুকেশন ক্যাম্পে আছে’, মুখস্থ উত্তর আউড়ে গেল নুরলীবেক। ‘পড়াশোনা করছে সেখানে। আপনার মেজো এবং সেজো ছেলের বউদেরও ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, খবর পাননি বোধহয়। ওদেরকেও পলিটিকাল সায়েন্স পড়তে হবে।’ শেষের দিকে নুরলীবেকের গলায় বিদ্রুপের রেশ শুনতে পেলাম।
‘আমার ১৪ জন নাতি-নাতনি আছে। ওদের বাবা-মা সবাইকে তো ধরে নিয়ে গেছেন, এখন কে ওদের দেখাশোনা করবে?’
‘চিন্তা করবেন না। ওদেরকেও পড়াশোনা করতে পাঠানো হয়েছে।’
ফোন কেটে যাবার খুটখুট শব্দ আমার বুকে যেন ছুরি বসিয়ে দিলো।
.
আমার স্বামীর হাঁটাচলা বন্ধ হয়ে গেল ফোনালাপের দিন। সোজা বিছানা নিল সে। হাঁটতে পারে না, কোথাও যেতে পারে না। দিন দিন দুর্বল হতে থাকল। কথা বলার শক্তিও যেন হারিয়ে ফেলল।
এত বড় ঝড় বয়ে গেল আমাদের পরিবারের ওপর...। আমার সব ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-নাতনিকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হলো; কিন্তু তবুও কাউকে কোনো কথা জানাতে পারলাম না। বুকে পাথর বেঁধে পার করে দিলাম কয়েকটা মাস।
.
সেপ্টম্বরের ৯ তারিখ।
আমার স্বামীর মধ্যে কী জানি একটা ভর করল। যে লোক কথাই বলতে পারে না সে হঠাৎ করে চিৎকার করে তিন ছেলেকে ডাকল–সাতাইবালদি, ওরাযহান, তক্তীগুল!
আমার দিকে পাশ ফিরল।
জড়ানো গলায় বলল, ‘আমার তিন ছেলের দায়িত্ব আল্লাহর কাছে দিলাম। আর খালিদা, তুমি ওদের দেখো। আমার যাবার সময় হয়ে গেছে।’
বিকেল ৫ টায় মারা গেল ও!
ধু ধু বাড়ি।
শুধু আমি।
কোথাও কেউ নেই।
অসীম শূন্যতা, বিষণ্ণতা বুকে নিয়ে পড়ে আছে ঘরদোড়। ঘরময় ঘুরে বেড়াই...। স্থির হয়ে বসতে পারি না। ছেলেদের ব্যাপারে কাউকে কিছু বলতে পারলাম না। দিন দশেক ভেবে ভেবে সিদ্ধান্ত নিলাম, তক্তীগুলদের খুঁজতে বের হব আমি!
.
শেরিকযাহানের [১] সঙ্গে দেখা করার জন্য আসলাম আতাজুরতে। আগেই বলেছি আমি নিরক্ষর। আমার হয়ে অন্যরা বিভিন্ন জায়গায় লেখালেখি শুরু করল,
‘খালিদার তিন তিনজন ছেলেকে, তাদের পরিবারকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। শোক সামলাতে পারেনি খালিদার স্বামী। ক’দিন আগে মারা গেছে বৃদ্ধ।’
কিন্তু কোনো লাভ হলো না। আমার শূন্য ঘর শূন্যই থেকে গেল।
.
ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-নাতনি সবাইকেই তো ক্যাম্পে পাঠিয়েছে পুলিশ। স্বামীও মারা গেছে। এখন পরিবারে বাকি আছে কেবল ছোট ছেলে। ওই শুধু কাযাখস্তানে আছে। বিয়ে করেছে কিছুদিন আগে। টুনোটুনির সংসার ওদের। এক এপার্টমেন্টে গাদাগাদি করে থাকতে কষ্ট হয়। তাই আলাদাভাবে আমি একা থাকি।
.
