পর্তুগীজ সাম্রাজ্যের উত্থান এবং গুজরাটের মুসলিমদের উপর বর্বর নির্যাতন এর ইতিহাস

আরব-হিন্দ মহাসাগরে পর্তুগীজদের রাতারাতি উত্থানের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ভেনিস ও মামলুক সালতানাত। পাশাপাশি ভয়াবহ এক হুমকির মুখে পড়ে গেছিল মুসলমানদের হজ্ব-উমরা পালনের মত মৌলিক ইবাদত। পর্তুগীজদের উচ্ছেদ করতে পারা বা না পারা মামলুক সালতানাত ও ভেনিসের জন্য জীবন-মরন সমস্যা হয়ে দেখা দিল।
রাজনীতিতে মিত্রতা হয় অভিন্ন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে, ভেনিসের সাথে মামলুকদের চুক্তি হল, মামলুকরা পর্তুগীজদের বিরুদ্ধে নৌবহর পাঠাবে, আর সেজন্য ভেনিস মামলুকদেরকে দেবে নৌবহর নির্মাণের খরচ। পাশাপাশি তারা পাঠাবে প্রযুক্তি-ইঞ্জিনিয়ারও। তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল ১৫০৪ সালের দিকে। উসমানীদের সাথে মামলুকদের সম্পর্ক সেকালে মোটেই ভাল ছিল না, কিন্তু ভেনিসের মধ্যস্থতায় উসমানীরা মামলুকদের এই লড়াইয়ে দক্ষ কামানচি-সৈনিক দিতে রাজি হল, সাথে উপহার হিসেবে পাঠালো উন্নতমানের হালকা কামান (মামলুকদের জাহাজে ভারী কামান বসানোর ব্যবস্থা ছিল না)। মামলুক সুলতানের ঘনিষ্ঠ মিত্র গুজরাটের সুলতান মাহমুদ শাহও যোগ দিলেন এই জোটে। তার সাথে আরও যুক্ত হলেন কালিকটের সামুথিরি। পরিকল্পনা হল, তাদের প্রত্যেকের বাহিনী যৌথভাবে পর্তুগীজদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের শেষ করে ফেলবেন আরব সাগরের পানিতে।
১৫০৫ সালের সেপ্টেম্বরে আমীর হুসাইন আল কুর্দীর নেতৃত্বে ৫০০ এলিট মামলুক ফারিসের এক বাহিনী ৬টা বড় ভেনিশিয়ান ক্যারাক এবং ৬টা বড় গ্যালি নিয়ে মামলুকরা রওনা করলো গুজরাটের উদ্দেশ্যে, এছাড়াও তাদের সাথে ছিল আনুমানিক প্রায় হাজারখানেক তুর্কী, নুবিয়ান ও আবিসিনিয়ান যোদ্ধা। কিন্তু রাস্তায় এই বাহিনী ইয়েমেনের অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় মাত্র এক মাসের পথ পাড়ি দিতে তাদের লেগে গেলো প্রায় বাইশ মাস। ততদিনে সুদুর পর্তুগাল থেকে আরো দুটো পর্তুগীজ ফ্লিট চলে এসেছে হিন্দুস্তানে, এবং তিন নম্বর ফ্লিট হিন্দুস্তানের পথে।
গুজরাটের বন্দর দিউয়ের ওয়ালী মালিক আয়াজকে সুলতান মাহমুদ শাহ কড়া নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন, যেন মামলুকদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়। কিন্তু মালিক আয়াজ পর্তুগীজদের শক্তি নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন, তিনি ভাবলেন, এ ধরনের লড়াইয়ে জড়ানো তার শহরের ধ্বংসের কারন হয়ে দাড়াতে পারে।



