তথাকথিত মোডারেট উদার হয়েও কি মুসলিমরা কাফেরদের আক্রমণ থেকে বাচতে পারবে? ইতিহাস থেকে শিক্ষা। বসনিয়া যুদ্ধ ও কাফেরদের চেহারা

মোডারেট উদার হয়েও কি মুসলিমরা কাফেরদের আক্রমণ থেকে বাচতে পারবে? বসনিয়া যুদ্ধ ও ইউরোপের শান্তির বুলি  


আদমিরা (Admira Ismić) ও বসকো (Boško Brkić), সারায়েভোর এক জুড়ি। পাহাড়ের কোলে অবস্থিত ছবির মত সুন্দর শহরটিতে তাদের বেড়ে উঠা।



পরস্পরকে তারা খুবই ভালোবাসত। আদমিরা ছিল বসনিয়াক মুসলিম রমণী, আর বসকো সার্ব অর্থোডক্স খৃষ্টান।

সবকিছুই ভালো চলছিল তাদের। কিন্তু, এই সুন্দর শান্ত দিনগুলো দীর্ঘস্থায়ী হল না।

 বসনিয়ার বাতাসে যুদ্ধের পোড়া গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। হঠাৎ এক সুন্দর সকালে সারায়েভোর বাসিন্দারা নিজেদেরকে অবরুদ্ধ অবস্থায় আবিষ্কার করল।

পাশের পাহাড়গুলো থেকে সার্ব স্নাইপাররা রাস্তায় চলা মানুষদেরকে টার্গেট করে গুলি করতে লাগল। এছাড়াও শহরের বাড়িগুলোর জানালা বরাবর রাইফেল তাক করে রাখল।

কেউ একটু উঁকি দিলেই সাথে সাথে গুলি। একের পর এক মানুষ এভাবে মারা পড়ল। ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ এই বন্দীত্বদশা প্রায় চার বছর (১৯৯২-১৯৯৬) ধরে চলল।

এটা মধ্যযুগের কোন ঘটনা নয়। এটা তখনই ঘটছিল যখন মুক্তচিন্তা, লিবারেলিজম, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ইত্যাদি মতবাদের তুমুল আমদানী চলছিল সারা বিশ্বে।


  1. আন্তঃধর্মীয় সংলাপ
  2. আন্তঃধর্মীয় বিয়ে
  3. মোডারেট মুসলিম

কিন্তু, এই সমস্ত তত্ত্বের প্রচারকদের খোদ ভূমি ইউরোপেই চলছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বীভৎস ও মানবতাবিরোধী সংঘাত।

তো মূল কথায় ফিরে আসি। অবরুদ্ধ সারায়েভোতে আদমিরা ও বসকোও আটকা পড়েছিল। দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকার পর একদিন তারা চুপিসারে পালাতে চেষ্টা করল। কিন্তু, ভাগ্য সহায়ক ছিল না, স্নাইপারদের গুলিতে মারা পড়ল তারা। তারা হয়ে উঠল সারায়েভোর রোমিও ও জুলিয়েট [1]।


সারায়েভোতে এই রকম রোমিও-জুলিয়েটদের অভাব ছিল না। শহরটি ছিল ইউরোপে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রতীক। অর্থোডক্স, ক্যাথলিক ও মুসলিম সবাই একসাথে মিলেমিশে থাকত।

বিভিন্ন স্ট্যাটিসটিক্স অনুযায়ী যুদ্ধের আগে বসনিয়াতে প্রায় ৩৩% বিয়ে হত ইন্টাররিলেজিয়াস [2], সারায়েভোতে তা যে ছিল আরও অনেক বেশী সেটা নিশ্চয় আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

অর্থাৎ, মুসলিম ও খৃষ্টানদের মধ্যে প্রচুর বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। মুসলিম নারীদের মধ্যে খৃষ্টান পুরুষদের বিয়ে করার প্রবণতা খুবই কমন ছিল।

বেশীরভাগ মুসলিম ইসলামকে তাদের জীবন হতে বিদায় দিয়ে নামসর্বস্ব ডিনমিনাল (Denominal) মুসলিমে পরিণত হয়েছিল। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বসনিয়ার কিছু ভিডিও ইউটিউবে আছে। ভিডিওগুলোতে আপনি একজন মুসলিম নারীও পাবেন না যিনি নিকাব, হাতমোজা ও পা-মোজা ছাড়া।


