ফ্রান্সের রাসুল ﷺ অবমাননাঃ অতীত থেকে শিক্ষা ও রক্তের বদলে রক্ত

 ফ্রান্সের রাসুল ﷺ অবমাননা সুলতান আবদুল হামিদের গর্জন

১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দ। সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের শাসনকাল। ঘরে-বাইরে শত্রু। অভ্যন্তরীণ আর বহিরাগত চক্রান্তে উসমানি খেলাফত অনেকটা দুর্বল। অনেকটা নেতিয়ে পড়েছে এককালের ক্ষমতাধর এই পরাশক্তি। সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করছেন বেশিদিন হয়নি। খেলাফতের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে। অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতির মোকাবেলা করে চলছেন সুলতান।
এমনই এক সঙ্কটাপন্ন মুহূর্তে খবর এলো, ফরাসি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির চলচ্চিত্রনির্মাতা কুলাঙ্গার ‘হেনরি ডে বর্নিয়ার’ (Henri de Bornier) মুসলমানদের কলিজার টুকরো হজরত মুহাম্মাদ ﷺ-এর শানে অবমাননাকর ফিল্ম তৈরি করেছে। এরপর শুধু ফ্রান্স নয়; গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে এই ফিল্মের আলোচনা। ইউরোপবাসী যেন মুখিয়ে আছে- এই ফিল্মটি উপভোগ করার জন্য।

খবরটি শোনামাত্র ক্ষুধার্ত শার্দূলের মতো গর্জে উঠলেন সুলতান। হুঙ্কার দিয়ে বললেন, ‘বনু উসমানের শাসন নরকে যাক; যদি আমি এই নাপাক ফিল্মটা বন্ধ করতে না পারি’!

এরপরই সুলতান ফ্রান্সে অবস্থানরত উসমানি দূত সালেহ মুনির পাশার মাধ্যমে ফ্রান্স সরকার প্রধান ‘সাডি কার্নোট’ (Sadi Carnot)-কে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে একটি অগ্নিঝরা চিঠি প্রেরণ করেন। চিঠির ভাষা ছিল খুবই উত্তেজক! লোমহর্ষক! ভয়ানক!

এখানেই শেষ নয়; উসমানি সেনাবাহিনীকে ইউনিফর্ম পরে যুদ্ধের দামামা বাজানোর নির্দেশ দিয়ে দেন সুলতান। নিজেও যুদ্ধের পোশাক পরে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে খেলাফতের রাজধানী ইস্তাম্বুলে অবস্থানরত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত ‘লে কমট ডে মন্টেবেল্লো’ (Le Comte De Montebello)-কে তলব করেন।

ফরাসি রাষ্ট্রদূত মনে করেছিল, নিশ্চয় সুলতান ফিল্ম প্রসঙ্গে কথা বলার জন্য তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। হয়তো তিনি তার হাতে একটি প্রতিবাদমূলক চিঠি দিয়ে ফ্রান্স সরকারের কাছে পাঠানোর আদেশ করবেন। কিন্তু না, ইস্তাম্বুলের রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করতেই রাষ্ট্রদূতের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়! যুদ্ধের ইউনিফর্ম পরিহিত সেনাদের দেখামাত্রই সে ভড়কে উঠে!

এরপর যখন দেখতে পায়, স্বয়ং সুলতানই যুদ্ধের পোশাক পরে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে আছেন, তখন তো তার মূর্ছা যাওয়ার পালা! সুলতান অগ্নিমূর্তি ধারণ করে নাটকের ব্যাপারে তাকে শাসিয়ে বললেন, ‘তোমার সরকারকে বোলো—যদি ফিল্মটি সম্প্রচার করা হয়, তাহলে ফ্রান্সের সাথে উসমানি খেলাফতের সবধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা হবে।’

ফরাসি রাষ্ট্রদূত সুলতানের কথা মাথা পেতে মেনে নিয়ে কুর্নিশ করে কোনোরকম খেলাফতের দরবার ত্যাগ করে হাফ ছেড়ে বাঁচে! দরবার থেকে বেরিয়েই সে প্যারিসের উদ্দেশে যে চিঠি লিখেছিল তার সারমর্ম ছিল, “ফিল্মটির কারণে উসমানীয়রা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। শীঘ্রই এটি বন্ধ করে দেওয়া হোক।”

চিঠি পৌঁছার সাথে সাথে ভয়ে ফরাসি সরকারের গায়ের পশমগুলো খাড়া হয়ে যায়। তৎক্ষণাৎ ফিল্মটি বন্ধ করে দেওয়া হয়!