বয়স্ক ভাতা-টাতা কিছু পাই না, এই বুড়ো বয়সে এসেও কাজ করতে হচ্ছে। ছোট ছেলের অবস্থাও খুব একটা ভালো না, টেনেটুনে সংসার চালায়; কিন্তু তারপরও আমার দেখাশোনার অনেক চেষ্টা করে। আরও অনেকের সঙ্গে মিলে ট্রাক ভাড়া করে চীনে সবজি কিনতে যায় ও। ফিরলে ওদের কাছ থেকে নিয়ে বাজারে সবজি বিক্রি করি আমি। দোকান ভাড়া নিয়ে বসার মতো পয়সা আমার নেই। সবজির দোকান নিয়ে বসে যাই ফুটপাতে। এই বৃদ্ধ বয়সে ২০ জনের মতো স্বজন হারানোর ব্যথা আর আর্দ্রতা বুকে নিয়ে ফুটপাতের এক কোণে বসে সবজি বিক্রি করি আমি।
শসা, টমেটো, গাজর, লেটুস...! [২]
.
এমন লক্ষ লক্ষ খালিদা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পূর্ব তুর্কিস্তান জুড়ে। গুম, খুন, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, নির্যাতন, নিপীড়ন, ধর্ষণ যাদের নিত্যসঙ্গী।
.
বাহ! কত সহজেই বাক্যদুটো বলে ফেললাম। সংবাদপত্রে রিপোর্ট লেখার মতো। সাংবাদিকরা একের পর এক খবর লিখে যান, কিন্তু খবরের বাস্তবতা তাদের স্পর্শ করে না বেশির ভাগ সময়ই। হয়তো আমার ক্ষেত্রেও তা-ই হতো। আমিও লিখে যেতাম উইঘুর-কাযাখ মুসলিমদের নির্যাতনের কথা কোনো ভাবাবেগ ছাড়াই। কিন্তু তা হয়নি। হতে দেয়নি নির্যাতনের ভয়াবহ মাত্রা। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত আমাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে নিজের সাথে। এখন তো বটেই, বই লেখার সময় একটু পরপর নিজেকে অবেচতন মনেই প্রশ্ন করতাম, কেন লিখতে বসলাম আমি উইঘুর-কাযাখ মুসলিমদের কাহিনি? আমি কি পাগল হয়ে গেছি? নাকি পাগল হবার হাত থেকে বাঁচার জন্যই রাজি হয়েছিলাম উইঘুরদের গল্প বলতে? যা কিছু শুনেছি-জেনেছি-পড়েছি-দেখেছি পর্দার এপাশ থেকে, প্রতিনিয়ত যে দগদগে ঘায়ের মতো নতুন নতুন ক্ষত তৈরি হয়েছে হৃদয়ের খোপে খোপে, সবকিছু থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্যই বোধহয় রাজি হয়েছিলাম লিখতে। এ ছাড়া বোধহয় আর কোনো উপায় ছিল না। কষ্টের ভার সয়ে সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মতো বেঁচে থাকার কোনো রাস্তা ছিল না। হিকমাহর দোহাই টেনে ‘ছাপোষা’ গৃহপালিত জীবনটা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা বোধহয় সম্ভব ছিল না কোনোমতেই।
