জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনি ও নোবেল পুরস্কার এবং আমাদের অলীক কল্পনা | নব্য ক্রুসেডারদের চক্রান্ত

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনি ও নোবেল পুরস্কার এবং আমাদের অলীক কল্পনা | নব্য ক্রুসেডারদের চক্রান্ত আর আমাদের শিথিলতা

নোবেল পুরস্কারগুলো আর বসনিয়ার ঘটনাই যথেষ্ট পাশ্চাত্যবাদ আর জাতিসংঘকে চেনার জন্য।

Arju Ahmad ভাইয়ের লেখা।
.
১।
জাতিসংঘের বিশেষ নিরাপত্তা ক্যাম্প, চিনকারা ফ্যাক্টরি। সেখানে আশ্রিতদের অভয় দেওয়া হয়েছিল তারা সেখানে নিরাপদ। ১২ বছর বয়সী মিনা স্মেইলোভিক আর তাঁর ১৪ বছর বয়সী চাচাত বোন ফাতা স্মেইলোভিক বসে ছিলেন।

তাদের দিকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের পোশাক পরা কিছু সৈন্যের নজর পড়ে। এই দুই বোন আর সাথে নিজামা অরিক নামে আরও এক যুবতীকে তুলে নিয়ে যায় স্বৈন্যরা। মেয়ে তিনটি কয়েক ঘণ্টা পর ফেরত আসে।

তাদের গায়ে কোনও কাপড় ছিল না, দেহজুড়ে আঁচড় আর কামড়ের চিহ্ন ছিল। মাত্র ১২ বছরের মিনা আর ১৪ বছর বয়সী ফাতার লজ্জাস্থান থেকে রক্তপাত হচ্ছিল প্রবলভাবে। এমনকি রক্তাক্ত শরীর ধোয়ার মত পানিও সেখানে ছিল না।


২।
সেই শহরেরই আরেকটি ঘটনা। জাতিসংঘের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে, যারা পাহারায় ছিল নেদারল্যান্ডের শান্তিরক্ষী বাহিনী। জারা তুর্কোভিচ এক রাতের বর্ণনা দেন, তারা আধঘুমে।

চার জন সার্ব সৈন্য তাদের মধ্য থেকে একজন তরুণীকে তুলে নিল, আর কয়েক পা দূরেই ধর্ষণ করতে শুরু করে। দুজন সৈন্য দুই পা ধরেছিল, ৩ য় জন রেপ করছিল, মেয়েটি যখন প্রচণ্ড কান্নাকাটি আর সাহায্য প্রার্থনা করছিল, তখন সৈন্যরা তাঁর মুখেও র‍্যাগ করে।

জারার ১৯ বছর বয়সী বোন ফাতেমাও সেখানেই ছিল, সে ভয়ে তাঁর বোনের ৪ সন্তানকে আঁকড়ে ধরে। ফাতেমা বলেছিল, তিনি ভেবেছেইলেন তারা হয়ত একজন মায়ের প্রতি আগ্রহী নাও হতে পারে। কিন্তু ফাতেমাকেও একই কায়দায় ধর্ষণ করা হয়।

পূর্ব বসনিয়ায় পটোকারি শহর ছিল জাতিসংঘের বিশেষ নিরাপত্তা এলাকার অন্তর্গত। সেখানেই এই চিনকারা ফ্যাক্টরি। শুধু কি মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রেই এমন ঘটেছে? তা নয় বরং ছেলে শিশুদের উপরও একইরকম নির্যাতন হয়েছে।

এমন বহু ঘটনার কথা জানা গেছে যখন বেছে বেছে ১০/১১ বছরের বালকদের নিয়ে যাওয়া হত, আর যাদের কখনোই ফিরে পাওয়া যায় নি। আন্দাজ করতে অসুবিধে হয় না, এরা হত্যার আগে বলৎকারের শিকার হয়েছিলেন।


৩।
মুসলমানদের উপর বসনিয়ায় যে ভয়াবহ জাতিগত নিধন চলছিল এর এক পর্যায়ে নানা নাটকের পর জাতিসংঘ সেখানে শান্তিরক্ষী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়।

কিন্তু যেখানে ৩৭ হাজারের বেশি সৈন্য প্রয়োজন ছিল সেখানে মাত্র ৭ হাজারের মত সৈন্য মোতায়েন করা হয়। এর মধ্যে কার্যকরভাবে মোতায়েন ছিল মাত্র ৩ হাজারের কিছু বেশি সৈন্য।

