ক্রুজ, ব্যালিস্টিক ও সর্বশেষ চীনা হাইপারসোনিক মিসাইল - ভূরাজনীতিতে মিসাইলের প্রভাব

হাইপারসোনিক মিসাইল টেস্টের পর বিশ্ব এখন এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। এটার মাধ্যমে চীন পুরো বিশ্বের সামরিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছে। এটি একটি গেমচেঞ্জার, আসলে একটি স্পুটনিক মোমেন্ট। বাংলা ভাষায় এনিয়ে তেমন আলোচনা পর্যালোচনা চোখে পড়েনি কিন্তু বিশ্বের বড় বড় মিডিয়া, ডিফেন্স গ্রুপ, গবেষক এবং বিশেষ করে আমেরিকান থিং ট্যাংককে এই খবর চরম নাড়া দিয়েছে।

চীনা নতুন এডভান্স মিসাইল সিস্টেমে এমন কী আছে যা অন্য মিসাইল সিস্টেম থেকে একে পৃথক করেছে তা এখানে আলোচনার চেষ্টা করব।

আমরা নিউক্লিয়ার মিসাইল বলতে সাধারন ব্যালিস্টিক মিসাইলকে চিনি। ব্যালিস্টিক মিসাইল কাজ করে একটি প্যারাবলিক ট্রাজেক্টরি ওয়েতে। অর্থাৎ আকাশে একটি বল নিক্ষেপ করলে বলের গতি এবং ডাইরেকশনের উপর নির্ভর করে তা একটি টার্গেটে গিয়ে পরবে। এভাবে যে ব্যক্তি বলটিকে ক্যাচ করবে সে সহজে বুঝতে পারে বলটি কোথায় এবং কখন এসে পড়বে।

ব্যালিস্টিক মিসাইলকে প্রচন্ড গতির সাথে আকাশে ছুড়ে দেয়া হয় এটি স্পেসে চলে যায় এবং পরে তা পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে প্রবেশ করে গ্রাভিটির সূত্র অনুসারে নির্দিষ্ট টার্গেটে আঘাত করে। ব্যালিস্টিক মিসাইলের সাথে নিউক্লিয়ার ওয়ার হ্যাড যুক্ত করলে এটি নিউক্লিয়ার ব্যালিস্টিক মিসাইলে পরিনত হয়।

সাধারণত এই মিসাইলের উপরই বর্তমান নিউক্লিয়ার পাওয়ারফুল দেশগুলো পরস্পরের সাথে প্রতিযোগিতা করে। ব্যালিস্টিক মিসাইলের রেঞ্জ কত বা এটি কত দুরে যেতে পারে এবং কতটুকু নিউক্লিয়ার বহন করতে পারে এগুলোর উপরই আমরা প্রতিযোগিতা দেখি।

মিসাইল ছবি



জানুয়ারিতে পাকিস্তান শাহিন-৩ মিসাইল টেস্ট করেছিল। এর রেঞ্জ ছিল ২৭৫০ কিলোমিটার অর্থাৎ এটি একটি মেডিয়াম রেঞ্জ ব্যালিস্টিক মিসাইল (MRBM)। কিছুদিন আগে ভারত অগ্নি ফাইভ মিসাইল টেস্ট করেছে। এটির রেঞ্জ ৫০০০ কিলোমিটার তাই এটি হল ইন্টারকোন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল (IRBM)। এমনি ভাবে রাশিয়া ও আমেরিকার কাছে এমন মিসাইল আছে যার রেঞ্জ হল ১০ হাজার কিলোমিটার+। যেমন রাশিয়ার মিসাইল SS-27 এর রেঞ্জ ১১ হাজার কিলোমিটার। অর্থাৎ এটি পুরো পৃথিবীর যে কোনো লোকেশনকে টার্গেট করতে পারবে।

