পাপ হতে মুক্তি বা তাওবার নিয়ম ও শর্ত | রবের হক, বান্দার হক ও ইস্তিগফার

পাপ হতে মুক্তি বা তাওবার নিয়ম ০ শর্ত |  রবের হক, বান্দার হক ও ইস্তিগফার এর দুয়া ও নিয়ম


একটা বিষয় এড্রেস করা খুবই জরুরি। ফেবুতে ইস্তিগফার বিষয়ক অনেক লেখালেখি হয়। কিন্তু সেসব পোস্টে ইস্তিগফার বিষয়টা এমনভাবে তুলে ধরা হয় যেন, সমস্ত গুনাহ-ই কেবল ইস্তিগফার দ্বারা মাফ করা সম্ভব। কিন্তু আদতে বাস্তবতা সেরকম নয়, সব গুনাহ কেবল ইস্তিগফার দ্বারা মাফ হয় না!
জোজন আরিফ

.
ইস্তিগফারের আলোচনা যেহেতু আসছে, তার আগে পাপ বা গুনাহের একটু আলোচনা দরকার। পাপ তিন প্রকার—

প্রথমত, আল্লাহর ফরয বা ওয়াজিবসমূহ ত্যাগ করা। যেমন : নামায, রোযা, যাকাত, কাফফারা ইত্যাদি।

দ্বিতীয়ত, আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে সংঘটিত হয় এমন পাপ। যেমন : মদপান, গান শোনা, হারাম কিছু দেখা ইত্যাদি।

তৃতীয়ত, বান্দার হক সম্পর্কিত পাপ। বান্দার হকের বিষয়টি বড় কঠিন ও মারাত্মক। এ পর্যায়টি আরও কয়েক শ্রেণিতে বিভক্ত। [১]

.
প্রত্যেক গুনাহের জন্যই তাওবা করা আবশ্যক। কোনো গুনাহ যদি কেবল বান্দা ও আল্লাহর মধ্যবর্তী বিষয়ে হয়, এর সাথে কোনো মানুষের হক জড়িত না থাকে;

তবে আল্লাহর ইচ্ছায় তিনটি শর্ত পূরণ করলেই তাওবা কবুল হয়ে যাবে। কিন্তু একটি শর্তও যদি লঙ্ঘিত হয়, তাহলে তাওবা কবুল হবে না।

প্রথম শর্ত : বান্দাকে গুনাহের কাজটি সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করতে হবে। অর্থাৎ, গুনাহ করব, আবার তাওবা করব, আবার গুনাহ করব, আবার তাওবা করব; এমন চক্রে আবদ্ধ থাকলে হবে না।

দ্বিতীয় শর্ত : বান্দাকে তার গুনাহের জন্য ভীষণ অনুতপ্ত হতে হবে।

তৃতীয় শর্ত : বান্দাকে আর কখনো ওই গুনাহের কাজে ফিরে না যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়সংকল্প হতে হবে।

.
এখন, প্রথম ও দ্বিতীয় প্রকারের গুনাহের জন্য তো খালেস দিলে তাওবা করলে ঠিক আছে। কিন্তু বান্দার হক সম্পর্কিত পাপ হলে কেবল তাওবা-ইস্তিগফার দ্বারা গুনাহ মাফ হবে না।

কোনো গুনাহ যদি বান্দার হকের সাথে সম্পর্কিত হয়, তবে তাওবা কবুল হওয়ার জন্য উপরের তিনটি শর্তের সাথে ৪র্থ আরেকটি শর্ত পূরণ করতে হয়। 

সেটি হলো—যার হক নষ্ট করা হচ্ছে, তার কাছ থেকে মাফ চেয়ে নিজের গুনাহ মাফ করিয়ে নেওয়া।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
‘গীবতকারী ব্যক্তিকে যে পর্যন্ত সে ব্যক্তি ক্ষমা না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তাকে মাফ করবেন না।’ [২]


আরেকটি হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘পাঁচটি পাপ এমন, যার কোনো কাফফারা নেই। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, কোনো মুমিনকে অপবাদ দেওয়া।’ [৩]


