সন্ত্রাসী খৃষ্টানদের ধর্মীয় সন্ত্রাস ও যুদ্ধ অপরাধের জন্য কেনো পুরো ক্রিসচিয়ানিটিকে দোষারোপ করা হয় না। কেনো মুসলিম ও ইসলামকেই বার বার আঘাত করা হয়?

সন্ত্রাসী খৃষ্টানদের ধর্মীয় সন্ত্রাস ও যুদ্ধ অপরাধের ছোট একটি ইতিহাস এবং লাখ লাখ খুনাখুনির পরেও ওরা কীভাবে মানবতার কথা বলে?

মধ্য জুলাই, ১৯৯৫, স্রেব্রেনিৎসা। সার্বদের হাতে শহরটির পতন ঘটেছে। বিজয়ের নিশান হিসেবে সর্বত্র সার্বিয়ান পতাকা উড়ছে পত পত করে। এরই মধ্যে একদিন বসনিয়ান সার্ব মিলিটারি হাইকমান্ড হতে স্রেব্রেনিৎসাতে অবস্থানরত সৈন্যদের কাছে ফোন এল, সার্ব সেনাপ্রধান জেনারেল রাতকো ম্লাদিচ (Ratko Mladić) একটি বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন। শহরটি দখলে নিতে যে সমস্ত গ্রীক যোদ্ধারা অংশগ্রহণ করেছিল তাদের সম্মানে সার্বিয়ান পতাকার পাশাপাশি গ্রীক পতাকা উত্তোলনের জন্যও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি [১]। 

১৯৯৩ সাল থেকেই সার্বদের পক্ষ নিয়ে গ্রীকরা দলে দলে অংশগ্রহণ করতে থাকে এই যুদ্ধে, স্রেব্রেনিৎসায় মুসলিম নির্মূলীকরণেও তাদের অনেকেই অংশগ্রহণ করেছে [২]। গ্রীক ভলান্টিয়ার গার্ড (Greek Volunteer Guard or “Ελληνική Εθελοντική Φρουρά” in Greek) নামে পরিচিত এই বাহিনী স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যায় বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। 

স্রেব্রেনিৎসার পতন গ্রীক মিডিয়ায় মহাসমারোহে প্রচার করা হয়, একে দেখানো হয় গ্রীক-সার্ব যৌথ অর্জন হিসেবে। গ্রীসের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে এই গণহত্যায় অংশগ্রহণ করা সৈন্যেদের অডিও-ইন্টারভিও তুমুল আগ্রহের সাথে প্রচার করা হয় [৩]।

 গ্রীকরা বরাবরই সার্বদের নিঃস্বার্থ সমর্থন দিয়ে গেছে এই অন্যায় যুদ্ধে। গ্রীক অর্থোডক্স চার্চের আর্চবিশপ সেরাফিমের (Seraphim of Athens) আমন্ত্রণে রডোভান কারাজ্জিচ (Radovan Karadžić, বসনিয়ার গণহত্যার অন্যতম প্রধান মাস্টারমাইন্ড) যখন ১৯৯৩ সালে গ্রীসে যায় তখন তাকে (রডোভান কারাজ্জিচ) এক বিশাল সমাবেশে খৃষ্টানদের নায়ক হিসেবে অভিহিত করা হয় [৪]। 

এথেন্সের এক সমাবেশে রডোভান কারাজ্জিচও ঘোষণা দেয়, “আমাদের সার্বেদের পাশে রয়েছে শুধুমাত্র ঈশ্বর ও গ্রীকরা” [৫]। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় পতিত হবার পরও সার্বরা গ্রীকদের কাছ থেকে অস্ত্রের চালান লাভ করতে থাকে [৬]।


কিন্তু, ভিন্ন ভাষাভাষী ও জাতীয়তা সত্ত্বেও গ্রীক ও সার্বদের মধ্যে এত সখ্যতা কেন? কারণটি ধর্মীয়, তারা উভয়ই খৃষ্টান ধর্মের অর্থোডক্স মতবাদে বিশ্বাসী। 