ব্যালিস্টিক মিসাইলের একটি ডিসএডভান্টেজ হল- এটি উৎক্ষেপনের সাথে সাথে রাডারে ধরা পরে এবং এর গতি ও দিক সুপার কম্পিউটারের সাথে নিরিক্ষা করে কোন টার্গেটে আঘাত হানবে তা সহজে বের করা যায়। ফলে মিসাইল ও টার্গেটের মাঝে থাকা বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (US Patriot অথবা Russian S-400) দিয়ে আকাশেই বিধ্বস্ত করা সহজ হয়ে যায়।

আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্য, দূরপ্রাচ্য (জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া), ইউরোপ সহ তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা শত শত দ্বীপে ও বেইসে মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করে রেখেছে। এমনকি স্পেসেও সে রাডার সিস্টেম রেখেছে। তাই কোনো মিসাইল এই সকল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে পৌঁছে, নির্দিষ্ট টার্গেটে আঘাত হানতে পারবে এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

উল্লেখ্য যে এই ব্যালিস্টিক মিসাইল যতই গতি সম্পন্ন হোক না কেন এটাকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা আমেরিকান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রয়েছে। হ্যা তবে অনেক গুলো একসাথে ছুড়লে তখন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শতভাগ কার্যকরী নাও থাকতে পারে।

যাইহোক, সাউন্ডের চেয়ে ৫ গুন বেশি গতিসম্পন্ন হলে তাকে হাইপারসোনিক বলা যায়। সে হিসেবে অধিকাংশ ব্যালিস্টিক মিসাইলই হাইপারসোনিক কিন্তু মিসাইলের পরিভাষায় হাইপারসোনিক গতি থাকলেই কোনো মিসাইলকে হাইপারসোনিক বলা হয় না।

এখন আসি অন্য একটি মিসাইল নিয়ে। সেটা হল ক্রুজ মিসাইল। ক্রুজ শব্দটি এসেছে ক্রুজিং থেকে। আমরা ক্রুজ শিপ বা স্পিট বোটকে দেখি কিভাবে ডানে বামে ক্রুজিং করে। অর্থাৎ যে মিসাইলকে নিক্ষেপ করার পরেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়, ডানে বামে উপরে নিচে বিভিন্ন ভাবে মুভ করে টার্গেটে আঘাত করা যায় বা শেষমুহূর্তে টার্গেট পরিবর্তন করা যায়, সেটাকে বলে ক্রুজ মিসাইল।

এই মিসাইল বেশি গতিসম্পন্ন হয় না। এই মিসাইল প্রতিরোধ করা কঠিন কেননা এটা হাইলি মেনিউভেরেবল এবং রাডারকে ফাঁকি দিয়ে খুব নিচ থেকে উড়ে যায়। এর গতি সাধারণত সাবসোনিক ও সুপারসোনিক হয়ে থাকে।

ব্যালিস্টিক মিসাইলের গতি ও ক্রুজিং মিসাইলের মেনিউভেরবিলিটি যুক্ত করে তৈরি হয় হাইপারসোনিক মিসাইল। এই মিসাইল সাউন্ডের চেয়ে ৫ গুন বেশি (Mach 5) গতিসম্পন্ন হয় পাশাপাশি একে সুচারুভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তাই এটি রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম হয় এবং এর টার্গেট নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পরে।
অতএব, বিশ্ব IRBM মিসাইল বাদ দিয়ে হাইপারসনিক মিসাইল তৈরির দিকে প্রতিযোগীতা শুরু করে। রাশিয়া এগিয়ে যায় পরে চীন ও আমেরিকা সমান তালে শুরু করে।