১৫০৮ সালের মার্চ মাসে প্রথম চউল বন্দরে মামলুকরা একটা পর্তুগীজ আরমাডার মুখোমুখি হল। এই আরমাডায় ছিল ৮টি পর্তুগীজ জাহাজ, আর মুসলিম বাহিনীতে ছিলেন আমীর হুসাইন ও মালিক আয়াজের নেতৃত্বে মোট ৬টি জাহাজ। তিন দিন ধরে যুদ্ধের পর পাচটি পর্তুগীজ জাহাজ ডুবিয়ে দিল মামলুক বাহিনী, নিহত হলেন পর্তুগীজ ভাইসরয়ের ছেলে গনজালো ডি আলমেইদা।
কিন্তু এই ছোট্ট পর্তুগীজ বাহিনীর মুকাবিলা করতেই মামলুকদের প্রান বেরিয়ে যাওয়ার অবস্থা হল। মামলুকরা আজীবন যুদ্ধ করেছে ঘোড়ার পিঠে, জাহাজের লড়াইয়ে তারা অভ্যস্ত ছিল না। পাশাপাশি, তাদের জাহাজগুলি ছিল ভেনিশিয়ান মডেলে বানানো, মূলত ভূমধ্যসাগরে ব্যবহারের উপযোগী। আরব সাগর বা হিন্দ-আরব মহাসাগরে চলার জন্য যেমন যুদ্ধজাহাজ প্রয়োজন তা তাদের ছিল না। পাশাপাশি পর্তুগীজদের জাহাজ ছিল তাদের চেয়ে অনেক দ্রুত গতির এবং ভারী কামান বহনে সক্ষম। চউলের যুদ্ধের মাঝপথে মালিক আয়াজ পর্তুগীজদের সাথে রনে ভঙ্গ দিয়ে একবার পালাতেও চেষ্টা করেছিলেন যদিও তিনি পরে ফিরে আসেন। আমীর হুসাইনের জীবন এসময় বিপন্ন হয়, বহু কষ্টে শেষমেশ তারা পর্তুগীজদের হারাতে সক্ষম হন।
সন্তান গনজালোর মৃত্যুর খবর শুনে ফুসে ওঠেন ফ্রান্সিস্কো ডি আলমেইদা। তিনদিন ধরে তিনি কারো সামনে এলেন না। তারপর সবাইকে বললেন, প্রতিশোধের জন্য তৈরি হতে।
মালিক আয়াজ একদিকে পর্তুগীজদের সাথে যোগাযগ রাখছিলেন গোপনে, অন্যদিকে সুলতান মাহমুদ শাহের ভয়ে তিনি মামলুকদেরও সহযোগিতা করছিলেন। আমীর হুসাইন ক্রমেই চিন্তিত হচ্ছিলেন সামগ্রিক অবস্থা দেখে, কিন্তু ফিরে গেলে তারও গর্দান যাবে, তাই তিনি অপেক্ষায় রইলেন সঠিক সময়ের। আর এর মধ্যে যদি মামলুক সুলতান আল আশরাফ আরও বাহিনী পাঠান, তাহলে তো কথাই নেই।
কিন্তু নতুন কোন বাহিনী সুলতান পাঠালেন না। ওদিকে অতিরিক্ত সময় নিয়ে গুজরাটে পৌছানোর খেসারত দিতে হচ্ছিল আমীর হুসাইনকে। তার সাথে থাকা টাকা পয়সা শেষ হয়ে এল। শেষমেশ বন্দুক-কামান বিক্রি করে নিজের সৈন্যদের জন্য রসদ কিনতে হচ্ছিল তাকে।
এরই মধ্যে দাবুল, চউল রীতিমত ধুলায় মিশিয়ে দিয়ে, অন্তত পনেরো হাজার মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে দিউয়ের দিকে এগিয়ে আসতে লাগলেন ক্ষোভে উন্মাদ ফ্রান্সিস্কো আলমেইদা। মালিক আয়াজ তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন, আর বিজয়নগর সাম্রাজ্যের এক সেনাপতি তিমোজা তাকে সাহায্য করছিল মুসলিম বাহিনীর খবরাখবর দিয়ে।
১৫০৯ সালের জানুয়ারিতে আলমেইদা সামনে এগোচ্ছিলেন মুসলিম ফ্লিটকে নিশ্চিহ্ণ করে দিতে, আর আমীর হুসাইন ভাবছিলেন, কিভাবে তিনি মালিক আয়াজের মত বিশ্বাসঘাতককে সাথে নিয়ে এই যুদ্ধ লড়বেন!!