জাতিসংঘ সেব্রেনিকা শহরকে সেফ জোন হিসেবে ঘোষণা করলেও সেখানে ৬ হাজার সৈন্যের প্রয়োজনের বিপরীতে মোতায়েন করেছিল মাত্র কয়েকশ ডাচ শান্তিরক্ষী। সেটাও আবার খুবই 
সাধারণ অস্ত্র সজ্জিত অবস্থায়।

সব কিছু সাজানোই ছিল। ফলে কোনও রকম বাঁধা ছাড়াই ডাচ সৈন্যদের একপ্রকার সহায়তায় সেখানে ১১ জুলাই শহরটি দখলে নিয়ে ব্যাপক গণহত্যা শুরু করে সার্বরা।

লাইনে দাঁড়িয়ে হত্যা করে ৮ হাজার মুসলিম যুবক ও নাবালেগ ছেলেদের। অথচ জাতিসংঘের তরফে বলা হয়েছিল এখানে এলে তারা নিরাপত্তা পাবে।

অথচ সেই গণহত্যার প্রমাণ থাকা ভিডিওচিত্রটি ধ্বংস করেন সেখানে জাতিসংঘের নিযুক্ত ডাচ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা। এভাবেই খোদ জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে যাবতীয় প্রমাণ লোপাট করা হয়।

এই খবরগুলো গোপন কিছু না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, নিউইয়র্ক টাইমস এবং দি ইন্ডিপেনডেন্টের রিপোর্টে এগুলো আলোচনায় এসেছিল।

বসনিয়া যুদ্ধ ও ভণ্ড জাতিসংঘ 


৪।
পনেরো শতকের শেষে ১৪৯০ সালে বসনিয়াতে যখন উসমানি খিলাফত বিজয়ী বেশে প্রবেশ করে তখন সেখানে মুসলিম ছিল ৯৯ জন। যুদ্ধবর্তী এক বছরেই সে সংখ্যা দাঁড়ায় ২০৫৪৬ জনে।

এমনকি সমগ্র বসনিয়া বিজিত হওয়ার পূর্বেই সেখানকার মুসলিমরা হয়ে উঠে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী। সেই বসনিয়াতেই ১৯৯২-৯৫ যুদ্ধে ১ লাখ মুসলিম পুরুষ হত্যার শিকার হয়েছিলেন। আর ২৫ হাজার নারী ধর্ষিত হয়েছিল।

আর ৯৫-এর ১১ জুলাই কেবল একদিনেই হত্যা করা হয়েছিল ৮ হাজার জনকে। বসনিয়ার এই ঘটনা মুসলমানের জন্য পশ্চিমা দুনিয়া আর জাতিসংঘকে বুঝার জন্য যথেষ্ট সহায়ক।


৫।
উল্লেখ করার মত ব্যাপার হচ্ছে, ২০১৯ সালে পিটার হ্যান্ডকে নোবেল পেলেন সাহিত্যে। ৯০ এর দশকের তামাম সময়টা জুড়েই তিনি ছিলেন সার্বিয়ানদের চালানো এই হত্যাকাণ্ডের পক্ষে প্রত্যক্ষ প্রচারণা চালানো লোক।

৯৫' এর জুলাইয়ে চালানো হত্যাকাণ্ডের কিছুদিনের মধ্যেই তিনি লিখতে শুরু করেন "A Journey to the Rivers: Justice for Serbia" নামে ভ্রমণ কাহিনী। সেখানে তিনি সার্বিয়ান দানবদের মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর চালানো গণহত্যাকে অস্বীকার করেন।

তিনি তার লেখালেখি, বক্তৃতা ও আলোচনার মধ্য দিয়ে সার্বিয়ানদের গণহত্যা, খুন, ধর্ষণ ও অন্যসব জুলুমের লেজিটিমেসি দেন, এডভোকেসি করেন।

এইরকম ভয়ঙ্কর মানবতাবিরোধী, সন্ত্রাসের মদদদাতা, গণহত্যার বিস্তারে ভূমিকা পালনকারী, শিশু ধর্ষণ ও খুনের বৈধতাদানকারী এবং প্রত্যক্ষ প্রচারণায় শামিল একজনকে নোবেল দেওয়া হলো সাহিত্যে। যিনি তার অপরাধের মাধ্যম বানিয়েছিলেন সাহিত্যকে।