.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদীদের গণহত্যার মতো একই কাহিনি পুনরাবৃত্তি হচ্ছে পূর্ব তুর্কিস্তানে। সেই একই কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, হত্যা, নির্যাতন, নিপীড়ন, ধর্ষণ, শ্রমদাসত্ব, মেডিকেল এক্সপেরিমেন্ট, জাতিসত্তার শেকড় উপড়ে ফেলা...। তথ্য-প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি চাইনিয বর্বরতাকে এমন এক মাত্রা দিয়েছে যা হয়তো ছুঁতে পারেনি খোদ নাৎসি বাহিনীও। কিন্তু এতকিছুর পরেও পুরো বিশ্ব নীরব। এই নীরবতা আরও পাগল করে তুলত আমাকে। দায়িত্ব আর কর্তব্যের বোঝা আরও শক্ত হয়ে চাপত ঘাড়ে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করতাম, নিজেকে যতই জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিই না কেন, আমাকে বলতেই হবে! আমাকে বলতেই হবে পূর্ব তুর্কিস্তানের আড়াই কোটি মানুষের কথা। আমাকে জানাতেই হবে কীভাবে চীন সকল শক্তি বিনিয়োগ করেছে এই আড়াই কোটি মানুষকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য। আমাকে অবশ্যই শোনাতে হবে আব্দুওলী, সাইরাগুল, আব্দুল আযিয, ইমিন, মেরিপেত, আয়নুরারা, মিহিরগুলদের হৃদয়ভাঙা গল্প। বাবা-মা হারিয়ে বরফে জমে মরে যাওয়া ২ বছরের রহমাতুল্লাহ বা বোর্ডিং স্কুল নামক কারাগার থেকে বাবাকে লেখা ৮ বছরের ছোট্ট মেয়ের ঠিকানাবিহীন চিঠির গল্প। না শোনালে নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না কোনো দিন। দেশহারা লক্ষ লক্ষ উইঘুর রিফিউজি, আমাদের নেতাদের পল্টিবাজি, আমাদের কাপুরুষতা, নিষ্ক্রিয়তা–এসব না বললে বিবেক কোনো দিন ক্ষমা করবে না আমাকে।
.
অনেক কিছুই বলার ছিল। আছে। কিন্তু সে কথাগুলো বলার ভাষা কি আদৌ আমাকে শেখানো হয়েছে? মানুষের এত নিষ্ঠুরতা, এত নির্যাতন, এত দীর্ঘশ্বাস, এত চোখের জল, এত অশ্রুকে কালো কালির হরফে ভাষা দেবার ক্ষমতা কি আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষকে দেওয়া হয়েছে?
.
দিনের পর দিন গিয়েছে, কেটেছে রাতের পর রাত, যে বই শেষ হতে পারত এক মাস, বড়জোর দেড় মাসে–সেই বই শেষ হয়নি! সম্পাদক বিরক্ত হয়েছেন, কড়া করে বকেছেন... কিন্তু আমি নিরুপায়। বই শেষ করতে পারিনি।
অতিথি শব্দরা হুড়মুড়িয়ে এসেছে, আত্মবিশ্বাসী গলায় জানিয়েছে,
‘আমাকে... আমাকে বেছে নাও। আমি পারব আবেগের ভার বহন করতে।’
শুকনো হেসেছি আমি।
‘তোমরা কি পারবে সেই মেয়ের দুঃখের কথা বলতে, ২০০ জন মানুষের সামনে যাকে গণধর্ষণ করা হয়েছিল? গণধর্ষণ দেখতে বাধ্য হওয়া ২০০ জন মানুষের আক্ষেপ, নিষ্ফল ক্রোধ ফুটিয়ে তুলতে পারবে তোমরা?
তোমরা কি পারবে সেই ছেলের মনের দহন তুলে ধরতে, নিজের মাকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠাতে বাধ্য হয়েছিল যে?
পারবে?
পারবে তোমরা?’
মাথা নিচু করে পরাজয় মেনে নিয়েছে শব্দেরা। বিদায় নিয়েছে একে একে!
চুপচাপ টেবিলে বসে থেকেছি আমি। অসহায় অশ্রু গড়িয়ে পড়েছে দুগাল বেয়ে।
.