££££
ফেব্রুয়ারী মাসের ২ তারিখে দুই কমান্ডারই নিজ নিজ বাহিনীকে নিয়ে বসলেন।
আমীর হুসাইন ও মালিক আয়াজ সিদ্ধান্ত নিলেন, তাদের বাহিনী দিউ বন্দরের পোতাশ্রয়ের পানিতে অবস্থান নেবেন। একেবারে ডানে থাকবেন আমীর হুসাইন, তার লক্ষ্য থাকবে আলমেইদার ফ্ল্যাগশিপ ফ্লোর ডে লা মারকে নিজের দিকে আটকে রাখা। বাহিনীর মাঝখানে থাকবে বড় মুসলিম ক্যারাক-গ্যালিগুলো, তারা পর্তুগীজ বাহিনীকে মুখোমুখি মোকাবিলা করবে। বাহিনীর বামদিকে থাকবেন মালিক আয়াজ তার ৪টা গুজরাটি ক্যারাক নিয়ে। পর্তুগীজদের সাথে লড়াইয়ের শেষদিকে ফলাফল নিজেদের পক্ষে থাকলে তিনি সমুদ্রের দিকে চলে গিয়ে তাদের গতিরোধ করবেন। যেহেতু তাদের জাহাজের গতি পর্তুগীজদের চেয়ে কম, তাই যুদ্ধটা যথাসম্ভব স্থির জায়গায় করতে হবে, যাতে উভয়পক্ষেরই নড়াচড়ার সুযোগ কম থাকে। আর যদি যুদ্ধে তারা হেরেও যান, পিছু হটে শহরে আশ্রয় নেয়া যাবে। পর্তুগীজ বাহিনী যখন তাদেরকে মুখোমুখি হামলা করবে তখন পেছন দিক দিয়ে তাদের ওপর হামলা করবে গুজরাটি নৌপ্রধান সিদি আলী, তার ৩০টা হালকা গ্যালি নিয়ে দিউ চ্যানেলের দিক থেকে, তার সাথে একশোরও বেশি বজরা নৌকা নিয়ে হামলা চালাবেন কালিকটের মুসলিম নৌ প্রধান কুনালি মারাক্কার।
মুসলিম বাহিনীর আর্টিলারির পুরোটাই ছিল মামলুক ক্যারাকগুলিতে, সেগুলিও যথেষ্ট বড় ছিল না, তবে সংখ্যায় ছিল হাজারেরও বেশি। মালিক আয়াজের ক্যারাকগুলিতে নিতান্তই সামান্য কিছু
কামান ছিল, আর সিদি আলী-কুনালি মারাক্কারের জাহাজ-বজরাগুলোতে কোন কামানই ছিল না। আর্কবুজিয়ার বা বন্দুকধারীর সংখ্যাও ছিল অতি সীমিত, সব মিলিয়ে পাচশোও না। মামলুকরা নিজেরাই তখনো ভালো করে বন্দুকের ব্যবহার শেখে নি।
কিন্তু মুসলিমরা সংখ্যায় ছিল অনেক বেশি। পাচশো মামলুকের সাথে এক হাজার তুর্কী-হাবশী যোদ্ধা, প্রায় ৫ হাজার গুজরাটি এবং ৩ হাজার মালাবারী মিলিয়ে বেশ বড় একটা বাহিনী।
পর্তুগীজরা সংখ্যায় ছিল সীমিত। আটশো পর্তুগীজ সৈন্য, আর ছিল চারশো নায়ার এবং প্রায় পাচশো দাস, এই ছিল তাদের মোট সৈন্যসংখ্যা। কিন্তু এই আটশো পর্তুগীজের প্রত্যেকেই ছিল সাতঘাটের পানি খাওয়া দুরন্ত সামুদ্রিক যোদ্ধা, যাদের বেশিরভাগই ছিল নাইটস টেম্পলার অর্ডার অফ ক্রাইস্ট-অর্ডার অফ সান্তিয়াগোর সদস্য। । তাদের প্রত্যেকে মোটা ইউরোপিয়ান মেটাল প্লেট আর্মার পরেছিলো, যার ভেতর তীর/তলোয়ার/বর্শা কোনটাই ঢুকতো না, মাঝে মাঝে বুলেটও