বিয়ে করুন পুরুষ হোন : সাদিক ফারহান

 - রাস্তায় কুকুর দেখলে দরকারে আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকব, তা-ও কুকুরের সামনে দিয়ে যাবার সাহস করব না। সারাজীবন এটাই ছিল আমার অলিখিত স্বভাব। কিন্তু এখন আমি বিবাহিত। চলার পথে কুকুর দেখলে ভয়ে স্ত্রী সাহেবা আমার হাত জব্দ করে ধরেন। অমনি কোত্থেকে যেন আমার ভেতরে দুঃসাহস জন্ম নেয়। আমি কুকুরকে ঝেড়েতেড়ে তাকে নিয়ে নিরাপদে পার হয়ে আসি। আমি তার ভরসা হই, হিরো হই।


- আমার যতুটুকু মনে পড়ে, জীবনে দুয়েকবারই ইনজেকশনের সুঁই দেহে ঢোকাতে হয়েছে। এই সুঁই জিনিসটা দেখলেই আমি ভয়ে আধমরা হয়ে যাই। কিন্তু বিয়ে করেছি। এখন হাসপাতালের মহিলা ইউনিটেও আমার স্ত্রীকে আমার উপস্থিতি ছাড়া সুঁই দেয়া যায়নি। ইনজেকশন দেখেই সে নার্সকে বলেছে, আমার স্বামীকে ডেকে দিন, না-হলে আমি ইনজেকশন নেব না। নার্স মানছে না বলে তিনি কান্না করেছেন। শেষমেশ আমি গিয়ে অভয় দিলে, তিনি আমাকে শক্ত করে ধরে রেখেছেন; নার্স তার কাজ সেরেছে।

- জীবনে কখনো বড় ব্যাগ বয়ে দেখিনি। দূরে যাচ্ছি, জামাকাপড় বেশি নিলে ব্যাগ বড় হবে, না নিলে থাকতে কষ্ট হবে। কিন্তু বয়ে নেয়ার ভয়ে পরে কষ্ট করার ভার মেনে নিয়েছি। তবু কাঁধের ছোট্ট ব্যাগটা তুলেই হাঁটা দিয়েছি। কিন্তু এখন আমার সংসার আছে, ঘরে বউ আছে। তিনি বাড়ি থেকে আসার সময় লাউয়ের ডাঁটা, লাল শাক থেকে গোরুর গোশত, হাঁসের ডিম—সব নিয়েছেন। দুই দিনের জন্য বাড়ি যাবে, সঙ্গে করে এক বস্তা সাজনাকোজনা নিয়েছেন। আসার সময় দুই ব্যাগ শাক, এক ব্যাগ মাছ গোশত আর তার সেই জামাকাপড় সাজনাকোজনার ব্যাগ, সব নিয়ে রওনা করেছি। হাত যেন ছিঁড়ে যায় যায়, তবু নৌকা থেকে নামার সময় সবগুলো ব্যাগ এক হাতে নিয়ে আরেকটা হাত তার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছি, পাছে নামার সময় সে যেন পড়ে না যায়।

সত্যিই যদি নিজের কথা বলি, কখনোই বাজার করে খাইনি। মাদরাসায় তো করাই লাগত না; বাসায় এলেও আমাকে মা কখনো বাজারে পাঠাতেন না। আমি কিনতে জানি না, ঠকি। দশ টাকার মাল বিশ টাকা দিয়ে আনি; তা-ও আনি পচাটা। বিয়ের দুই তিন আগেও আমি বাজার করতে শিখিনি। কিন্তু দিন বদলেছে। এখন আমাকে প্রায় দিনই বাজারে যেতে হয়। আগে কালেভদ্রে কিছু কিনতে গেলে রুমালে মুখ ঢেকে কোনরকম চলে আসতাম। কিন্তু এখন এতবার যেতে হয় যে, সবজিওয়ালা, ফলওয়ালা, চালওয়ালা থেকে গোশতওয়ালা—সবাই আমাকে চিনে ফেলেছে।

সব কিনে নিয়ে ঘর্মাক্ত বদনে দুহাত ভর্তি ভারী ব্যাগ নিয়ে বাসার দিকে রওনা করেছি। অমনি ঘরওয়ালির ফোন, আমার জন্য ফুচকা নিয়াসেন। রাগ করিনি। ব্যাগট্যাগ নিয়েই বাজারের উল্টো দিকে ফুচকার দোকানে গিয়ে তার জন্য ফুচকা কিনেছি। ভালো ঝালমুড়ি বানাচ্ছে দেখলে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করেছি, ঝালমুড়ি খাবা নাকি? মজা হবে মনে হচ্ছে! সে সম্মতি দিলে সেটাও নিয়েছি। তারপর, ঘেমে যাচ্ছি বুঝতে পেরেও পনেরো টাকা ভাড়ায় রিকশা নিইনি। বরং সেই টাকায় আরেক প্যাকেট মুড়ি বেশি নেয়া যাক। মুড়ি মজা হয়েছে দেখে তার যদি আরেক প্যাকেট খেতে মনে চায়?