কিন্তু ফিল্মের নির্মাতা নিজ ইচ্ছার ওপর অটল ছিল। সে ফ্রান্সের বাইরে সম্প্রচারের উদ্দেশে ইংল্যান্ড সরকারের কাছে ফিল্মটি সম্প্রচার করার অনুমতি তলব করে। তার আশা ছিল- সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের হাত এতোদূর পর্যন্ত পৌঁছবে না। কিন্তু তার সে আশায় গুড়েবালি পড়ল।

সুলতান ইংল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘লর্ড সালিসবারি’ (Lord Salisbury)-এর মাধ্যমে ফিল্মটি সেখানেও সম্প্রচারিত হওয়া থেকে বাধা দিলেন। এমনকী গোটা ইউরোপে ফিল্মটি সম্প্রচার না হওয়ার একটি আইন প্রয়োগ করিয়ে ছাড়লেন।

কিন্তু এরপরও ফিল্মের নির্মাতা আশাভঙ্গ করেনি; সে ইংল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘লর্ড স্যালসবুরি’র পরবর্তী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘রজরেব্রি’র মাধ্যমে ফিল্মটি সম্প্রচার করার দুরভিসন্ধি আঁটে। নতুন এ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিল কট্টর ইসলামবিদ্বেষী। সে লন্ডনের কোনো এক সিনেমা পরিচালকের সাথে চুক্তিও সেরে নিয়েছিল।

এখানেও বাঁধ সাধলেন সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ! অবশেষে এই ফিল্মটি প্যারিসেই নাম ও মূল বিষয়বস্তু পাল্টিয়ে সম্প্রচারিত হয়।

[মুসলিম উম্মাহ আজ খিলাফতহারা। তাদের নেই কোনো খলিফা তথা বৈশ্বিক অভিভাবক। তাদের মাঝে আজ একজন সুলতান আবদুল হামিদ নেই বলে ফ্রান্স তার পুরোনো সেই ধৃষ্টতা প্রদর্শনের সুযোগ পেয়ে গেছে]

(সূত্র : উসমানি খেলাফতের স্বর্ণকণিকা : ১৪৪; ঈষৎ পরিমার্জিত)
- Ainul Haque Kasemi



আমি, আমার অন্তর, আমার পিতা ও মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক, হে রাসুল! সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।