অথচ, ৯০-এর দশকের ভিডিওগুলোতে আপনি শহরগুলোতে নিকাব তো দূরের কথা হিজাব পড়া কোন নারীও খুঁজে পাবেন না। ইসলামের চিহ্ন সব মুছে গিয়েছিল। 

মুসলিমদের মধ্যে মদ ও শূকর খাওয়া আনকমন ছিল না। লিবারেলিজমের কোন ঘাটতি ছিল না, পরিবর্তিত হতে হতে কাফিরদের সাথে তাদের পার্থক্য খুবই ছোট হয়ে এসেছিল। 

বিধর্মীদের তারা পরম বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছিল। টিটোর (Josip Broz Tito) সমাজতান্ত্রিক যুগোস্লাভিয়াতে (Yugoslavia) ধর্মীয় আইডেন্টিটি ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ ছিল নিষিদ্ধ।

বলকান স্লাভিক (Slavic) ন্যাশনালিজম ও সমাজতন্ত্রের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল যুগোস্লাভিয়া।

তাই ক্যাথলিক স্লোভিন (Slovene) ও ক্রোয়াট (Croat), মুসলিম বসনিয়াক (Bosniak) এবং অর্থোডক্স সার্ব (Serb), মেসিডোনিয়ান (Macedonian) ও মন্টিনেগ্রিন (Montenegrin) সবাইকেই নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় ত্যাগ করে পরমসহিষ্ণুতা প্রদর্শনের পাঠ দেয়া হত।

 মুসলিমরা বোকার মত এগুলো বিশ্বাস করে ফেলেছিল। অন্যরা কিন্তু নিজেদের ধর্মীয় আইডেন্টিটি ভুলে যায়নি। পুরো বসনিয়াজুড়ে মুসলিমদের অবস্থা কিছুটা এমনই ছিল।


যাই হোক, মুসলিমদের এই পরম সহিষ্ণুতা কোন কাজেই আসেনি। যুদ্ধ শুরু হতে ধর্মীয় আইডেন্টিটি-ই মুখ্য হয়ে উঠল। একই ভাষাভাষী ও একই জেনেটিক্সবিশিষ্ট হওয়া সত্ত্বেও মুসলিমদের তুর্কি [3] বলা হত। 

তাদের ভাষায় মুসলিমরা হল বহিরাগত (আমাদের পাশের দেশের সাথে কি মিল তাই না?)। মুসলিম পুরুষদের ধরে নিয়ে রাখা হত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প নামক কসাইখানাতে, আর নারীদের জন্য গড়ে তুলা হয়েছিল রেইপ ক্যাম্প।
বসনিয়াক নারীরা অবাক হয়ে আবিষ্কার করল যে তাদের ছোটবেলার খেলার সাথীরা তাদেরকে ধর্ষণ করছে, ধর্ষকদের মধ্যে এই নিয়ে বিন্দুমাত্র মনঃ যাতনা ছিল না।

বরং ধর্ষণ করার সময় এরা চিৎকার করে বলত যে “তোদের গর্ভে আমাদের অর্থোডক্স সন্তান জন্ম নিবে, তোরা ছোট ছোট চেটনিকের জন্ম দিবি” [4]।

প্রসঙ্গত বলে রাখি, চেটনিক (Cetnik) হচ্ছে সার্বিয়ান আলট্রা ন্যাশনালিস্ট ফ্যাসিস্ট সংগঠন [5], অনেকটা ইন্ডিয়ার আর এস এস (RSS) - এর মত।

 তাদের একটা সংগীত রয়েছে, মার্চ অন দ্রিনা (March on Drina)। যেকোন শহর তারা দখলে নিলেই, মসজিদের লাউড স্পিকারে এই গানটা বাজাত, এই গানটা বাজানো শুরু করলেই মুসলিম নারীরা বুঝতে পারত যে সৈন্যরা ধর্ষণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, একটু পরেই ঘরে ঘরে ঢুকে তাদেরকে ধর্ষণ করা হবে [6]।

মুসলিমরা অবাক হয়ে দেখল যে, এতদিনের পরিচিত প্রতিবেশীরাই তাদের (মুসলিমদের) মা-বোনদের একই ঘরে একসাথে ধর্ষণ করছে, ছোট ছোট বাচ্চাদের গরুর মত ম্যাসেটি (Machete) দিয়ে জবাই করে ফেলছে। 

রাতের বেলা রেইপ ক্যাম্পে রাখা মুসলিম নারীদের সার্বরা সুপারশপে মার্কেটিং করার মত বেছে বেছে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করত, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বন্ধু-বান্ধবদের সাথে নিয়ে, যেন এ এক মহা উৎসব। 