রকেট মিসাইল ছবি

কিন্তু টুইস্ট হল চীন এই টিকনোলজিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। সে নিজেকে এই রেইস থেকে সরিয়ে নিয়ে অন্য এক ফিল্ড তৈরি করে। চীন দুটি আলাদা টেকনোলোজিকে এক সাথে যুক্ত করে এক নতুন অস্ত্র তৈরি করে ফেলে যা এখন আমেরিকার অস্তিত্বতের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চীন Fractional Orbital Bombardment System (FOBS) ও Hypersonic glide vehicle এই দুটি টেকনোলজিকে একত্রে ব্যবহার করেছে। দুটিই পুরাতন কন্সেপ্ট কিন্তু দুটিকে একত্রে ব্যবহার করার ধারনা এটাই প্রথম। প্রথমে নিউক্লিয়ার ওয়ারহেডকে নিম্ন কক্ষ পথে অর্থাৎ low Earth orbit (LEO)-এ লঞ্চ করে ছেড়ে দেয়া হবে। তা পুরো বিশ্বে চক্কর লাগাতে থাকবে, এরপর যখন ইচ্ছে হবে কোনো টার্গেটে আঘাত করার ঠিক তখন তাৎক্ষণিক ভাবে ওয়ার হেডকে Hypersonic glide vehicle এর সাহায্যে রি-এন্ট্রি করানো হবে এবং হাইপারসোনিক গতিতে তা বিভিন্ন রাডার ফাঁকি দিয়ে ক্রুজিং করে টার্গেটে আঘাত করবে।

এই মিসাইল খুব সহজে রাডার ফাঁকি দিয়ে আমেরিকায় প্রবেশ করতে পারবে এবং সকল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যেখানে ইচ্ছে সেখানে আঘাত করতে পারবে। এই মিসাইল টার্গেটের কাছাকাছি পৌছার পরই রাডারে ধরা দিবে কিন্তু ততক্ষণ একে বিদ্ধস্ত করা অসম্ভব হয়ে যাবে।
তাছাড়া আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হল উত্তর মেরু কেন্দ্রিক কিন্তু এই মিসাইল বিশ্বকে চক্কর দিয়ে দক্ষিণ দিক হতেও আঘাত হানতে পারবে। দ্বিতীয়ত নিম্ন কক্ষ পথে থাকার কারনে মিসাইল পুরো বিশ্বের যেখানে ইচ্ছে সেখানেই কয়েক মিনিটের মধ্যে আঘাত করতে পারবে।

আমেরিকান আর্মি জেনারেল ও চেয়ারম্যান অফ জয়েন্ট চিফ অফ স্টাফ মার্ক মিলি বলেছেন "আমি শিওর না যে এটি স্পুটনিক মোমেন্ট কি না তবে এটা তার খুব কাছাকাছি। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টেকোনলোজিকাল ইভেন্ট। আমাদের ফুল এটেনশন এদিকে আটকে আছে। হাইপারসোনিক এমন এক প্রযুক্তি যা নিয়ে আমরা দীর্ঘ দিন ধরে উদ্বিগ্ন।"

আমেরিকা এতদিন রাশিয়া ও চীনের সাথে হাইপারসোনিক মিসাইল এন্ড ভেইকেল বানানো নিয়ে প্রতিযোগিতা করছিল কিন্তু চীন প্রতিযোগিতাকে আরো উচ্চতর ধাপে নিয়ে গেছে। এই টিস্ট আমেরিকাকে নির্বাক করে দিয়েছে পুরোপুরি।

চীন কখনো নিউক্লিয়ার ওয়ারহেডের সংখ্যায় আমেরিকা থেকে এগিয়ে যেতে পারত না। চীনের ৩০০ এর বিপরীতে আমেরিকার রয়েছে হাজার হাজার নিউক্লিয়ার বোমা। তাই চীন এক বিপরীত পথ বেছে নিয়ে আমেরিকার নিউক্লিয়ার ব্লাক মেইল ও নিউক্লিয়ার ডিটারেন্সকে নোম্যাচ করে দিয়েছে। দুই পরাশক্তির হাড্ডাহাড্ডি লড়াই জমে উঠছে সামনে আমরা আরো নতুন প্রযুক্তি দেখতে পাবো।
- Kaisar Ahmad
Powered by Blogger.