একবার মুয়াবিয়া বিন হুদাইয রা. আবু জর গিফারি রা. এঁর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আবু জর রা. তাঁর ঘোড়াকে আদর করছিলেন। মুয়াবিয়া রা. তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি ঘোড়ার সাথে কি করছেন?’
তিনি জবাব দিলেন, ‘সম্ভবত এই ঘোড়ার দোআ আল্লাহ্‌ কবুল করেছেন।’
মুয়াবিয়া রা. বললেন, ‘একটা প্রাণীর কি এমন চাওয়ার রয়েছে!’
তিনি বললেন, ‘ঐ সত্ত্বার কসম যাঁর কুদরতি হাতে আমার প্রাণ- এই ঘোড়া প্রতি রাতের শেষভাগে দোআ করে,
‘ও আল্লাহ্‌ তুমি আমাকে তোমার এক বান্দার কাছে ন্যস্ত করেছো- আমার রিজিক্ব তাঁর মাধ্যমে নির্ধারণ করেছো- অতএব, আমাকে তাঁর নিকট তাঁর স্ত্রী, সন্তান এবং যাবতীয় সম্পদের চে’ অধিকতর প্রিয় করে তোলো।’
আহা! একটা ঘোড়ারও তার মনিবের প্রতি কত প্রগাঢ় প্রেম! আমরা কি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটা ঘোড়ার তার মনিবের প্রতি প্রেমের অধিক ভালোবাসতে পেরেছি!
ইবনুল আস রা. যখন মারা যাচ্ছিলেন, স্পষ্ট করেই তিনি তখন বলেছিলেন,
‘আল্লাহ্‌র রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিক প্রিয় আমার নিকট কেউই নয়। তাঁর মত শ্রদ্ধা আমার আর কারও প্রতি ছিল না। বিনয়ের জন্য আমি কখনো তাঁর দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে পারতাম না। এজন্য আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে তিনি দেখতে কেমন! আমার পক্ষে তাঁর বর্ণনা দেওয়া সম্ভব হবে না।’
বিলাল রা. যখন মৃত্যুশয্যায়। তাঁর স্ত্রী পাশে বসে শোকে মূহ্যমান হয়ে কাঁদছিলেন। অথচ মহামতি বিলাল মুচকি হেসে মৃত্যুযন্ত্রণার মধ্যেও বললেন, ‘কাল তো আমি আমার প্রিয় নবীর সঙ্গে মিলিত হতে যাচ্ছি!’
মৃত্যুও তাঁদের নিকট তুচ্ছ হয়ে পড়েছিল। সাহাবিদের তো ফাঁসির মঞ্চে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলেও তাঁরা বলতেন,
لاَ وَاللهِ الْعَظِيمِ مَا أُحِبُّ أَنْ يَفْدِيَنِي بِشَوْكَةٍ يُشَاكَهَا فِي قَدَمِ
'মহামহিম আল্লাহর কসম, আমি কখনোই চাই না যে আমার (মৃত্যুর পরিবর্তে জীবনের) বদলে তাঁর মুবারক পায়ে একটি শলাকারও আঘাত লাগুক।'
আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের সময় রোমান সম্রাজ্যের সাথে সমস্ত রাষ্ট্রীয় পত্রালাপের শুরুতে আল্লাহ্‌র একত্ববাদ আর রাসুলের নবুওয়্যাতের সাক্ষ্য থাকত।
রোমান সম্রাট আপত্তি জানিয়ে বলল, এই রীতি তার পছন্দ নয়। একইসাথে হুমকি দিয়ে লিখল- যদি এটা বন্ধ না করা হয় তবে রোমান স্বর্ণমুদ্রায় রাসুলের নামে অসম্মানজনক লেখা মুদ্রিত করে দেওয়া হবে।
তখনও ইসলামী সম্রাজ্যে নিজস্ব স্বর্ণমুদ্রা ছিল না। ইয়াজীদের পুত্র খালিদ খলিফাকে পরামর্শ দিলেন, ইসলামী সম্রাজ্যে রোমান মুদ্রা নিষিদ্ধ করে সব লেনদেন অবৈধ ঘোষণ করতে।
এরপর ইরাকে টাকশাল স্থাপন করে থেকে মুদ্রা তৈরি করা শুরু হয়। এবার আরও বিস্তারিতভাবে আল্লাহ্‌র একত্ববাদের ঘোষণা আর রাসুলের মর্যাদার প্রসঙ্গ মুদ্রিত করে দেওয়া হল মুদ্রায়।
যেহেতু প্রাচ্যের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছাড়া পশ্চিমের চলা দূরুহ ছিল, তাই বাধ্য হয়ে রোমানদেরও এই মুদ্রা ব্যবহার করতে হত।রোমান সম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এর প্রভাবে বড়ো আকারে ধাক্কার মুখোমুখি হয়। ওর
বিপরীতে ইসলামী অর্থনীতিও ব্যাপক সমৃদ্ধ হয়। উম্মাহর সেই তেজ আর এখন নেই। নেই সেকালের ঐশ্বর্যও। এখন নিজেরা দাঁতভাঙা জাবাবের বদলে আমরা বরং ওদের কাছে উল্টো প্রার্থনা করি।
ইসলামের উপর যত পদ্ধতিতে আঘাত আসে, তার সবকিছুকে সেভাবেই মোকাবিলা করা উচিত। স্বর্ণমুদ্রা প্রবর্তনের ঘটনা এর একটা প্রোজ্জ্বল নমুনা। আজ তো সেইরকম কোনও রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের শাসক নাই। আহা!
নবীর প্রকৃত অনুসারীরা যতদিন ছিলেন...ততদিন এই জমিনে তাঁর ইজ্জতে আঘাত হানার সাহস কেউ করতে পারে নি। তাঁরা তাঁকে ভালোবাসতে জানতেন। আমরা তো ভালোবাসতে জানি না। আহা! এ তো আমাদের লজ্জা! অপারগতা!
ফিদাকা নাফসি
ফিদাকা ক্বালবি
ফিদাকা আবি ওয়া উম্মি
ইয়া সাইয়্যিদুল মুরসালিন।
(আমি, আমার অন্তর, আমার পিতা ও মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক, হে রাসুল! সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।)
Arju Ahmad
Powered by Blogger.