"উইঘুরিস্তান" লেখাঃ নুসরাত জাহান : বাংলা ইসলামিক গল্প

বাংলা ইসলামিক গল্প "উইঘুরিস্তান" লেখাঃ নুসরাত জাহান

রাত ৮ঃ০০ টা। রেস্টুরেন্ট এর সমস্ত মেন্যু আমার ডিউটির সময়ের ভিতর রেডি করা হয়ে গেছে। ডিউটি শেষ হওয়ার পর আমি বের হলাম। আমার গন্তব্য রেস্টুরেন্ট এর গ্রাউন্ড ফ্লোরের একটি পরিত্যক্ত ঘর। সেখানে আজ আমি নওমুসলিম মেয়েদের কিছু নসীহত করবো। পুরো চীনে বিশেষ করে জিনজিয়াং এ ইসলাম ধর্ম পালনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

আমার এখনো মনে পড়ে সেই দিনের কথা। তখন আমার বয়স মাত্র ১৫। সালটা ছিলো ১৯৯৮। বাবা জমি থেকে ফিরে এসেছে। আমার বাবা চাষী ছিলেন। বাবা দুপুরের খাবারের পর আমাকে কয়েকটি হাদীস গ্রন্থ এবং কোরআন শরীফ দিয়ে বললেন এগুলো যাতে সবসময় আমার কাছে রাখি। সন্ধ্যে নাগাদ সবকিছু ঠিক ছিলো।



হঠাৎই আমাদের বাড়ির দরজায় চীনা সৈনিকদের পদাঘাতের শব্দ। চীনা সৈনিকরা তখন মনে হয় দরজা ভেঙ্গে বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। বাবা আমাকে এক কামরায় নিয়ে গেলেন এবং বললেন সকাল না হওয়া পর্যন্ত যাতে আমি এই ঘর থেকে না বের হই। বাবা চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর একটি গুলির শব্দ। মা চিৎকার করে উঠলেন। তাও আমি বাবার কথা মত কামরায় রয়ে গেলাম। আমার মন অজানা আশংকায় ভীত ছিলো।

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলাম যাতে আমার বাবা মা ঠিক থাকে। সকাল নাগাদ আমি কামরা থেকে বের হলাম। কামরাটি ছিলো বাড়ি থেকে বেশ নিচে। আমি বাড়িতে এসে দেখি সব লন্ড ভন্ড হয়ে গেছি। বাবা মাকে কোথাও খুঁজে পেলাম না।

ছোট বেলায় শুনতাম চীনারা নাকি জিনজিয়াং এর গ্রামের পর গ্রাম উজাড় করে উইঘুর মুসলিমদের ধরে নিয়ে যায়, নির্মমভাবে হত্যা করে। সেসব আমার বাবা মায়ের ভাগ্যেও ঘটলো। আমি সেদিন একা একা অনেক কেঁদেছিলাম। তারপর মনে হলো আমি এখানে থাকলে আমাকেও একই পরিণতি বরন করতে হবে। তাই আমি আমার বেশভূষা পরিবর্তন করে রওনা হলাম অজানার উদ্দেশ্যে।

অনেক দূর হেঁটে আসার পর আমি আমার অজানা ভবিষ্যৎ এর কথা ভেবে হতাশ হয়ে গেলাম। তখন মনে পড়লো বাবার একটি কথা। বাবা বলতো, মুমিন কখনো হতাশ হয় না, সাময়িক বিপদ হয়তো আসতে পারে। মুমিন যদি তার রবের প্রতি ভরসা করে ধৈর্য্য ধারণ করে, তাহলে শীঘ্রই তাঁর রব আল্লাহ তাঁর রহমতের চাদরে তাকে আবৃত করে নেবেন।

আমিও আল্লাহর ওপর ভরসা করে অজানার উদ্দেশ্যে হেঁটে চলেছি। হাঁটতে হাঁটতে পৌছালাম আকসু শহরের রেল স্টেশনে। আকসু থেকে শিনিং শহরে যাওয়ার ট্রেন একটু পর ছাড়বে। আল্লাহর ওপর ভরসা করে ট্রেনে উঠে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর ট্রেন ছেড়ে দিলো। ট্রেন ছুটে চলছিলো শিনিং শহরের দিকে। টিকিট চেক কারী আমার কাছে টিকিট দেখতে চাইলো। আমি বললাম আমার কাছে টিকিট নেই। টিকিট চেক কারী বললেন তাহলে ফাইন দিতে হবে। আমি বললাম কত? টিকিট চেককারী বললেন ৭৫০ ইউআন।