তথ্য- উপাত্ত,কাহিনী সংগ্রহ করা হয়েছে বিশ্বের খ্যাতনামা সংবাদমাধ্যম, অ্যাকাডেমিকদের গবেষণা, উইঘুর অ্যাক্টিভিস্টদের পরিচালিত ওয়েবসাইট, চীনের নাগপাশ থেকে পালিয়ে আসা হতভাগ্য উইঘুর,কাযাখদের জবানবন্দী ইত্যাদি থেকে। আমরা চেষ্টা করেছি সবজায়গাতেই বিশুদ্ধ তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করার। প্রতিটি স্থানেই তথ্যসূত্র যোগ করা হয়েছে। আমরা পাঠককে তীব্রভাবে উৎসাহিত করছি তথ্যের উৎসগুলো যাচাই বাছাই করে নেবার। বইয়ের কলেবর ছোটো রাখার জন্য এবং আমাদের ভাষার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক করুণ কাহিনী আমরা তুলে আনতে পারিনি। এই সুযোগে পাঠক সেগুলো সম্পর্কে ধারণা পাবেন। সাহিত্যমান বজায় রাখার জন্য আমরা কিছুটা স্বাধীনতা নেবার চেষ্টা করেছি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বক্তব্য পরিষ্কার করার জন্য তৃতীয় পুরুষে (Third Person) বর্ণিত কাহিনী,তথ্য-উপাত্ত প্রথম পুরুষে (First Person) রূপান্তর করা হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বক্তব্য সংক্ষেপ করা হয়েছে। প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি যোগ করা হয়েছে। এসবকিছু করা হয়েছে বইয়ের বিষয়গুলো পাঠক যেন যেন অনুধাবন করতে পারেন সেই বিষয়টি সামনে রেখে। তবে এই সাহিত্যিক স্বাধীনতা কোনো তথ্যের ক্ষেত্রে নেওয়া হয়নি। আমরা যে তথ্য বিশুদ্ধ উৎস থেকে পেয়েছি সে তথ্যগুলোই সরাসরি বইয়ে উপস্থাপন করেছি। উইঘুর এবং হান চাইনিজদের নাম প্রতিবর্ণীকরণের জন্য আমরা নির্ভর করেছি আন্তর্জাতিক গনমাধ্যমের (মূলত ইংরেজি) ওপর। আন্তর্জাতিক গনমাধ্যম যেভাবে উইঘুর এবং চাইনিজদের নাম লিখেছে আমরা সেভাবেই লিখার চেষ্টা করেছি। তথ্যসূত্র যোগ করা সহ সকলক্ষেত্রেই আমরা আন্তরিক এবং সৎ থাকার চেষ্টা করেছি। এরপরেও কোনো ভুল ত্রুটি থেকে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছুনা। এমন কিছু পাঠকের চোখে পড়লে তা প্রকাশনীর ফেইসবুক পেইজ বা মেইলে জানানোর অনুরোধ রইলো।
.
এই বইয়ের লেখক (ইশ! যদি আমাকে লেখা না লাগত! যদি এসব কখনো না ঘটত!) হিসেবে আপনাকে সাবধান করে দেওয়া দায়িত্ব মনে করছি। এমন গল্প আপনি আগে শোনেননি নিশ্চিত। পাঠক, আপনি এমন কিছু মানুষের গল্প শুনতে যাচ্ছেন, যাদের প্রায় প্রতি পরিবার থেকে কমপক্ষে একজনকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে। যেখানে ৩৫ বছরের নিচের নারীপুরুষ-নির্বিশেষে সবাইকেই ধর্ষণ করা হয়।
আপনি এমন কিছু মানুষের গল্প শুনতে যাচ্ছেন, যাদের পুরুষশূন্য ঘরে ঢুকেছে ১০ লাখ কামোন্মত্ত হান পুরুষ!
যাদের ৫ লাখ শিশুকে মায়ের কোল থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে!
যাদের জীবন্ত শরীর থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে!
.
পাঠক, আমাদের সময়ে ঘটে যাওয়া এই নির্মম ট্র্যাজেডি সহ্য করতে পারবেন কি না জানি না। জানি না, আপনি আর স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন কি না। মনের গহিনে কিছু বীভৎস স্মৃতি জমা হয়ে থাকবে বোধহয় চিরদিনের জন্য। যে স্মৃতি চিরকাল ফুটিয়ে যাবে যন্ত্রণার ধ্রুপদি হুল।
.