এই দুটি বর্ণনা থেকেই তো বান্দার হক নষ্ট করার ভয়াবহতা বুঝা যায়। অথচ কুরআন-হাদীসে এরকম আরও বহু বর্ণনা রয়েছে।


সুতরাং, ফেবুর ইস্তিগফার বিষয়ক পোস্টগুলো যেন আমাদের মনে এই ধারণা সৃষ্টি না করে যে, কেবল ইস্তিগফার করলেই বান্দার হকও মাফ হয়ে যাবে। কেননা, এরকম ভুলের মধ্যে ডুবে থাকলে হাশরের ময়দানে আফসোস ছাড়া কিছুই করার থাকবে না।


বান্দার হক এমন এক জিনিস, যতই ইস্তিগফার করুন না কেন, সেই বান্দার কাছ থেকে মাফ করিয়ে নেওয়া ছাড়া কোনো রক্ষা নেই! বান্দার হক খুবই কঠিন ও মারাত্মক, অথচ আমরা গুরুত্ব দিই না...

কেউ কেউ হয়তো ভাবছেন—আমি দিনরাত নামায পড়ব, প্রতিদিন রোযা রাখব, প্রতি মুহূর্ত ইস্তিগফার করব, তাহলেও কী বান্দার হক মাফ হবে না? উত্তর হচ্ছে, ‘না।’

হাদীসে আছে, এক লোকের স্ত্রী অনেক ইবাদতগুজার ছিল। সে সারারাত নামায পড়ত, এবং প্রতিদিন রোযা রাখত। কিন্তু সে মানুষকে কষ্ট দিয়ে কথা বলত। 

সেই মহিলার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করা হলে, তিনি বললেন, ‘তাতে কোনো কল্যাণ নেই, সে জাহান্নামেই যাবে।’ [৪]

মানুষকে কষ্ট দিয়ে কথা বলার পরিণামই যদি জাহান্নাম হয়, তাহলে আমরা যারা একে অন্যের গীবত করছি, গালিগালাজ করছি, চরিত্র নিয়ে আজেবাজে বলছি, অপবাদ দিচ্ছি; আমাদের পরিণামটা কী হবে একবারও ভেবে দেখেছেন?


কাজেই, পাপ থেকে মুক্ত হতে চাইলে বান্দার কাছ থেকে নিজের গুনাহ মাফ করিয়ে নিন। 

অন্যথায়, আপনি সারা দিনরাত নামায-রোযা আর ইস্তিগফার করলেও শেষ রক্ষা হবে না! আপনার ফেইসবুক প্রোফাইল যতই দ্বীনি হোক না কেন, সেদিন তা কোনো কাজে আসবে না...
---------
তথ্যসূত্রঃ
[১] مـنـهـاج الـعـابـديـن ٤١
[২] مشكاة المصابيح‎
[৩] مسند أحمد بن حنبل
[৪] مسند أحمد بن حنبل

গুনাহ মাফের ব্যাকুলতা | সাহাবীদের গল্প 


রবিয়াহ আল-আসলামি রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খাদেম। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এক খণ্ড জমি প্রদান করেন, আর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে আরেক খণ্ড জমি দেন। জমি ভাগ করার সময় একটি ফলদায়ক খেজুর গাছ নিয়ে তাদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়।



আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘গাছটি আমার জমিতে পড়েছে।’

রবিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘বরং, গাছটি আমার জমির সীমানায়।’

এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি চলতে লাগল। এক সময় আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এমন একটি কথা বললেন, যা রবিয়াহর অপছন্দ হলো। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এতে ভীষণভাবে অনুতপ্ত হলেন, লজ্জিতবোধ করলেন।

ফলে তিনি রবিয়াহকে বললেন, ‘ও রবিয়াহ! আমি তোমাকে যা বলেছি, তুমিও সেরকম কিছু আমাকে বলো; যেন তার ক্ষতিপূরণ হয়ে যায়।’

কিন্তু রবিয়াহ বললেন, ‘আমি এমন কিছু বলব না।’
আবু বকর বললেন, ‘তুমি অবশ্যই বলবে, অথবা আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলব, তিনি যেন তোমাকে তা বলার নির্দেশ দেন।’