ঢুকতো না। পর্তুগীজ জাহাজগুলি ছিল সেসময়ের পৃথিবীর ক্ষিপ্রতম জলযান, আর তাদের কামানবহর ছিল ইউরোপের অন্যতম সেরা। ফ্লোর ডে লা মার, এস্পিরিতো সান্তো, রেই গ্রান্দে, ফ্লোর ডে লা রোজা, সান্তো আন্তনিও জাহাজগুলো ছিল কামান, গুলি আর বারুদে ঠাসা। কামানগুলোর পাল্লাও ছিল হালকা উসমানী কামানের চেয়ে অনেক বেশি। মামলুকদের এই জাহাজবহর ভেনিশিয়ান প্রযুক্তিতে বানানো বিধায় উসমানীদের ভারী কামান ব্যবহারের কোন সুযোগই মামলুকরা পায় নি।
যুদ্ধের আগে আলমেইদা ঘোষনা দিলেন, এই যুদ্ধে জিতলে নাইটদেরকে অভিজাত শ্রেণীর অংশ করে নেয়া হবে, সাধারন সৈন্যদের দেয়া হবে নাইটহুড, অপরাধীদের দেয়া হবে শাস্তি থেকে নিঃশর্ত ক্ষমা আর দাসদের দেয়া হবে প্রজার সম্মান।
জাহাজের ক্যাপ্টেনরা সম্মিলিত বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিলেন, তারা সরাসরি মুসলিম বাহিনীকে হামলা করবেন। প্রথমেই আমীর হুসাইনের জাহাজকে আলাদা করে ফেলা হবে বাহিনীর বাকি অংশের কাছ থেকে, এই কাজটা করবে সবচেয়ে বড় নাওগুলো। এরপর ভারী স্কয়্যার রিগড ক্যারাভেল ও গ্যালিগুলি হামলা চালাবে বাহিনীর মাঝের অংশে, আর হালকা জাহাজগুলি হামলা চালাবে মালিক আয়াজের বাহিনীর দিকে।
এই সময় দুটো সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যা যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ করে দেয়।
এক) ফ্ল্যাগশিপ ফ্লোর ডে লা মার নিয়ে ফ্রান্সিস্কো আলমেইদা দিউ চ্যানেলের মুখে অবস্থান করবেন, যাতে পেছন থেকে কোন মুসলিম কাউন্টারএটাক হতে না পারে। মূল ফ্ল্যাগশিপ নিরাপদ থাকলে যুদ্ধে পরাজয়ের সম্ভাবনাও কমে আসবে, যদিউ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে প্রয়োজনে ফ্লোর ডে লা মার মূল বাহিনীতে যোগ দেবে।
দুই)স্কিডিং শট নামে একটা শট ব্যবহার করা হবে। এই শটের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটায় বাতাসের বদলে সমান্তরালভাবে সরাসরি পানির সমতল বরাবর গোলা ছোড়া হয়, আর গোলাটা তীব্র গতির কারনে ঢিলের মত করে পানির ওপর পিছলে গিয়ে সরাসরি জাহাজের তলায় আঘাত হানে।
££££
৩রা ফেব্রুয়ারি ১৫০৯ সাল, বেলা ১১টা।
প্রথম গোলা ছোড়ার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু করে ফ্ল্যাগশিপ ফ্লোর ডে লা মার। যুদ্ধ শুরুর মুহূর্তের মধ্যেই পর্তুগীজ জাহাজ সান্তো এস্পিরিতোর একটা ব্রডসাইড ফায়ারে ডুবে যায় একটা নড় মামলুক ক্যারাক।