এ পর্যন্ত পড়ার সাহস যখন করেছেন, তাই এতবার সতর্ক সংকেত দেবার পরেও স্বাগত জানাচ্ছি আপনাকে।
নরকের দুয়ারে!
.
(শেষ)
.
প্রথম পর্ব- https://tinyurl.com/y25wqfyn
.
বইঃকাশগড়-কতো না অশ্রুজল
লেখকঃ Enamul Hossain
সম্পাদকঃ Asif Adnan
প্রকাশনীঃ Ilmhouse Publication
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ২৬৪
নির্ধারিত মূল্যঃ ২৬০ টাকা
বইয়ের প্রাপ্তিস্থানঃ https://tinyurl.com/yxjofwa4
============
রেফারেন্সঃ
[১] স্বেচ্ছাসেবী মানবাধিকার সংস্থা আতাজুরতের প্রধান। Atajurt Kazakh Human Rights, কাযাখস্তানের একটি স্বেচ্ছাসেবী মানবাধিকার সংস্থা। ফেইসবুক পেইজ -
https://www.facebook.com/kazakhrights/
[২] ২০১৯ সালের মে মাসে লেখক বেন মাউককে দেয়া খালিদা আখিতাকানকিযির (৬৪) সাক্ষাৎকার অবলম্বনে। Weather Reports: Voices From Xinjiang, Untold Stories From China’s Gulag State, Ben Mauk. The Believer, Issue One Hundred Twenty-Seven, October/November 2019 - https://tinyurl.com/yxszsrkc


রক্তগোধূলি: কাশগড়: কতো-না অশ্রু জল

জায়গাটাতে আমি আসতাম মাঝে মাঝেই। এখানকার কবুতরের কাবাব আর দুধ চায়ের স্বাদ এখনো জিবে লেগে আছে। শেষ এসেছিলাম এক বছর আগে। দোকানদার অভিমান ভরা গলায় অনুযোগ জানিয়েছিল, ‘আপনি তো আমাদের ভুলেই গেছেন। অনেক কিছু বদলে গেছে এই এক বছরে। সবচেয়ে বেশি বদলেছে বোধহয় উইঘুর মুসলিমদের জীবন।
.
রেস্টুরেন্টগুলোর বেশির ভাগ কর্মীকে বাধ্য করা হয়েছে দেশের বাড়ি চলে যেতে। কাউকে কাউকে রিএডুকেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে, আর কারও ওপর ঝুলছে শহর ত্যাগ না করার নিষেধাজ্ঞা। বিষণ্ণ কণ্ঠে এক দোকানমালিক জানালেন, স্টাফরা চলে যাওয়ায় কবুতরের কাবাব আর দুধ চা আগের মতো আর সুস্বাদু হয় না। ‘উইঘুর বাবুর্চি এখন আর পাওয়াই যায় না। আর ওদের মতো অন্য কেউ রাঁধতেও পারে না। কী একটা অবস্থা দেখুন। ওরা চলে যাওয়ার পর কাস্টোমার আসাও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।’
.
এতদিন পর এখানে আসা শুধু খাবারের লোভে না; আমি করিমকে খুঁজতে এসেছি। এক বছর... না, আরেকটু বেশি হবে বোধহয় করিমের সঙ্গে আমার পরিচয়ের। করিম, একজন উইঘুর মুসলিম। রেস্তোরাঁর মালিক।চায়না প্রপারে আদৌ উইঘুরদের রেস্তোরাঁ আছে কি না বা থাকলেও কয়টা, তা নিয়ে সন্দিহান ছিলাম। এমন সময় করিমের সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো আমার। আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম যেন।
.
উফ! রাঁধতে পারে বটে করিমের বাবুর্চি! সেই কবে ওর রেস্তোরাঁয় পোলাও আর লাগমান নুডুলস খেয়েছিলাম। এখনো তার স্বাদ লেগে আছে জিবে!