ফজরের পর তিলাওয়াত করতে বসেই তিনি কখনো ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমি টেবিলে বসে বই পড়ছি বা পিসিতে কাজ করছি। মনে হলো, তাকে আজ নাশতা বানানোর কষ্টটা না দিলে কেমন হয়! ফুডপান্ডা ওপেন করে কাছেধারে থেকে নাশতা অর্ডার করে দিছি। দুজন মানুষ; চারটা পরোটা, আমার জন্য ভাজি আর তার পছন্দের মুগডাল ভুনা। খাবার এলে তাকে ডেকে দিয়েছি। রুটি বানাতে হবে না ভেবে মনে মনে খুশি হলেও তিনি আমাকে এক গাল বকে দিয়েছেন, ‘এ-মাসে এমনিতেই খরচ বেশি হয়ে গেছে, আবার এসব অযথা খরচ করেন কেন?’ এই বলে তিনি রাতের বেলা আবার, তরকারিতে হবে না দেখে পেটে ক্ষুধা রেখেও বলেছেন, আজ খেতে মন চাচ্ছে না।

আমি তো জানি, রান্নার ঝামেলায় তিনি এমন বলছেন। অগোচরে ‘কিচেন এক্সপ্রেস’ থেকে দুটো চিকেন খিচুড়ি অর্ডার করে দিছি। খাবার আসার পর তার কিলগুঁতো জুটেছে সত্য; কিন্তু খেয়েদেয়ে এসে বলেছে—জানেন, আপনি না অন্নেক ভালো। আমাদের তামান্নাও যেন আপনার মতো কাউকে জামাই হিসেবে পায়।

তার ভালো না লাগলে, বা দুপুরে অসময়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়লে কিচেনে গিয়ে যা পেরেছি রান্না করে ফেলেছি। জীবনে ডিম ভেজে খেতে না-পারা আমার হাতের মুরগি রান্না খেয়ে কখনো বউ বলেছে, ‘দিব্যি করে বলছি, এমন মজার মুরগি জীব্বনে খাইনি।’ আমি জানি সে মিথ্যা বলছে। আমাকে খুশি করতে, বা আমি যেন মাঝেমধ্যেই তাকে না ডেকে এমন রান্না জারি রাখার আগ্রহ পাই—সেজন্যে।

এমন অনেকভাবেই কখনো রান্না করে, ঘর মুছে, কাপড় ধুয়ে তাকে সাহায্য করছি। ছোট্ট একটা বাটির জন্য কখনো তিনি কান্না জুড়েছেন, তিরিশ টাকার সেই বাটিটা আনতে হাবলা জামাইর মতো আমি সত্তর টাকা খরচ করে বড়বাজারে চলে গেছি। সেখানে রাস্তার পাশে স্ট্রবেরি বা ড্রাগন ফল দেখে মনে হয়েছে, ও তো মনে হয় কখনো এসব খায়নি, নেব নাকি? দাম শুনে তো চক্ষু চড়কগাছ।

ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলে প্রথমে আমতা আমতা করেছে। তারপর বলেছে, না, থাক; লাগবে না। আমার তো বুকের ভেতর তার ‘আমতা আমতা ভাব’ গেঁথে গেছে। ফোন কেটে দিয়েও তাই হাফ কেজি ড্রাগন আর ১০০ গ্রাম স্ট্রবেরি নিয়েছি। মুখ ভরে খাবার সাধ্য না থাক, একটু তো সাধ মেটানো যাবে!

এভাবেই, দুদিন আগে গোসল করে জামাকাপড় ফেলে চলে আসা আমি সংসারী হয়ে উঠছি। বিয়ে আমাকে রাতারাতি পুরুষ বানিয়ে দিয়েছে। আমি কারো ভরসা হতে শিখছি। কীভাবে একটা সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়, জানছি। কী-করে একজনের সুখ দুঃখ বুঝতে হয়—অনুধাবন করছি।

আজও যারা বয়সের তালে বড় হতে পারছেন না, বাসা থেকে যাদেরকে বরাবর শুনতে হচ্ছে ‘মনে হয় যেন বাতাসে বড় হইছে, কিচ্ছু করতে জানে না’; তারা বিয়ে করুন। আপনাকে কোন কোর্স টোর্স করতে হবে না। ঘর হলে, বউ হলে, সংসার হলে—সবকিছু আপনাআপনি শিখে যাবেন। কদিন আগে থুতনিতে দাড়ি গজানো আপনিই, কয়েকমাসের ব্যবধানে পুরুষ হয়ে উঠবেন। হিম্মত করুন, পুরুষ হোন। এ উম্মতের জন্য ইনোসেন্ট চকোলেট বয়দের চেয়ে, দায়িত্ববান পুরুষের অনেক দরকার। আল্লাহ আমাদের মুওয়াফফিক হোন!
- সাদিক ফারহান
Next Post Previous Post