দ্রুতগতিতে সান্ত এস্পিরিতো, রেই গ্রান্দে, সান্তো আন্তোনিও সহ সবচেয়ে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত পর্তুগীজ জাহাজগুলো সরাসরি হামলে পড়ে আমীর হুসাইনের জাহাজের ওপর। আমীর হুসাইন গোলা ছোড়ার কোন সুযোগ পাবার আগেই ঝাকে ঝাকে পর্তুগীজ সৈন্যরা হুংকার দিয়ে ঝাপিয়ে পড়তে থাকে তার জাহাজের ডেক ও বোক্যাসলের ওপর। গুজরাটিদের তীরে তাদের কিছুই হচ্ছিল না, আর মামলুকরা তাদের সাথে লড়ে জিততে বেগ পাচ্ছিল। রুই পেরেইরা নামের এক দুঃসাহসী কমান্ডার অসামান্য বীরত্ব দেখিয়ে আমীর হুসাইনের জাহাজে উঠে একের পর এক মুসলিম যোদ্ধাকে হত্যা করতে শুরু করে। রুই পেরেইরার সাথে টিকে থাকতে না পেরে আমীর হুসাইন গুজরাটি যোদ্ধাদের সংখ্যাধিক্যের সুবিধা নিয়ে পেরেইরার বাহিনীকে জাহাজ থেকে ঠেলে ফেলে দেয়ার একটা প্রচেষ্টা চালান। এসময় আরেকটা মামলুক ক্যারাক তার সাহায্যে এগিয়ে আসে। জাহাজের ডেকে তীব্র হাতাহাতি লড়াই শুরু হয়ে যায়।
এরই মধ্যে সান্তো এস্পিরিতোর উলটো দিক দিয়ে রুই গ্রান্দে নামের ক্যারাক আমির হুসাইনের জাহাজকে সজোরে ধাক্কা মারে। এবার দুইদিক দিয়েই সমানে পর্তুগীজ যোদ্ধারা আমীর হুসাইনের জাহাজে উঠতে শুরু করে। তাদের কাছে ছিল প্রচুর কাদায় মোড়ানো গ্রেনেড যা ছুড়ে দিলে বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হচ্ছিল।
আমীর হুসাইনের মামলুক ও তুর্কী যোদ্ধাদের রেখে পালিয়ে যেতে শুরু করলো গুজরাটিরা।
আমীর হুসাইনের অধীনে থাকা তুর্কী-হাবশী তীরন্দাজরা এবার তীর দিয়েই বন্দুক-গ্রেনেডের বিরুদ্ধে লড়তে থাকে। তাদের সাহসের ফল হল, পর্তুগীজরা কয়েক দফা পিছিয়ে যেতে বাধ্য হল।
এদিক দিয়ে বাহিনীর মাঝখানে থাকা মামলুক জাহাজগুলোকে একের পর এক উড়িয়ে দিচ্ছিল পর্তুগীজ জাহাজগুলো। তারা খুব সহজেই তাদের উচু জাহাজ থেকে নিচু ডেকের মামলুক জাহাজের ওপর লাফিয়ে পড়ছিল, যা তাদের জাহাজ দখলে সাহায্য করছিল। এভাবেই, মাত্র কয়েক ঘন্টায় ৮টা মুসলিম জাহাজ ডুবে গেল, পর্তুগীজদের একটা জাহাজও ডুবলো না।
এবার মালিক আয়াজের পালা। মাত্র দুটো পর্তুগীজ জাহাজ গিয়েই অবলীলায় মালিক আয়াজের চার জাহাজের সবকটাই দখল করে নিল। সম্ভবত তাদের মধ্যে চুক্তি হয়েছিল যে মালিক আয়াজের কোন জাহাজকে ডোবানো হবে না, নয়তো এই জাহাজগুলোর একটাও টিকে থাকার কথা না।