আমি আমার জামার পকেটে হাত ঢুকালাম। জামার পকেটে কয়েকদিনের টিফিনের টাকা থেকে জমানো ১০ ইউআন পেলাম। তারপর অন্য পকেটেও হাত ঢুকালাম। ঐ পকেটে কোরআন শরীফ ও হাদীস গ্রন্থ ছিলো। হাতটা একটু একটা হাদীস গ্রন্থের ভিতর ঢুকে পড়েছিলো। মনে হলো যেন ইউআনের মতো কিছু আছে এটার ভিতর। আমি সেসব টেনে বের করলাম। দেখলাম অনেকগুলো ১০০ ইউআনের নোট। আমি মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম।

তারপর গুনে গুনে ফাইন দিয়ে দিলাম। মনে মনে বলছিলাম সত্যিই আমার রব আমাকে তার রহমতের চাদরে ঘিরে রেখেছেন। দুদিন পর ট্রেন এসে পৌঁছালো শিনিং শহরে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত শিনিং শহরে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে নিজের মুসলিম পরিচয় গোপন করে টিকে আছি। আমি জানি না আমার মা বাবা বেঁচে আছে কি না। যদি বেঁচে থাকে তাহলে আমার রব অবশ্যই তাদের সাথে আমাকে মিলিয়ে দেবেন।

এসব ভাবতে ভাবতে গ্রাউন্ড ফ্লোরের পরিত্যক্ত সেই ঘরের সামনে এসে পৌঁছালাম। ঘরে ঢুকেই ব্যাগ থেকে কাপড় বের করে মাথায় হিজাবের মতো করে বেঁধে নিলাম। আমি ঘরে প্রবেশ করার সাথে সাথে নওমুসলিম মেয়েরা এবং আমার বান্ধবী সালাম দিলো। আমি সালামের জবাব দিয়ে মেঝেতে বিছিয়ে রাখা মাদুরে বসলাম।

এসব নওমুসলিম মেয়েরা কিছুদিন আগে পর্যন্ত গোমরাহিতে ছিলো। অবশেষে আল্লাহ তাদের হেদায়াত দিলেন। আমি আল্লাহর প্রশংসা ও মানবতার মুক্তির দূত প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রতি দরুদ পাঠ করে আমার কথা শুরু করলাম।

আমার কথা শেষ হয়ে যাওয়ার পর কয়েকজন বললো আমরা খুব কষ্ট করে দ্বীন পালন করছি, চীনারা আমাদের ভাই বোনদের ওপর প্রচন্ড অত্যাচার করছে, এর থেকে তাদের মুক্তির জন্য আমরা কী দোয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারি না? আমি তাদের প্রশ্নের জবাবে বললাম প্রিয় বোনেরা তোমাদের একটা সত্য ঘটনা বলছি, তাহলে তোমরা তোমাদের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে।

তারা বললো অবশ্যই আপনি বলুন। আমি বলা শুরু করলাম - আজ থেকে প্রায় ৯০০ বছর আগে ইরাকের এক ছোট শহরে এক কাঠমিস্ত্রী অত্যন্ত সুন্দর করে সোনা, হীরা জহরত দিয়ে একটি মিম্বার তৈরি করেছিলো। প্রতিদিন অনেক মানুষ সেই মিম্বারের সৌন্দর্য দেখতে আসতো। মানুষরা সেই মিম্বারের অসাধারণ সৌন্দর্য দেখে প্রতিনিয়ত অবাক হতো।

মানুষের মুখে মুখে সেই মিম্বারের কথা নানা কাহিনীর সাথে বর্ণিত হতো। মানুষজন সেই কাঠমিস্ত্রী কে জিজ্ঞেস করতো যে, এই মিম্বারটি কোন মসজিদের জন্য? তখন সেই কাঠমিস্ত্রী জবাব দিতো এই মিম্বারটি মসজিদুল আকসার জন্য। মানুষজন কাঠমিস্ত্রীর কথা শুনে হাসতো, কারণ তখন মসজিদুল আকসা খ্রিস্টানদের দখলে ছিলো।