তাই যুদ্ধ শুরু হতেই আর্চবিশপ সেরাফিম ঘোষণা দেয় যে, “গ্রীক অর্থোডক্স চার্চ অর্থোডক্স সার্বদের পাশেই রয়েছে’’ [৭]। সার্ব সৈন্যদের মনোবল বৃদ্ধির লক্ষ্যে গ্রীক অর্থোডক্স পাদ্রীরা নিয়মিত যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করত, তাদের (সার্ব) সাহস যোগাত [৮]। 

তাছাড়া সৈন্য ও অস্ত্র দিয়ে নিয়মিত সাহায্য করা তো চলমান ছিলই। তাছাড়া আরও একটি ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। পূর্বে গ্রীস ও সার্বিয়া উভয়েই ওসমানী খিলাফতের অধীনে ছিল। মুসলিমদের, বিশেষতঃ তুর্কিদের ঘৃণা করা হচ্ছে তাদের জাতীয় চেতনার অংশ।

 আজও তারা বলকানের মুসলিমদের তুর্কি নামে ডাকে, যদিও বলকানের মুসলিমদের অধিকাংশই স্লাভিক বা আলবেনিয়ান ভাষাভাষী। বলকানের মুসলিমদের তারা তুর্কি লিগ্যাসি (legacy) হিসেবে ধরে, এবং এই লিগ্যাসিকে তারা ঘৃণা করে ও এর থেকে মুক্তি পেতে চায়। 

যাই হোক, গ্রীক ও সার্বরা কিন্তু তাদের ধর্ম ও ঐতিহ্য ভুলে যায়নি। গ্রীসের একটি দৈনিক জাতীয় পত্রিকা এথনোসের (Ethnos) রিপোর্টে আসে যে, স্রেব্রেনিৎসা দখলের পর গ্রীক-সার্ব সম্মিলিত বাহিনী সার্বিয়ান ও গ্রীক পতাকার সাথে সাথে বাইজেন্টিয়াম পতাকাও উত্তোলন করে [৯]।

 এই বাইজেন্টিয়াম পতাকা হচ্ছে বাইজেন্টাইন (পূর্ব রোমান) সাম্রাজ্যের প্রতীক। এই পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য তথা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ছিল অর্থোডক্স মতবাদের ধারক ও বাহক। তাদের দ্বারাই অর্থোডক্স মতবাদ দিক্বিদিক ছড়িয়ে পড়ে। 

রাশিয়া, ইউক্রেইন, বেলারুশ, সার্বিয়া, মন্টেনিগ্রো, মেসিডোনিয়া, বুলগেরিয়া, গ্রীস প্রভৃতি দেশগুলোর অধিকাংশ মানুষ আজ অর্থোডক্স খৃষ্টান মতবাদের অনুসারী, এটি মূলত বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের কৃতিত্ব। এখানে প্রাসঙ্গিক একটি কথা উল্লেখ করতে হয় যে, গ্রীকদের পাশাপাশি উপরোল্লিখিত দেশগুলো থেকেও বড় বড় মার্সেনারি (mercenary) দল সার্বদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে, বিশেষতঃ রাশিয়া, ইউক্রেইন ও বুলগেরিয়া থেকে, তবে গ্রীকদের সংখ্যাই ছিল সবচেয়ে বেশী। 

যাই হোক এখন মূল কথায় ফিরে আসি, এই সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে ১৪৫৩ সালে, মুহাম্মদ আল ফাতিহ’র হাতে। স্রেব্রেনিৎসায় মুসলিমদের কচুকাটা করে তাঁদের লাশের উপর বাইজেন্টিয়ামের পতাকা উত্তোলন করে তারা এই বার্তাই দিতে চেয়েছিল যে, মুসলিমদের সাথে তাদের পুরনো শত্রুতা এখনও শেষ হয়ে যায়নি, হিসেব-নিকেশ এখনও অনেক বাকি রয়েছে। 

এটি স্রেফ জাতিবাদী সহিংসতা ছিল না বরঞ্চ এই সন্ত্রাসের পিছনে ধর্মীয় কারণও প্রবল ছিল। আদতে এটি ছিল একটি বিশাল ধর্মীয় সন্ত্রাস। এই যুদ্ধটি নেহায়েত আরেকটি সাধারণ যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরঞ্চ একটি ধর্মযুদ্ধে পরিণত হয়েছিল। একটি নব্য ক্রুসেড, ভিন্ন রূপে, ভিন্ন নামে।