নিরুপায় হয়ে দিউ চ্যানেল দিয়ে বেরিয়ে এল সিদি আলী ও কুনালি মারাক্কারের ছোট ও হালকা নৌ যানের বাহিনী, যাতে ছিল না কোন কামান, আর না ছিল কামানের গোলা সহ্য করার মত কোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সংকীর্ণ দিউ চ্যানেলের পানিতে অল্প জায়গায় এতগুলো অরক্ষিত ছোট জলযানকে পেয়ে ফ্লোর ডে লা মার রীতিমত চড়ুই পাখি শিকারের মত একের পর এক মুসলিম জাহাজকে উড়িয়ে দিতে লাগলো। মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে দিউ পোতাশ্রয়ের পানি ভরে গেল মুসলিমদের লাশে।
এক হাজারের বেশি গুজরাটি শহীদ হলেন সেদিন। কালিকটের নৌবাহিনীর এক বিরাট অংশ ডুবে গেল পানির তলায়। বাকিরা ঊর্ধ্বশ্বাসে পেছন ফিরে পালালো।
বিকেল ৫টার দিকে দেখা গেল, একটা বাদে সমস্ত বড় মুসলিম জাহাজই হয় দখল হয়ে গেছে, নয় ডুবে গেছে। মামলুকদের পাচশোজনের মধ্যে বেচে আছেন মাত্র বাইশ জন, তুরকী-হাবশী তীরন্দাজদের প্রায় সবাইই শহীদ হয়েছেন, অথবা বন্দী হয়েছেন। মামলুকদের সবচেয়ে বড় জাহাজটা তখনো টিকে ছিল পর্তুগীজ কামানবহরের সামনে, এবার ফ্লোর ডে লা মার সহ সবকটা পর্তুগীজ জাহাজ মিলে ঘিরে ধরলো জাহাজটাকে, যেভাবে হায়েনারা ঘিরে ধরে কোন আহত মোষকে। একটানা কিছুক্ষন চতুর্দিক দিয়ে গোলাবর্ষনের পর এই জাহাজটাও ডুবে গেল আরব সাগরের পানিতে, মামলুক সালতানাতের ভাগ্যকে সাথে নিয়ে। জীবিত সহযোদ্ধাদের নিয়ে জাহাজ থেকে নেমে পালালেন আমীর হুসাইন।
যুদ্ধ শেষে দেখা গেল মুসলিমদের মধ্যে মোট শহীদের সংখ্যা অন্তত আড়াই হাজার থেকে তিন হাজারের ভেতর, আহত আরো বেশি। বন্দীর সংখ্যাও কয়েকশো। পর্তুগীজদের হাতে গিয়ে পড়ে ছয়শো ব্রোঞ্জের কামান, মামলুক সুলতানের শাহী নিশান। মুসলিম বন্দীদের কাউকে জবাই করা হয়, কাউকে জীবন্ত আগুনে পোড়ানো হয়, আর অনেককে কামানের মুখে গোলার সাথে উড়িয়ে দেয়।
বিপুল মুসলিম ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে পর্তুগীজদের ক্ষয়ক্ষতি ছিল অতি সামান্য, মাত্র ৩২ জন পর্তুগীজ এই যুদ্ধে নিহত হয়।
পর্তুগীজদের পেশাদার, উন্নত নৌ প্রযুক্তির সামনে মুসলিমরা পুরো যুদ্ধে দাড়াতেই পারে নি। এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, সমুদ্রের লড়াইয়ে আরব-হিন্দ মহাসাগরে পর্তুগীজদের সমকক্ষ আর কোন শক্তি নেই। বাধ্য হয়ে একের পর এক হিন্দুস্তানী রাজ্য বানিজ্য চুক্তি করতে থাকে পর্তুগীজদের সাথে।