করিম খুবই হাসিখুশি, আন্তরিক, মিশুক মানুষ। দেখলেই ভালো লাগে এমন কিছু মানুষ থাকে না? করিম ও রকমই একজন। ওর রেস্তোরাঁয় যখনই গেছি হাসিমুখে বুকে টেনে নিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছে। খাবার খেতে খেতে কত কথা হতো ওর সাথে। আলাপ করে আরাম পেতাম। ওর সেন্স অফ হিউমার খুব ভালো।

এমন অনেকবারই হয়েছে, তাড়াহুড়োর মাঝে খেতে গেছি ওর ওখানে। যাব, খাব আর চলে আসব–এই ছিল প্ল্যান। খাবার সময় করিম পাশে এসে বসল। আলাপ জুড়ে দিলো। ব্যস শুরু হলো আড্ডা। দুই-তিন ঘণ্টা ফুড়ুৎ করে কোথায় উড়ে যেত টেরও পেতাম না। করিমের রেস্তোরাঁ যেন এক চুম্বক। টেনে ধরে রাখত আমাকে। কোনো কাজ না থাকলেও স্রেফ আড্ডা দেবার জন্যেই যেতাম ওর ওখানে।
.
আড্ডা জমে উঠেছে একদিন। এ কথা সে কথা হতে হতে আলোচনা মোড় নিল চায়না প্রপারের শহরগুলোতে উইঘুররা কতটা বৈষম্যের শিকার হয় সে দিকে। রাতের খাবার খেতে আসা বেশ কয়েকজন উইঘুর মুসলিম বললেন, ‘জানেন, হোটেলগুলোতে আমাদের রুম ভাড়া দেওয়া হয় না প্রায়ই। বলা হয়, হোটেলে নাকি ঘর খালি নেই। অথচ হোটেলে এন্তার খালি ঘর পড়ে থাকে।’
.
‘আরে, সেদিন এক উইঘুর পুলিশ অফিসারকে পর্যন্ত এই অজুহাত দেখিয়ে ঘর ভাড়া দেয়নি হোটেলের ওরা!’ শুকনো, কষ্টের একটা হাসি হেসে বললেন আরেক কাস্টোমার।
.
গলা খাঁকারি দিয়ে নড়েচড়ে বসল আমাদের করিম। সবার চোখ ঘুরে গেল ওর দিকে। কেলো একটা হাসি দিয়ে কথা শুরু করল, ‘এভাবে কেউ হোটেল রুম চায় নাকি? এসো আমি তোমাদের শিখিয়ে দিচ্ছি কীভাবে রুম ভাড়া করতে হয়। ভাবসাব নিয়ে রিসেপশনে যাবে। তারপর চোস্ত ইংরেজিতে বলবে আপনাদের এখানে ঘর ফাঁকা আছে? দেখবে, হুজুর হুজুর করতে করতে তোমাকে ঘর ভাড়া দেবে ওরা...’
.
‘আপনার কাগজপত্র যখন চেক করতে চাইবে তখন কী করবেন? আইডি কার্ড দেখে ঠিকই তো বুঝে ফেলবে আপনি উইঘুর।’ ত্যাঁদড় ছোকরা প্রশ্ন ছুড়ে দেয় করিমকে।
.
ওস্তাদি হাসিটা মুছে ফেলে করিম বলল, ‘কাগজ দেখতে চাইলে অবশ্য আর কোনো উপায় নেই। বেশ কয়েকটা হোটেলে রিসেপশনের ওরা আমার ইংরেজি শুনে তব্দা খেয়ে স্যার স্যার করতে করতে ঘর ভাড়া দিয়েছিল। কিন্তু যেই না কাগজপত্র চেক করে বুঝে ফেলল আমি উইঘুর, সঙ্গে সঙ্গে বুকিং ক্যান্সেল করে দিলো।’ করিম অভিনয় করে দেখাল, ‘…অন্য হোটেলে দেখতে পারেন, এখানে ঘর খালি নেই।’
.