যাই হোক, যুদ্ধ (পড়ুন ক্রুসেড) শেষে এই সমস্ত সৈনিকরা সার্বদের কাছে বিশাল সম্মাননা প্রাপ্ত হয়ে নিজ দেশে ফিরে আসল। ততদিনে সারাবিশ্বে ছিঃ ছিঃ রব উঠেছে। স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার সমালোচনায় বিশ্ববিবেক মুখর হয়ে উঠেছে। 

আপনি ভাবতে পারেন যে, শুরুর দিকে গ্রীক জনগণ হয়ত বসনিয়ার মুসলিমদের উপর চলা গণহত্যা ও রেইপ ক্যাম্পগুলোর ব্যাপারে জানত না, তাই তারা নিঃস্বার্থ সমর্থন দিয়ে গেছে এই যুদ্ধে। স্রেব্রেনিৎসার পর নিশ্চয়ই জনগণের চাপে গ্রীক সরকার এই সমস্ত সৈনিকদের বিচারের আওতায় এনেছে। অন্ততঃ নিজদের মুখ বাঁচানোর জন্য হলেও গ্রীস এদেরকে ন্যূনতম কিছু শাস্তি দিয়েছে। 

যেহেতু, গ্রীস ইউরোপের একটি উন্নত প্রগতিশীল দেশ, সেহেতু তারা নিশ্চয়ই লিবারেলিজম, হিউম্যানিজম ও মানবতায় বিশ্বাসী। সুবিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বসনিয়ান ভিক্টিমদের ধর্মীয় পরিচয় তাদের গোণায় ধরার কথা না। আফটার অল, এই গ্রীসই হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইনলাইটেনমেন্টের সমস্ত তত্ত্বের প্রধান উৎস। 

কিন্তু, দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে, এই সমস্ত যুদ্ধফেরত সৈন্যদের তারা সাদরে গ্রহণ করেছে। এদেরকে গ্রীসের পলিটিক্সে জায়গা করে দিয়েছে। যুদ্ধের নামে ধর্মযুদ্ধ ও স্রেব্রেনিৎসায় এত বড় ধর্মীয় সন্ত্রাসে অংশগ্রহণ করার পরও তারা সমাজে অপাংক্তেয় হয়ে যায়নি, বরঞ্চ আরও শক্তিশালী অবস্থান দখল করেছে।

 গোল্ডেন ডন (Golden Dawn, “Χρυσή Αυγή” in Greek) নামে যে নিও-ফ্যাসিস্ট দল এই সমস্ত সৈন্যদের একটি বড় অংশ সরবরাহ করেছে, তারা আজ গ্রীসের তৃতীয় বৃহত্তম পলিটিকাল পার্টি। গত বছরের জুলাইতে সংঘটিত গ্রীসের জাতীয় নির্বাচনে এরা মোট ৭% ভোট পেয়েছে ও ১৮ জন এম্পিকে পার্লামেন্টে পাঠিয়েছে [১০]।

 এরা উত্তরোত্তর আরও শক্তিশালী হচ্ছে। এখানে, একটি কথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, ধর্মীয় কারণে অন্য দেশ ও জাতির যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার বিষয়টি সব ধর্মের মানুষের মধ্যেই উপস্থিত, এবং খৃষ্টানদের মধ্যে এটি প্রবল। তবে মূল লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে যুদ্ধটি কি যৌক্তিক নাকি অযৌক্তিক, ন্যায় নাকি অন্যায়ের।


জানা বিষয় হল, শুরু থেকেই বসনিয়ার এই যুদ্ধটি ছিল বসনিয়াক মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দেয়া একটি অন্যায় যুদ্ধ, এবং এটি এমন একটি যুদ্ধ যেখানে আসলে গ্রীকদের পাওয়ার কিছুই ছিল না। ধর্মীয় কারণ ছাড়া গ্রীকদের এই অন্যায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার আর কোনও কারণ নেই।

 সার্বদের সহায়তার নামে ধর্মযুদ্ধ ও ধর্মীয় সন্ত্রাস করবার পরও গ্রীকদের আপনি কখনও দেখবেন না যে, তারা এ নিয়ে বিন্দুমাত্র লজ্জিত। বরঞ্চ, তারা এ নিয়ে বেজায় গর্বিত। 