ফ্রান্সিস্কো ডি আলমেইদা আফন্সো ডি আলবুকার্কের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে ফিরে যান পর্তুগালে, যাবার পথে আফ্রিকার খোইখোই উপজাতির সাথে লড়াইয়ে নিহত হন।
আলবুকার্ক ক্ষমতা হাতে নেয়ার পরপরই দ্রুত গোয়া জয় করে নেন বিজাপুর সালতানাতের হাত থেকে। তার নৃশংস গোয়া ক্যাম্পেইনে নিহত হয় হিন্দু-মুসলিম মিলে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। পরের বছরখানেকের মধ্যেই সুদুর মালাক্কা দ্বীপপুঞ্জে অভিযান চালান আফন্সো, মালাক্কা মাত্র কিছুদিন আগেই থাইল্যান্ডের শ্যামরাজ্য থেকে স্বাধীন হয়েছিল। মালাক্কার অবস্থান এমন এক জায়গায় যে, মালাক্কা প্রনালীর দখল যার হাতে, সে নিয়ন্ত্রন করতে পারে হিন্দুস্তান ও চীনের মধ্যে হওয়া সমস্ত বাণিজ্য।
১৫১১ সালের জুলাই-অগাস্ট মাসে আফন্সো আলবুকারকের অভিযানের ফলে মালাক্কা পর্তুগীজদের পদানত হয়।
আফন্সো বুঝেছিলেন, আরব-হিন্দ মহাসাগরকে পর্তুগীজ মহাসাগরে পরিনত করতে হলে তা চাই স্ট্র্যাটেজিক চোকপয়েন্টগুলোর নিয়ন্ত্রন, এশিয়ায় শক্তিশালী সমর্থকগোষ্ঠী যারা তার মতই মুসলিমবিদ্বেষী এবং ডিপ্লোম্যাটিক নেটওয়ার্ক।
মালাক্কা থেকে শ্যাম (থাইল্যান্ড), ক্যান্টন (চীন) ও জাপানের রাজার কাছে পর্তুগীজদের দূত যায়। ফলে মসলার ব্যবসার পাশাপাশি চীনের সাথে হিন্দুস্তান-আরব-আফ্রিকার যে রেশম, কাপড় ও পোরসেলিনের ব্যবসা তাতেও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রন পেয়ে যায় পর্তুগাল। মামলুক সাম্রাজ্য ক্রমেই ভেঙ্গে পড়তে থাকে, আর আলবুকারকের অধীনে পর্তুগাল হয়ে ওঠে পৃথিবীর সেরা নৌশক্তি।
পৃথিবীর ইতিহাসে মহাদেশ বিজেতা আছেন কয়েকজনই, কিন্তু মহাসমুদ্র বিজয়ী আছেন কেবল একজনই, আলবুকার্ক।
পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে মনে হচ্ছিল, ইসলাম আবার পৃথিবীকে শাসন করার জন্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দশক-ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে স্প্যানিশ ও পর্তুগীজ সাম্রাজ্যের উত্থান জানান দেয়, মানবজাতির ভবিষ্যত জমিনের চেয়ে বেশি আছে সমুদ্রে, আর সমুদ্রকে যারা শাসন করতে পারবে, তাদের হাতেই থাকবে মানব সভ্যতার নেতৃত্ব, তাতে তারা যতই অসভ্য হোক না কেন।
বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তি দিয়ে বদলে দেয়া যায় ক্ষমতার মসনদ, আর ক্ষমতার মসনদই সংজ্ঞায়ন করে সভ্যতা-অসভ্যতার।
- Muhammad sajal
Powered by Blogger.