সাহাবীদের গল্প ও টুকরো জীবনী | সাহাবি তাবেঈ দের জীবনী

সাহাবীদের গল্প ও টুকরো জীবনী | সাহাবি তাবেঈ দের জীবনী বাংলা । তারাই শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম



সময়টা রাসূল (সা.) এর ইন্তেকালের অনেক পর। তাবেয়ীদের প্রজন্ম। হুযাইফা (রা.) তখন বৃদ্ধ। কুফার এক লোক (তাবেয়ী) তাকে জিজ্ঞেস করল, 'আপনি কি রাসূলকে (সা.) দেখেছেন? 


আপনি কি তাঁর সাহাবী ছিলেন?' হুযাইফা (রা.) বলেন, 'হ্যাঁ, আমি রাসূলকে (সা.) দেখেছি। আমরা তাঁর সাহাবী ছিলাম।' তাবেয়ি তখন জিজ্ঞেস করলেন 'আপনারা তাঁকে কেমন কদর করতেন?'

 হুযাইফা (রা.) বলেন, 'তিনি ছিলেন আল্লাহর নবী। তাঁকে যথাযথ কদর করা খুব কঠিন ছিল। তবু আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি।' 

সেই তাবেয়ি তখন বললো, 'আল্লাহর শপথ, যদি আমরা তাঁর সময়ে বেঁচে থাকতাম তাহলে আমরা তাঁর পায়ে একটা ধুলোও লাগতে দিতাম না। আমরা তাঁকে মাথায় করে রাখতাম।'

.
হুযাইফা (রা.) সেই তরুণ তাবেয়িকে একটা শিক্ষা দেওয়া জরুরি মনে করলেন। তাকে শোনালেন খন্দক্বের সেই রাতের কাহিনী। ঘটনাটা ছিল এই রকম,

"খন্দক্বের যুদ্ধে ক্লান্তি, হতাশা, কোন্দল আর সবশেষে ঝড়ো বাতাস, সব মিলিয়ে কুরাইশরা মানসিকভাবে একেবারেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা যেন আর কিছুই ভাবতে পারছিল না। 

রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁদের অবস্থা ও কৌশল বোঝার জন্য একজন সাহাবীকে শত্রু ক্যাম্পে নজরদারি করার জন্য পাঠাতে চাইলেন।

 সবাইকে ডেকে বললেন, 'কে আছে যে আমাকে শত্রুর ব্যাপারে তথ্য এনে দেবে? যে এই কাজ করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে আমার সাথে স্থান দেবেন।'

.
তখন চারদিকে পিনপতন নীরবতা।
.
রাসূলুল্লাহ (সা.) আবার ডাকলেন। কেউ সাড়া দিল না। তারপর আবার ডাকলেন।
.
সাহাবীরা সাধারণত ভালো কাজের সুযোগ পেলেই লুফে নিতেন। আল্লাহর রাসূলের (সা.) আদেশ মানতে উন্মুখ হয়ে থাকতেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে কেউই জবাব দিল না।
.
হিমশীতল রাত। বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা। সারাদিনের ধকলের পর সবাই ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর। এর মধ্যে শত্রুশিবিরের একেবারে ভেতরে গিয়ে খবর নিয়ে আসার মতো বিপজ্জনক মিশনে যাওয়ার অবস্থা কারোরই নেই।
.
রাসূলুল্লাহ (সা.) আর অপেক্ষা করলেন না। তাঁর দক্ষ নজরে বেছে নিলেন সবচেয়ে উপযুক্ত সৈনিকটিকে। হুযাইফা ইবন আল-ইয়ামানের নাম ধরে ডেকে বললেন, 'হুযাইফা, তুমি যাও, শত্রুদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করে আনো। 

কিন্তু এমন কিছু করে তাদের উসকে দিও না যাতে করে তারা আমাদের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধে নেমে পড়ে।'
.
এতক্ষণ বিষয়টা ছিল ঐচ্ছিক। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন সরাসরি আদেশ করলেন, হুযাইফাকে (রা.) তাই যেতেই হলো। হুযাইফা (রা.) ছিলেন বুদ্ধিমান, চোখ-কান খোলা, প্রত্যুৎপন্নমতি, পরিস্থিতি চট করে সামলে দিতে সক্ষম।
.
হুযাইফা (রা.) বের হলেন। বাইরে হাড়-কাঁপানো ঠান্ডা, কিন্তু হুযাইফা (রা.) তার কিছুই টের পেলেন না। সবই আল্লাহর সাহায্য।"
.
এই ঘটনাটি তিনি তাবেয়িকে নিজের ভাষায় শোনালেন। তিনি তাঁকে বোঝাতে চাইলেন যে মুখে বলা অনেক সহজ, কিন্তু করে দেখানো খুব কঠিন। পরিস্থিতি কতটা কঠিন হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) তিন তিনবার ডাকার পরেও কেউ সাড়া না দিয়ে থাকে! শেষ পর্যন্ত তিনি হুযাইফাকে (রা.) আদেশ করে এই মিশনে পাঠান।
.
সাহাবীদের পরবর্তী প্রজন্মকে সাহাবীদের সেই কষ্ট-ত্যাগ-সংগ্রামের কিছুই করতে হয়নি। তাদেরকে সাহাবীদের মতো নিজ বাবা-চাচা-ভাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়নি। 

খন্দক্বের যুদ্ধের মতো কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। দুনিয়াতে আসার সাথে সাথেই তারা সাহাবীদের মিশনের সুফল উপভোগ করতে শুরু করেছেন।

 তাই তাদের জন্য এটা বলা খুব সহজ যে, তাঁরা রাসূলুল্লাহকে (সা.) আরও বেশি কদর করতেন। রাসূলুল্লাহর (সা.) যমানায় জন্ম নিয়ে অনেকেই কাফির হিসেবে মারা গেছেন। 

পরবর্তী প্রজন্মকে সে ফিতনায় পড়তে হয়নি। সাহাবীদের যুগ ছিল শিরক, মূর্তিপূজা আর জাহিলিয়াতের যুগ। সেই ঘুটঘুটে অন্ধকার সময়ে তাদের ইসলামকে চিনে নিতে হয়েছে।

 পরবর্তী প্রজন্ম সেসবের কিছুই দেখেনি। তারা জন্মের পর থেকেই ইসলামের শাসন, ন্যায় আর নিরাপত্তা উপভোগ করতে পেরেছে। 

এ সবই অর্জিত হয়েছে সাহাবীদের রক্ত দিয়ে। কোনো প্রজন্মই সাহাবীদের সমান হতে পারবে না। আল্লাহর রাসূল (সা.) সত্যই বলেছিলেন, 'আমার প্রজন্ম হচ্ছে শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম।'
~তারাই শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম~
~আলভী রহমান~
সূত্র- রেইনড্রপস সীরাহ।
Powered by Blogger.