সুপ্রমানিত ধর্মীয় মোটিভে এই গণহত্যা ও ধর্ষণযজ্ঞে অংশগ্রহণ করবার পরও আপনি কোন অর্থোডক্স পাদ্রীকে ইমোশনাল হয়ে বলতে শুনবেন না যে, ''খৃষ্টান ধর্ম এমন নয়, এই সমস্ত সন্ত্রাসীদের সাথে আমাদের ও আমাদের ধর্মের কোন সম্পৃক্ততা নেই। খৃষ্টান ধর্ম বিধর্মীদের গণহত্যা ও তাদের নারীদের ধর্ষণের অধিকার দেয় না''। 


কোন মিডিয়া আউটলেটে এদেরকে খৃষ্টান সন্ত্রাসী বা ধর্মযোদ্ধা হিসেবে আখ্যায়িত করা হবে না, এদের নাগরিকত্ব বাতিলের ডাক দেয়া হবে না। সরকার এদেরকে জেলে ভরবে না, বরঞ্চ আরও ক্ষমতাধর বানিয়ে দিবে। খৃষ্টান জনসাধারণকে এই জন্য গদগদ হয়ে কান্নাভেজা চোখে বসনিয়াকদের কাছে ক্ষমা চাইতে দেখবেন না। 

তাদের কখনও এটা বলতে শুনবেন না যে, খৃষ্টান ধর্ম আমাদের এরূপ কিছু শিখায় না, এটি আমাদের শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ ভাবে সহাবস্থান বজায় রাখার সবক দেয়। এবং এই নিয়ে তাদের কেউ প্রশ্নও করে না, বা তাদের এপোলজিও কেউ চায় না।

অন্যদিকে, মুসলিমদের অবস্থাটা দেখুন। সাম্প্রতিককালে আইসিসে (ISIS) ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে কিছু মুসলিম অংশগ্রহণ করে যোদ্ধা হিসেবে, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় আমেরিকা ও ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদীদের ক্রমাগত আগ্রাসনের দরুন অনেকেই হতাশ হয়ে এতে ভুলবশতঃ অংশগ্রহণ করেছে।

জনসংখ্যার বিচারে এরা হয়ত পুরো পৃথিবীর মুসলিম জনগোষ্ঠীর ০.০০০৫% ও হবে না, কিন্তু মিডিয়ার প্রোপ্যাগান্ডার কারণে বিষয়টা এমন দাঁড়িয়েছে যেন পুরো মুসলিম সমাজই আইসিসে যোগ দিয়েছে, যেন ধর্মের জন্য ভিন্ন একটি দেশ বা জাতির যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার বিষয়টি মুসলিমদের মধ্যে ইউনিক, যেন খৃষ্টান বা অন্য ধর্মানুসারীরা এমনটি করে না। 

অথচ যেখানে খৃষ্টানরা তাদের ধর্মীয় সন্ত্রাসী ও যুদ্ধাপরাধীদের নায়কোচিত সম্মান দিয়েছে, সেখানে শুরু থেকেই পৃথিবীর ৯৯.৯৯% মুসলিম আইসিসের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে ও এর সাথে নিজেদের ও ইসলামের সম্পৃক্ততা ক্রমাগত প্রত্যাখ্যান করে আসছে। 

তারপরও, অমুসলিমদের মন ভরছে না। বড় বড় মুসলিম শাইখরা নিজেদের এপোলজি লেটার লিখতে ব্যস্ত, মিডিয়ায় আমন্ত্রিত হলে কীভাবে ডিফেন্সিভ খেলবে তার ছক প্রস্তুত করতে গিয়ে গলদঘর্ম। 

অথচ, এই মিডিয়াগুলো কিন্তু গ্রীক, রাশিয়ান, ইউক্রেনিয়ান অথবা বুলগেরিয়ান খৃষ্টানদের কখনও এই প্রশ্ন করবে না যে, কেন অন্য দেশের যুদ্ধ সত্ত্বেও তারা দলে দলে অংশগ্রহণ করেছিল? আধুনিক বিংশ শতাব্দীতে এসেও কেন তারা ধর্মের ডাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে? না, এই প্রশ্নগুলো তাদের করা হবে না, সব দায় শুধু মুসলিমদের। 