করিমের অভিনয়ে হাসির রোল উঠল সবার মধ্যে।
শুকনো, প্রাণহীন, কষ্টের ব্যথাতুর হাসি!
.
চায়না প্রপারে উইঘুরদের যে বৈষম্যের শিকার হতে হয় এটা তার খুব ছোট্ট একটা উদাহরণ। বলতে পারেন হিমশৈলের চূড়ামাত্র। ২০১৭ এর বসন্তে চায়না প্রপারে বসে করিমরা যখন এসব বৈষম্যের ব্যাপারে আলোচনা করে চায়ের কাপে ঝড় তুলছে, তখন তাদের নিজেদের প্রদেশ পূর্ব তুর্কিস্তানে নরক গুলজার করে ছাড়ছে চীন সরকার। সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে উইঘুরদের ওপর। গালভরা নাম দিয়েছে এই আগ্রাসনের–‘ধর্মীয় উগ্রবাদ আর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’। নারকীয় এই মহাযজ্ঞের মাস্টারমাইন্ড হলো চেন চোয়াংগোয়া পূর্ব তুর্কিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি। লোকটা পুরোনো পাপী। তিব্বতেও এর আগে একইভাবে মানুষের চোখের জল ঝরিয়েছিল সে।
.
চীন সরকার বারবার দাবি করেছে, পূর্ব তুর্কিস্তানে চালানো তাদের সকল কার্যক্রমের উদ্দেশ্য হলো চীনের মাটি থেকে সন্ত্রাসবাদের শেকড় উপড়ে ফেলা। তবে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, পূর্ব তুর্কিস্তানে উইঘুরদের সাথে চীন যা কিছু করছে তার কেবল একটাই উদ্দেশ্য থাকতে পারে–জাতিগত নিধন! উইঘুরদের শেষ চিহ্নটুকুও পৃথিবী থেকে মুছে ফেলা…
...
পরিত্যক্ত পাথুরে রাস্তায় বেশ কিছুক্ষণ এলোমেলো ঘোরাফেরার পর শেষমেশ করিমের খোঁজ মিলল।
করিম মারা গেছে!
চীন সরকার খুন করেছে ওকে!
.
একদিন ট্রাকভর্তি পুলিশ আসে করিমের রেস্তোরাঁয়। আরও অনেক উইঘুরের মতো হ্যান্ডকাফ পরিয়ে ধরে নিয়ে যায় ওকেও। বিনা বিচারে জেল দেয়া হয়। কারাগারের অমানুষিক পরিশ্রমে স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। মারা যায় করিম।

‘ধর্মীয় উগ্রবাদ আর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে’ চীনা সরকারের যুদ্ধের বলি হতে হয়েছে আমার বন্ধু করিমকে। হাসিখুশি, ভালোমানুষ করিম।
.
করিম মারা যাবার বছরটাতেও বসন্ত ঠিকই এসেছিল পূর্ব তুর্কিস্তানে। চেরী ফুলে ছেয়ে গিয়েছিল পথঘাট, বসন্তের অলস বাতাস উপত্যকা থেকে বয়ে নিয়ে এসেছিল ল্যাভেন্ডারের সৌরভ, মাতাল হয়ে গান গেয়েছিল পাখি, আদিগন্ত ভালোলাগায় ভরেছিল চারপাশ। কিন্তু সে আনন্দে, সে ভালোলাগায় উইঘুরদের কোনো ভাগ নেই–সব হারানোর শুরুটা শুরু হয়েছে তাদের এই বসন্তে! কী হারায়নি ওরা?

প্রিয়জন? আত্মপরিচয়? স্বাধীনতা? বেঁচে থাকার অধিকার? হারিয়েছে এর চেয়েও অনেক বেশি!
.
- Asif Adnan

Powered by Blogger.