রবিয়াহ আবারও বললেন, ‘আমি এমন কিছু বলব না।’
ফলে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু রবিয়াহকে জমির অংশ ছেড়ে দিলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলেন। 

রবিয়াহও তার পেছনে চলতে লাগলেন। তখন আসলাম গোত্রের লোকেরাও রবিয়াহর অনুসরণ করল। তারা তাকে বলল, ‘আল্লাহ তাআলা আবু বকরের ওপর রহম করুন।

 তিনি আপনার বিপক্ষে আল্লাহর রাসূলের ﷺ কাছে কেন যাচ্ছেন? অথচ তিনিই আপনাকে ওসব কথা বলেছেন!’

এ কথা শুনে রবিয়াহ বললেন, ‘তোমরা কি জানো উনি কে? উনার মর্তবা সম্পর্কে জানো? তিনিই আবু বকর আস-সিদ্দীক। তিনি হলেন গুহায় অবস্থানকারী দুজনের একজন, আল্লাহর রাসূলের ﷺ হিজরতের সঙ্গী।

 তিনি অগ্রে ইসলামগ্রহণকারী ব্যক্তি। তোমরা সাবধান হও, যেন তিনি তোমাদেরকে তার বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করতে না দেখেন। এ দৃশ্য দেখলে তিনি রাগান্বিত হবেন।

 আর যখন তিনি আল্লাহর রাসূলের ﷺ সাথে সাক্ষাত করবেন, তখন আবু বকরের রাগের দরুন তিনিও রেগে যাবেন। আর আল্লাহর রাসূল ﷺ রাগান্বিত হওয়ার কারণে আল্লাহ আযযা ওয়াজালও রাগান্বিত হবেন। ফলে রবিয়াহ ধ্বংস হয়ে যাবে।’

তখন তারা বলল, ‘আপনি আমাদের কী করার নির্দেশ দেন?’
রবিয়াহ বললেন, ‘তোমরা ফিরে যাও।’

আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর রাসূলের ﷺ কাছে গেলেন। রবিয়াহও একা একা তার অনুসরণ করলেন। আবু বকর আল্লাহর রাসূলের ﷺ কাছে গিয়ে সব খুলে বললেন।

তখন রাসূল ﷺ তাঁর মাথা রবিয়াহর দিকে উঁচিয়ে বললেন, ‘ও রবিয়াহ! তোমার এবং আস-সিদ্দীকের মাঝে কী হয়েছে?’

রবিয়াহ বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ ﷺ! এমন এমন হয়েছে। এক পর্যায়ে তিনি এমন কিছু বলেছেন, যা আমার পছন্দ হয়নি। 

ফলে তিনি আমাকে হিসাব বরাবর করার জন্য অনুরূপ কিছু বলতে বলেছেন। কিন্তু আমি তা বলব না বলেছি।’


আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, ‘হ্যাঁ, (এমন কথার বিপরীতে পাল্টা জবাব দিতে হয় না।) তুমি তাকে পাল্টা কিছু বোলো না।

 বরং তুমি বলো, ‘ও আবু বকর! আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। ও আবু বকর! আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন।’


এ কথা শুনে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মুখে ঘুরিয়ে কাঁদতে লাগলেন।

সুবহানাল্লাহ! সামান্য একটু কটুকথা! আর এতেই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু গুনাহ মাফের জন্য কতটা ব্যগ্র হয়ে গেলেন। 

সরাসরি চলে গেলেন আল্লাহর রাসূলের ﷺ কাছে। আর আমরা একে অন্যের ওপর কতশত জুলুম-অত্যাচার করি, প্রতারণা-ছলনা করি; তবুও আমাদের কোনো বোধদয় হয় না। 

আমাদের তো অন্তর মরে গেছে। অন্তর মরে গেলে গুনাহর অনুভূতি সৃষ্টি হয় না। আর গুনাহর অনুভূতি না থাকলে মানুষ আর মানুষ থাকে না...
---------
|| গুনাহ মাফের ব্যাকুলতা ||
জোজন আরিফ
‎১৩/০৭/২০২০
তথ্যসূত্র : سلسلة الأحاديث صحيحة
Powered by Blogger.