পশ্চিমা মিডিয়াগুলোকে তাদের এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড নীতির ব্যাপারে প্রশ্ন করার মুরোদ নেই কারও। শামীমা বেগম নামে এক ব্রিটিশ নারী যে কিনা আইসিসে অংশগ্রহণ করেছিল, এবং পরবর্তীতে নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসতে চাচ্ছে ব্রিটেনে, তাকে আসতে দেয়া হচ্ছে না। 

তার নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে, এবং সেটি উদ্ধারের জন্য তাকে প্রাণান্ত যুদ্ধ করে যেতে হচ্ছে; অধিকাংশ পশ্চিমা মিডিয়াই তাকে ভিলেন বানানোর জন্য নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছে। এই শামীমা বেগম কিন্তু সরাসরি কোন যুদ্ধাপরাধের সাথে যুক্ত নয়, অথচ তার কারণে পশ্চিমের মুসলিমরা পারলে লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যায়।

 অন্যদিকে, যুদ্ধাপরাধীদের (এমনকি স্রেব্রেনিৎসার গণহত্যায় সম্পৃক্ত যুদ্ধাপরাধী) পার্লামেন্টের মেম্বার এমনকি প্রেসিডেন্ট/ প্রাইম মিনিস্টার বানিয়েও খৃষ্টানরা কোন লজ্জা অনুভব করে না।

 শাবরা ও শাতিলায় মুসলিমদের উপর প্রোগ্রোম করেও লেবানিজ মেরোনাইট খৃষ্টানদের মিলিশিয়া লিডার এলি হোবেইকা (Elie Hobeika) পরবর্তীতে লেবাননের পার্লামেন্টের সদস্য হয়, আরিয়াল শ্যারন (Ariel Sharon) হয় ইজরাইলের প্রধানমন্ত্রী। খৃষ্টান ও ইহুদীদের (সমস্ত অমুসলিমদের) বিবেক তখন মনে হয় আর কাজ করে না।


অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, কোথাও কোন সন্ত্রাসী হামলা হলেই দুনিয়ার ২০০ কোটি মুসলিমদের সবার ঘাড়ে দায়িত্ব এসে যায় নিজেদের শান্তিপ্রিয় প্রমাণে। গোটা দুনিয়া মুসলিমদের এপোলজি চেয়ে বসে। 

ফেসবুকের প্রতিটি কোণা মুসলিমদের দুঃখ-প্রকাশ করে দেয়া স্ট্যাটাসে ভরে যায়। খ্যাতনামা শাইখরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে যায় ইসলামকে নির্দোষ প্রমাণে। অফিস-আদালত থেকে স্কুল-কলেজ সর্বত্র মুসলিমদের কাছে এর কৈফিয়ত চাওয়া হয়।

 ফ্রান্সে কোন সন্ত্রাসী হামলা হলে ভারতের মুসলিমরা তোপের মুখে পড়ে, অথচ দুটি দেশের জনগণের মধ্যে কোনই সম্পৃক্ততা নেই। অস্ট্রেলিয়াতে কিছু হলে প্রশ্ন ও তীব্র আক্রমনের সম্মুখীন হয় ইউরোপের মুসলিমরা। অথচ, দুটি মহাদেশের মধ্যে হাজার হাজার মাইলের পার্থক্য। 

কোন অনভিপ্রেত কিছু ঘটলেই ইসলামকে কাঠগড়ায় তোলা হয়, এবং সাথে সাথে মুসলিমদেরও দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায় ইসলামকে রক্ষায়। অথচ, নিউজিল্যান্ডে ব্রেন্ডন টেরেন্টের মসজিদে হামলার পরও (যা সুনিশ্চিতভাবে ক্রুসেডীয় চিন্তাধারা হতে প্রসূত) খৃষ্টানদের আপনি সমবেতভাবে দাঁড়িয়ে যেতে দেখেননি খৃষ্টান ধর্মের সাফাই গাইতে। 

তাদেরকে কখনো কেউ এই প্রশ্ন করে না যে, খৃষ্টানরা কেন সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছে? তার মানে কি খৃষ্টান ধর্মের মধ্যেই সমস্যা আছে? গ্রীকদের (বা রাশিয়ান, ইউক্রেনিয়ান, বুলগেরিয়ান) ধর্মীয় সন্ত্রাস ও যুদ্ধ অপরাধের জন্য কখনো পুরো ক্রিসচিয়ানিটিকে দোষারোপ করা হয় না। 

