আমেরিকার মানবাধিকার ও শান্তির ফাকা গল্পের খবর । যুদ্ধবাজ সন্ত্রাসী আমেরিকা ইউরোপ এর আসল কাহিনি

যুদ্ধবাজ সন্ত্রাসী আমেরিকা ইউরোপ এর আসল কাহিনি এবং আমাদের পরাজিত মানসিকতা 



  • মানবাধিকারের ধারা
  • মানবাধিকারের প্রয়োজনীয়তা
  • আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশন
  • আমেরিকার খবর 
  • আমেরিকান সংবাদ
  • আমেরিকার যুদ্ধ 


লেখাটি Rakayet Rafi ভাই এর। 

ইরাক আক্রমণের সময় আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় একটা টার্ম বেশ পপুলার হয়ে উঠে । Embedded Journalism । এর মানে হল ,কোন দেশ অন্য দেশ আক্রমণ করলে সাংবাদিকরা আক্রমণকারী মিলিটারির সাথে সাথে থেকে সংবাদ প্রচার করবে । 

Embedded journalism এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল ইরাক আক্রমণের সময় সরবরাহকৃত খবরগুলো । 

সেসময় বিবিসি, সিএনএন, এনবিসি ,ফক্স -সবখানেই সংবাদ গুলো এমনভাবে দেখানো হচ্ছিল, যেন আমেরিকা একটা ভিডিও গেইম খেলতে গেছে এবং এই মিডিয়াগুলো তার ধারাবিবরণী দিচ্ছে। 

সাংবাদিকরা মিলিটারিদের সাথেই থাকতেন, তাদের সাথেই সময় কাটাতেন, তারা অভিযানে গেলে সাথেই যেতেন।তারা যা যা করছেন ,সেগুলোর খবর বলতেন । 

অপরপক্ষে কি ঘটল, ধ্বংসযজ্ঞ তাদের উপর কেমন চলল, আসলে কত মানুষ মরল - সেগুলো সব এ পক্ষ থেকে দেখানো হবে।

মিলিটারিরা যেই তথ্য দিবে তার ওপরই সবখবর ওয়াশিংটন বা লন্ডনে যাবে। এটা ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ মিলিটারি প্রথম ইউজ করে। 

কারণ , নিজ দেশের জনগণ যদি ‘full scale destruction’ এর খবর জানে তবে সেটা ইমেজের জন্য ক্ষতিকর। 

ইরাকে যখন হামলা হল , তখন সিভিলিয়ান ক্যাসুয়াল্টি কিংবা কোন বিধ্বস্ত ঘটনাস্থলের নির্বাচিত খবরের বাইরে তেমন কোন সংবাদই এসব চ্যানেল দেখাচ্ছিল না । 

এটি যে মিডিয়ায় ‘ভিডিও গেমসের মত ছিল’ তা বোঝাতে একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে ।

আমেরিকায় ফক্স নিউজের এক নিউজ প্রেজেন্টার এক সংবাদে মজা করে বলছিলেন ,

“আরও বড় কিছু আনো । MOAB (mother of all bombs ), Daisy cutter এমন কিছু । জাস্ট দুই একটা cruise missile এ শেষ করে দিও না।”


বুঝতেই পারছেন ,এসব চ্যানেলের যে বিরাট সংখ্যক দর্শকরা আছেন ,তারা আসলে পর্দায় কি দেখছিলেন । 

২০০৩ সালের ৪ এপ্রিল যখন ইরাকের বিভিন্ন জায়গায় বোমা হামলা হচ্ছিল ক্রমাগত , সেগুলোর সংবাদ প্রচার না করে সব মিডিয়া গিয়ে হাজির হয়েছিল ফেরদৌস স্কয়ারে ।

যেখানে সেদিন সাদ্দাম হোসেনের একটা মূর্তিকে ধসিয়ে দেয়া হয় । পুরো পৃথিবীতে টিভি তে দেখানো হয়,ইরাকের জনগণ মিলে তার মূর্তিকে ভেঙ্গে ফেলে উল্লাস করছে ।অথচ এটা ছিল একটা সম্পূর্ণ বানানো একটা শো ।

 সেখানে কিছু ভাড়াটে লোক নিয়ে আসা হয় । তারপর তাদের লাফালাফি ভিডিও করা । 

এমনকি এক ইরাকি সাংবাদিক পরে বলেছেন,তারা ইরাকি ই ছিল না । উপস্থিত মানুষদের বেশিরভাগই ছিল সাংবাদিক,ক্যামেরাম্যান আর ইউ এস মেরিন ।

 সে মূর্তি ধসানোর ভিডিও সিএনএন সকাল ১১ টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত প্রতি ৭.৫ মিনিটে একবার করে দেখায় , ফক্স নিউজ প্রতি ৪.৪ মিনিটে একবার ।

 এবং পুরো দুনিয়ার মানুষ এটিই দেখেছে । সোজা কথায় একটা ফিল্মের মত করে একটা যুদ্ধকে মানুষের কাছে উপস্থাপন করা হবে ।

অবশ্যই যেখানে বীর মার্কিন সেনারাই সব খারাপ মানুষদের মেরে ফেলে শেষে জয়লাভ করবে।

**
যাই হোক ।সেসময় এই মিডিয়া সার্কাসের মধ্যে আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বিতর্কিত চ্যানেল আল জাজিরা পুরো উল্টো সিদ্ধান্ত নেয় ।

