২য় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর ইতিহাসের এক টুকরো | আবিসিনিয়ার উপর ইতালির নির্মম নির্যাতন ধর্ষণ লুণ্ঠন

২য় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর ইতিহাসের এক টুকরো | আবিসিনিয়ার উপর ইতালির নির্মম নির্যাতন ধর্ষণ লুণ্ঠন । ২য় বিশ্বযুদ্ধ কেন হয়েছিল



  1. ২য় বিশ্বযুদ্ধ কেন হয়েছিল
  2. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কবে হয়েছিল
  3. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি আত্মসমর্পণ
  4. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের ভূমিকা
  5. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মুসোলিনি 


"ইতালিয়ান ইনভেনশন অফ (ইথিওপিয়া) আবিসিনিয়া বা ১৯৩৫-৩৬ সালের আবিসিনিয়ান ক্রাইসিস..."
৩ অক্টোবর, ১৯৩৫ সাল- ইতালিয়ান ফোর্স বর্তমান ইথিওপিয়া আক্রমন করে। (দ্বিতীয় ইউরোপীয়-আবিসিনিয় যুদ্ধ) এই যুদ্ধ শুধুমাত্র আফ্রিকা মহাদেশীয় ইতিহাসই বদলে দেয় নি। বরং সেই সাথে মানব সভ্যতার ইতিহাসেও গনতান্ত্রিক এবং ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্রের ইতিহাস বদলের সূচনা করেছিলো- আর তা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

উল্লেখ্য, ১৮৯৬ সালের আদওয়া যুদ্ধে (প্রথম ইউরোপীয়-আবিসিনিয় যুদ্ধ) ইতালিয়ান রয়েল ফোর্সের প্রায় ৬০০০ সামরিক সদস্য মারা যায়। প্রথমবারের মতো একক ইউরোপীয় শক্তি ধ্বংসে আফ্রিকান ইতিহাসে তা চিরস্মরনীয়।

নিজেকে রোমান সাম্রাজ্যের সমরনায়ক আর রাষ্ট্রনায়ক জুলিয়াস সিজার এর সাথে তুলনা করা- ইতালির ফ্যাসিবাদী নেতা বেনিতো মুসোলিনি নতুন রোমান সাম্রাজ্য তৈরীর স্বপ্নে বিভোর, ইতালির কলোনি রাষ্ট্র সমূহ যেমন- লিবিয়া, আবিসিনিয়া (ইথিওপিয়া) সহ ইতালিয়ান সোমালিল্যান্ড (সোমালিয়া) কে ইতালির নখদর্পনে (নিজের) রাখায় -নিজ সরকার আর জনগণ সাধারণকে জাতীয়তাবাদের প্রেমে উদ্বুদ্ধ করে।

আবিসিনিয়া এবং ইতালি দুই-দেশই লীগ অফ নেশনের সদস্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লীগ অফ নেশন গঠন করা হয়। যেমনটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর (লীগ অফ নেশন কে বিলুপ্ত করে) জাতিসংঘ গঠন করা হয়। কিন্তু লীগ সেই দুই পক্ষের কারো পক্ষ না নিয়ে উল্টো বরাবরের মতো মধ্যপন্থা অবলম্বন করে।

কারন পৃথিবীবাসী তখন আরেক ফ্যাসিস্ট নেতা হিটলারের উত্থান দেখাতে ব্যাস্ত। যদিও নীতিগত কারনে, তৎকালিন সেই দুই ফ্যাসিস্টের মধ্যে কিছু মতোবিরোধ ছিলো। যার ফলে হিটলারকে প্রতিরোধে ইউরোপীয়ানরা কাটা দিয়ে কাটা তোলার মন্ত্রে, মুসোলিনির সেই ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডে বরং পরোক্ষে সমর্থন দেয়।

ইতালির রাসায়নিক কারখানা গুলোতে, তখন ব্যাপক পরিমাণে কেমিক্যাল অস্ত্র আর বিষাক্ত গ্যাস মজুদ ছিলো। কমপক্ষে ৬০০০ হাজার আর্মাড পার্সোনাল কার (মেশিন গান সহ), ২০০০ আর্টিলারি গান, ৭৮৫ ট্যাংক, ৪৫০ ফাইটার প্লেন প্লাস ২০০ বোমারু বিমান সহ এবং পাঁচ লক্ষেরও অধিক সৈন্য নিয়ে- ১৯৩৫ সালে ইতালিয়ানরা আবিসিনিয়া (ইথিওপিয়া) আক্রমণ করে।

অপরপক্ষে মাত্র ৪ টা ট্যাংক, ৭ টা আর্মাড পার্সোনাল কার , ১৩ টা এয়ারক্রাফট ও আট থেকে আশি হাজার অদক্ষ এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী উপজাতীয় সৈনিকরাই ছিলো মূলত ইথিওপিয়ার সামরিক বাহিনীর মূল স্তম্ভ।

কিন্তু ইতালিান বাহিনী যুদ্ধ করে জয় করা অসম্ভব এক দেশ আক্রমণ করেছিলো- মরুভূমি, বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত দ্বারা পরিবেষ্টিত সহ জাতীগত দেশপ্রেম আর সাংস্কৃতিক মননশীল এবং প্রকৃত শিক্ষা-চেতনায় উন্নত এক দেশ ছিলো আবিসিনিয়া।