তাদের অপরাধের কৈফিয়ত কোন ইংরেজ বা ফ্রেঞ্চের কাছে কখনো চাওয়া হবে না। কিন্তু, মুসলিমদের যে কোন অপরাধ তা যত ছোটই হোক আর বিশ্বের যে প্রান্তেই ঘটুক এর দায় সমস্ত মুসলিম ও ইসলামের উপর।

কিন্তু আমরা কেন এমন করছি? তাদের আক্রমণে কেন আমরা আরও বেশী নতজানু হয়ে সুবোধ বালক-বালিকার মত আচরণ করছি? আমাদের মুসলিমদের রক্ত কি আমাদের কাছেই অর্থহীন হয়ে গেল? আমরা কি নিজেদের ধর্ম নিয়ে সন্দিহান, ভুগছি মনঃকষ্টে? 

পশ্চিমাদের তৈরি করে দেয়া ছাঁচ কি আমরা বিনাবাক্যে গ্রহণ করে নিচ্ছি? তাদেরকে সুপেরিয়র হিসেবে ধরে নিয়ে উল্টো প্রশ্ন করার সাহস হারিয়ে ফেলছি? নিজেরা এত লজ্জিত অনুভব করছি কেন এদের কাছে, যখন এরাই এই সমস্ত লজ্জার ধার ধারছে না?

নিজেদের ব্যাপারে আমরা একটু চিন্তা করি। দুর্বলতাটা খুঁজে বের করি। সময় এসেছে নতুন করে ভাবার। এত বড় বড় সব যুদ্ধাপরাধ করেও যদি অমুসলিম ও তাদের ধর্মের উপর কোন দায়ভার না আসে তাহলে গুটিকয়েক বিপথগামীর জন্য ইসলাম ও মুসলিমরা কেন দায়ঃগ্রস্ত হবে?

 কেন সবসময় আমাদের কাছেই কৈফিয়ত চাওয়া হবে? সন্ত্রাসীদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করতে দিয়েও অমুসলিমরা কেন প্রশ্নের সম্মুখীন হবে না? অথচ, মুসলিমরা প্রতিনিয়ত ইসলামের নামে ঘটা বিভিন্ন সন্ত্রাসের তীব্র সমালোচনা করার পরও তাদের কাছে থেকে কেন আরও কৈফিয়ত চাওয়া হচ্ছে?


তাই সময় এসেছে, পশ্চিমাদের এই সমস্ত ডাবল স্ট্যান্ডার্ডগুলো সম্পর্কে সচেতন হবার। সময় এসেছে দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা দেবার, যদি ভয়াবহ সব যুদ্ধাপরাধ করার পরও অপরাধের কোন দায়ভার সেই অপরাধীর ধর্ম ও সমাজ না নেয়, তাহলে সেই সমস্ত ধর্মের অনুসারীদেরও অধিকার নেই অতি অল্প সংখ্যক পথভ্রষ্টের জন্য ইসলাম ও মুসলিমদের কাঠগড়ায় দাড় করানোর।

বিষয়টি নিয়ে তাই একটু গভীরভবে ভাবার জন্য আহবান করা হল।

তথ্যসূত্রঃ
১/ NIOD Srebrenica: a 'safe' area Part III - The fall of Srebrenica, p413"
২/ OMRI Daily Digest II, No. 136, 14 July 1995
৩/ Howden, Daniel. "Greek role in Srebrenica massacre investigated; The Independent.
৪/ Eastern Orthodoxy in a Global Age: Tradition Faces the 21st Century. AltaMira Press. p. 86.
৫ এবং ৬/ Smith, Helena (5 January 2003). "Greece faces shame of role in Serb massacre”; London, The Guardian.
৭ ও ৮/ Eastern Orthodoxy in a Global Age: Tradition Faces the 21st Century. AltaMira Press. p. 86.
৯/ Ethnos, July 13, 1995
১০/ Neo-fascist Golden Dawn party crashes out of Greek parliament; Al-Jazeera, July 08, 2019
বিঃ দ্রঃ ছবিতে গ্রীক সৈন্যদের সাথে রডোভান কারাজ্জিচ ( লাল মার্ক করা)

লেখক - Monem Ibn Mohammed 
Powered by Blogger.