 স্রোতের বিপরীতে গিয়ে তারা সত্য খবর গুলো প্রচারের সিদ্ধান্ত নেয় । অন্যান্য পশ্চিমা মিডিয়াগুলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা দৃশ্যগুলো দেখানো শুরু করে ।

মানুষের ওপর চলা ধ্বংসযজ্ঞ তুলে ধরতে চেষ্টা করে । বিধ্বস্ত জনপদগুলোতে গিয়ে মানুষের খবর গুলো প্রচার করা শুরু করে ।


এগুলো ওয়াশিংটন পছন্দ করল না । ইউএস সেক্রেটারি অফ ডিফেন্স ডোনাল্ড রামসফেল্ড ওয়াশিংটনে বারবার প্রেস কনফারেন্সে জানায় ,আল জাজিরা বিভিন্ন প্রপাগ্যান্ডা ছড়াচ্ছে ।


তাদেরকে হুমকি দেয়া হয় ।কিন্তু তারা এরপরও চালিয়ে যায় । এমনকি ডেইলি মিররে ২০০৫ প্রকাশ হওয়া এক রিপোর্টে একটা ‘সিক্রেট মেমো’র কথা বলা হয় । 

যেটি থেকে জানা যায় ,২০০৪ সালে হোয়াইট হাউজে এক মিটিং এ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে জর্জ ডাব্লিউ বুশ জানান , তিনি চাচ্ছেন আল জাজিরার সব হেড কোয়ার্টার উড়িয়ে দিতে ।

 ব্লেয়ার তাকে এ কাজ করতে নিষেধ করেন ।এতে সমস্যা বাঁধতে পারে । 

যাই হোক বলে রাখা ভাল ,এর আগেই বাগদাদে ২০০৩ সালে এবং কাবুলে ২০০১ সালে যুদ্ধকালীন সংবাদ সরবরাহের জন্য আল জাজিরার হেড কোয়ার্টার উড়িয়ে দেয়া হয়েছিল আমেরিকান আর্মি কর্তৃক ।


**
এরপরের গল্পটা এক সাংবাদিকের ।
৮ এপ্রিল ,২০০৩ । ইরাক আক্রমণের সময় বাগদাদ থেকে সংবাদ সরবরাহের জন্য আল জাজিরার এক জর্ডানি সাংবাদিক যান । নাম তারেক আইয়্যুব । বয়স পঁয়ত্রিশ ।

 সবেমাত্র তিন দিন হয়েছে তিনি বাগদাদে এসেছেন । জর্ডানে রেখে এসেছেন তার স্ত্রী ও এক বছর বয়সী মেয়েকে । 

বাগদাদে ক্রমাগত বোমা হামলা চলছে । এর মধ্যে সংবাদ সরবরাহ করে যাচ্ছেন তিনি ।

সেদিনের ঘটনাটা শুনব ,আল জাজিরার সিনিয়র প্রডিউসার সামির খেদির এর মুখ থেকে ,

‘ ৮ এপ্রিল ।সকাল ৬:২১ মিনিট । বাগদাদের correspondent থেকে আমি একটা ফোনকল পাই । সে জানায় অফিসের আশেপাশে একটা বড় সড় যুদ্ধ হচ্ছে । 

আমি তাদের on air এ দিলাম সাথে সাথে । কিন্তু আশেপাশে বোমা হামলা হওয়ায় তারা ছাদে গিয়ে রিপোর্ট করতে পারছিল না ।

 সে বলল, সুযোগ পেলেই তারা ফিল্মিং শুরু করবে ।তারা ৬:৪৭ এ ফিল্মিং শুরু করল ।

 হঠাৎ অন্য এক correspondent জানালো , একটা বিমান তাদের মাথার ওপর ঘুরাঘুরি করছে। প্লেন টা নিচু হয়ে আমাদের অফিসের দিকে নিশানা তাক করল ।

 তারপর মিসাইল ছুঁড়ল আমাদের অফিসকে লক্ষ্য করে । আমাদের অফিস বিধ্বস্ত হল ।

তারেক মারা গেল ।

সাধারণত আমাদের কোন স্টাফ হঠাৎ আহত হলে আমরা সব রিপোর্টার,ক্যামেরাম্যানের পরিবার থেকে ফোন কল পেতে থাকি । 

সেসময় অবাক করা বিষয় , আমরা শুধু মাত্র একটা ফোন কল পেলাম । সে ছিল তারেকের স্ত্রী ।

“তারেকের কী হয়েছে?”
আমরা তাকে তারেকের কথা বলি নি তখনো ।

“বলুন তারেকের কী হয়েছে । আমার মন বলছে ,তারেকের কিছু হয়েছে ”

কি বলতে পারেন তাকে আপনি তখন ?’

রেফারেন্সঃ
১। ‘Control room’ documentary by Jehane Noujaim
2। ‘The war you don’t see’ by John Pilger
৩। https://theintercept.com/…/jamal-khashoggi-killing-tareq-a…/
৪। https://www.youtube.com/watch?v=YDu7bXqx8Ig



Powered by Blogger.