নোবেল ঘোষণার সময় এইসব কিছুই যে বিবেচনায় নেওয়া হয় নি- তা কিন্তু কেবল এইজন্যই যে- এই খুন, গণহত্যা, ধর্ষণের শিকার মুসলমানেরা৷ ভিক্টিম মুসলমান না হলে ঠিকই দুনিয়ার সর্বত্র পিটার হ্যান্ডকে ঘৃণিত থাকতেন।

শিগগিরই আমরা দেখতে পাব, এই রক্তলুলুপ পিটার হ্যান্ডকে-ও মহৎ হয়ে উঠবেন এদেশের পত্রিকায়, সেক্যুলার পাড়ার সাহিত্যাঙ্গণের আলাপে। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের পাঠে, শ্রদ্ধাতেও সে উঠে আসবে।

যে জাতি কৃতিত্বের বিচার এভাবে করে যে মুসলমানদের থেকে ইহুদিরা নোবেল বেশি পেয়েছে। সে জাতির কাছে আফসোস ব্যতীত আমাদের অধিক প্রত্যাশার কিছু নেই।

আদতে পশ্চিমা সভ্যতার যে স্বরূপ তা মাত্র পঁচিশ বছর আগেও আমরা নগ্নভাবে দেখেছি। এরপরেও আমাদের যে মোহান্ধতা পশ্চিমা দুনিয়ার প্রতি তা থেকে উত্তরণের কোনও লক্ষণ নেই।

আজ ১১ ই জুলাই সার্বিয়ান গণহত্যা শুরুর সেই ভয়াল দিন… মাত্র পঁচিশ বছর আগের।


৬।
প্রতিনিয়ত ইসলামোফোবিয়ার ক্রমবৃদ্ধি, ক্রুশেডের যে নয়া রূপ কোরআন এর সবই আমাদের বলে রেখেছে।

আফসোস, আমরা সাম্প্রদায়িকতার জুজুর ভয়ে, পশ্চিমের প্রতি আমাদের দাস হৃদয় ওসব আলাপ তুলে না। আমরা তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এত সহানুভূতি ও ভালোবাসা যে, কোরআনের যে সতর্ক বাণী তাও প্রচার করতে ভয় পাই।

আল্লাহ আমাদের এই অবস্থা ও তাদের চরিত্র প্রসঙ্গে বলছেন,
تُحِبُّونَهُمْ وَلَا يُحِبُّونَكُمْ
তোমরা তাদের ভালোবাসো কিন্তু তারা তোমাদের প্রতি মোটেও সহনশীলতা পোষণ করে না। (আলে ইমরান ১১৯)।

অথচ আমাদের ব্যাপারে তাদের অন্তরের অবস্থা যে কত ঘৃণ্য আল্লাহ তা জানাচ্ছেন,
لَا يَأْلُونَكُمْ خَبَالًا
‘তারা তোমাদের ক্ষতি সাধনে ত্রুটি করে না’’। (আলে ইমরান ১১৮)
وَدُّوا مَا عَنِتُّمْ
এবং তারা মনেপ্রাণে কামনা করে, তোমরা দুঃখকষ্টে থাকো (আলে ইমরান ১১৮)

মুসলমানদের বিরুদ্ধে দুনিয়ার সর্বত্র তাদের এই লড়াই ও সংগ্রাম অব্যাহত আছে। দুনিয়ার কোথায় আজ মুসলিমদের আজ তারা স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছে?

এই অবস্থার প্রেক্ষিতেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা এই উম্মতকে সতর্ক করার জন্য বলছেন,
لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَةً لِّلَّذِينَ آمَنُوا الْيَهُودَ وَالَّذِينَ أَشْرَكُوا ۖ
আপনি ইহুদি ও মুশরিকদের দেখতে পাবেন মুসলমানদের ঘোরতর শত্রু হিসেবে। (মায়েদা ৮২)

তারা কি করবে? মুসলমানদের বিরুদ্ধে নিজেদের এই ঘৃণা ও হিংসাকে চরিতার্থ করার জন্য? আল্লাহ বলছেন,
وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا ۚ
তারা দেশে দেশে, স্থানে স্থানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বেড়ায় (মায়েদা ৬৪)

আরো জানতে চান? 




Powered by Blogger.