অপরদিকে উগ্র জাতীয়তাবাদের আফিমের বড়ি খাওয়া- উন্মাদ ইতালিয়ান জনগন ছিলো আফ্রিকান সেই দেশ সমূহের তেল কূপ গুলো দখলের পরিকল্পনায়। অন্যদিকে লীগ অফ নেশনের ইংল্যান্ড আর ফ্রান্স ব্যাস্ত ছিলো আফ্রিকার সেইসব প্রকৃতিক সম্পদশালী দেশ গুলোর তেলের ভাগ পেতে ফ্যাসিবাদী বেনিতো মুসোলিনির সঙ্গে সমঝোতায়।

ফলে গুটিকয়েক রাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতায় থাকা লীগ অফ নেশনসকে, বুড়ো-আঙ্গুল দেখিয়ে ইতালি ব্যাপক হারে বাতাসে আর পানিতে রাসায়নিক অস্ত্র গুলো- আবিসিনিয়ান সাধারণ মানুষের উপর প্রয়োগ করলেও, ইংল্যান্ড আর ফ্রান্স সরাসরি তার কোন প্রতিবাদ করেনি এবং লীগ অফ নেশনস তাদের প্রতিবেদনেও তার সরাসরি কোন উল্লেখ করেনি।

আত্নরক্ষাহীন আবিসিনিয়া-বাসীদের উপর কমপক্ষে টানা তিন মাস এক লক্ষ সালফার মাস্টার্ড কেমিক্যাল ওয়েপন- আকাশ থেকে নিক্ষেপ করে ইতালিয়ান এয়ার ফোর্স। পূর্বে লিবিয়াতে গনহত্যা চালনায় অভিজ্ঞতা সম্পন্ন উচ্চপদস্থ ইতালিয়ান সামরিক অফিসারদের উক্ত সময় জরুরি ভিত্তিতে ইথিওপিয়াতে প্রমোশন দিয়ে আনা হয়।

৩ মে, ১৯৩৬ সাল- শেষ আবিসিনিয়ান আর্মিকে হত্যা করার পর দখলদার ইতিলিয়ান আর্মি ঢাকঢোল পিটিয়ে যখন বিজয়ীর বেশে আবিসিনিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবাতে প্রবেশ করে- তখন অপর প্রান্তের ইতালিতে ৩০ মিলিয়ন ইতালিয়ান রাস্তায় নেমে বিজয় উদযাপন আর উৎসব-এ মেতে উঠে। অবশেষে আবিসিনিয়া ১৯৩৭ সাল থেকে লীগ অফ নেশনসের মধ্যস্থতায় ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্র দেশ সমূহের অধীনে থাকে।

ইতালি লীগ অফ নেশন ত্যাগ করে। হিটলার এই সুযোগে লীগ অফ নেশনসের দূর্বলতা গুলোকে পুঁজি করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনার দিকে এগিয়ে যায়। ১৯৩৫ সাল থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক দেশ সমূহের আধিপত্যবাদ বিস্তারের টানাপোড়েনের মাঝে পড়ে তিন লক্ষ আশি হাজারেও অধিক আবিসিনিয়ান-বাসী মৃত্যুবরণ করে।

ঐতিহাসিকগন আবিসিনিয়ান ক্রাইসিসকে উল্লেখ করেন- "স্বৈরচারীদের পরবর্তী যুদ্ধে অংশগ্রহণের মহাপরিকল্পনা হিসেবে"। ১৯৪০ সালে জার্মানী, ইতালী এবং জাপান ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের পর, অক্ষশক্তি গঠিত হয়।

ফলাফলঃ এই রাষ্ট্র গুলোর সাথে সাথেই তাদের ইউরোপ, আফ্রিকা, পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সহ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত কলোনি গুলোও, সেই অক্ষশক্তির অংশ হয়ে দাঁড়ায়। যেমনটা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য শাসিত কলোনির অংশ হিসেবে- আমরাও বাধ্য হয়ে তাদের পক্ষে প্রভুত্ব মেনে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলাম -বিনিময়ে স্বাধীনতা পাওয়ার আশায়। অথচ, উন্নত দেশ গুলোর আধিপত্যবাদ বিস্তারকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়েছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

...পৃথিবীবাসী অবলোকন করেছিলো -- কিভাবে জাতীপুঞ্জের দুর্বলতাকে কেন্দ্র করে দেশে দেশে ছোট-বড় মিডিয়া গুলোতে নিজেদের গুণ-কীর্তন প্রচারে জনগনকে ব্যস্ত রেখে ক্ষমতায় শক্ত-পক্ত হয়েছিলো হিটলার এবং মুসোলিনি।

কিভাবে মিথ্যাকে সত্য এবং সত্যকে মিথ্যা বলে আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে জার্মানি বা ইতালি নামক দেশ সহ পুরো পৃথিবীকে শেষ করে দিয়েছিলেন হিটলার আর মুসোলিনি। কিন্তু হিটলার এবং মুসোলিনি ঠিক ততদিন পর্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন যতদিন পর্যন্ত না জার্মানি আর ইতালি সহ পুরো পৃথিবীই ধ্বংস স্তূপে পরিনত হয় নি...
.
PC -- Allok Hasan

লেখাঃ Ahmed Rafique Barki
Powered by Blogger.