তখন সেই কাঠমিস্ত্রী বলতো আমি তো শুধু একজন কাঠমিস্ত্রী। আমার কাজ আল্লাহর ঘরের জন্য মিম্বার তৈরি করা। আর মিম্বারকে আল্লাহর ঘরে পৌঁছানোর কাজ তো আল্লাহর ইচ্ছায় আল্লাহর কোন প্রিয় বান্দায় করবেন। তারপর একদিন এক ৮ থেকে ৯ বছর বয়সী এক বালক সেই মিম্বারের কথা শুনলো। সে মিম্বারের সৌন্দর্য এর প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে মিম্বারটি মসজিদুল আকসায় নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে দৃষ্টি দিলো।

কয়েক দশক পর সেই পর বালকের হাতেই মসজিদুল আকসা বিজিত হলো এবং সেই মিম্বার মসজিদুল আকসায় পৌঁছালো। সেই বালককে আমরা সালাহুদ্দীন আইয়্যুবী হিসেবে চিনি। তো আমার প্রিয় বোনেরা আমরা আল্লাহর দেওয়া সামর্থ্যের ভিত্তিতে আল্লাহর হুকুম পালন করবো এবং নিজের মজলুম ভাই বোনদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করবো। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে তাদের জন্য মন থেকে দোয়া করবো।

ইনশাল্লাহ আমাদের রব আল্লাহ তাদের সাহায্য করবেন। ঘরে উপস্থিতি প্রত্যেকেই বললো আমিন। তারপর আমরা অতি সাবধানতার সাথে প্রত্যেকেই নিজেদের গন্তব্য রওনা হলাম।

আমি এক নির্জন রাস্তা দিয়ে আমার বাড়ি ফিরেছি। শিনিং শহরের কুনমিং এপার্টমেন্ট এর ৬ নম্বর ফ্ল্যাট। রেস্টুরেন্ট এর প্রধান রাঁধুনি বা শেফ হওয়ায় আমাকে এই ফ্ল্যাটটি দেওয়া হয়েছে। বাড়িতে ফিরে এশার সালাত আদায় করে আমি আমার জমানো টাকা গুনছি। গুনে দেখলাম সবমিলিয়ে ৯ বছরে আমি ২৩৫০০ ইউআন জমিয়েছি।

এটা বেশ বড় অংকের অর্থ। আমি এই অর্থ জমিয়েছি একটি সংগঠন তৈরি করার জন্য। যা উইঘুর মুসলিমদের কৌশলে কিছুটা সাহায্য করতে সক্ষম হবে। রাতের খাবার খেয়ে বাবার দেওয়া ২০ বছর আগের সেই কোরআন শরীফ তেলওয়াত করছি। হঠাৎই কলিংবেল বেজে উঠলো। আমি সবকিছু ঠিকঠাক করে দরজা খুললাম।

দেখলাম বাইরে চীনা পুলিশ দাঁড়িয়ে। তারা আমার অনুমতি না নিয়ে ভিতরে ঢুকলো এবং বললো আপনাকে কোন নামে ডাকবো? মিয়োকো না ইয়াসমিন আমি বললাম মানে? তারা বললো চালাকি করার চেষ্টা করবেন না। আপনার সব কিছু আমরা ধরে ফেলেছি। আমি উপায়ন্তর না দেখে টেবিলে থাকা দুটি কাঁচের থালা তাদের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে লিফট দিয়ে এপার্টমেন্ট এর নিচে নেমে গেলাম।
নিচে নেমেও আমার রক্ষা হলো না। তারা আমাকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করলো। আমি ফাঁক দিয়ে ছুটে পালালাম তারা আমার পায়ে গুলি করলো। আমি তাও ছুটতে লাগলাম তারা আমার হাতেও গুলি করলো। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে জ্ঞান হারালাম। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন আমি নিজেকে সুন্দর কামরায় আবিষ্কার করলাম। আর সামনে বসেছিলেন এক হিজাব পরিহিতা নারী। তারপর -

উইঘুরিস্তান পর্ব - ০১ লেখাঃ নুসরাত জাহান [গল্পটি কাল্পনিক]
Powered by Blogger.