শুধু তাই নয়, ধর্ষণের ভিডিও করে সেগুলো বসনিয়াক মুজাহিদিনদের কাছে পাঠাত তাদেরকে ডিমরালাইজ করার জন্য। ওয়্যার পর্ণ নামে এক ধরণের পর্ণ এদের দ্বারাই সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে [7]। সার্বেদের পাশাপাশি কিছুদিন পর ক্রোয়াটরাও এই হত্যা ও ধর্ষণযজ্ঞে অংশগ্রহণ করলো। 

বসনিয়াকদের লিবারেলিজম ও কাফিরদের সাথে দহরম মহরম তাদেরকে বাঁচাতে পারল না। এত এত রোমিও-জুলিয়েট, ইন্টার-রিলেজিয়াস ম্যারেজ কোন কাজে আসল না।

নির্মম জিল্লাতি ও হত্যাযজ্ঞের শিকার হতে হয়েছে তাদের। আসলে তারা একটা জায়গায় মহা ভুল করে বসেছে। তারা কুরআনে বর্ণিত আল্লাহ্‌ তা’আলার সেই সতর্কবাণী ভুলে গিয়েছিলঃ

"ইহুদী ও খৃষ্টানরা ততক্ষণ পর্যন্ত আপনাকে গ্রহণ করবে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনি তাদের ধর্মের অনুসারী হচ্ছেন "
- (সূরাহ আল-বাকারাহঃ ১২০)।

সুতরাং, আপনি যতই তাদের কাছে ভালো হওয়ার চেষ্টা করুন না কেন, দিনশেষে তাদের কাছে আপনি একজন মুসলিম বৈ অন্য কিছু নন। 

আপনার শুধুমাত্র মুসলিম নামের জন্যই তারা আপনাকে হত্যা করবে, আপনার বোনকে ধর্ষণ করবে।

 তাদের শত্রুতা ততক্ষণ পর্যন্ত থামবে না যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনি তাদের ধর্মে ধর্মান্তরিত হচ্ছেন। তাদের সাথে আপনার যত আত্মীয়তার সম্পর্কই থাকুক না কেন, দিনশেষে তারা আপনার রক্ত চায়, আপনাকে ঝাঁরে-বংশে নির্বংশ করে দিতে চায়।

 সমস্ত কাফির মুশরিকদের বেলায়ই এটা সত্য। বসনিয়ার যুদ্ধ আল্লাহ’র এই বাণীর সত্যতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। বসনিয়ার যুদ্ধের মূল শিক্ষা মূলত এটাই।


তারপরও মুসলিমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না, একই ভুল তারা বারবার করে। রিলেজিয়াস ফ্যাসিস্ট কাফির-মুশরিকদের সামনে তারা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ লিবারেল প্রমানে ব্যস্ত হয়ে উঠে। 

দিনেশেষে আল্টিমেট ফলাফল শুন্য। এই একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে সবখানে।

বিশেষতঃ ভারতের মুসলিমদের মধ্যে এটি প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে।

ইসলামকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরার পরিবর্তে তারা হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্টদের দেখানো পথে নিজেদের দেশপ্রেমিক, লিবারেল ও ধর্মনিরপেক্ষ প্রমানে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। 

এতে অবস্থার কোন উন্নতি হবে না, বরঞ্চ আরও খারাপ দিন অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। দুঃখজনক বাস্তবতা হল এই ব্যাপারে তেমন কোন আলোচনা হয় না। এর প্রতিকার নিয়ে হওয়াতো দূরকি বাত। ফলে মুসলিমরা ওহী ছেড়ে ভুলের মধ্যেই এই ভয়ংকর বিপদের সমাধান খুঁজছে।


আশা করি স্রেব্রেনিতসা গণহত্যা স্মরণের এই দিনগুলোতে আমরা এই ব্যাপারে অনেক বেশী সতর্ক হব, 

আমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের দিকে ফিরে আসব, আল্লাহ’র দেখানো পথ আঁকড়ে ধরব, বাতিল ধ্যান-ধারণা, পথ ও পন্থা ছুড়ে ফেলে দিব। 

এতে ইনশা’আল্লাহ্‌ আমরা সফলতা প্রাপ্ত হব।
তথ্য সূত্রঃ
4.
Weitsman, Patricia A. (2008). "The Politics of Identity and Sexual Violence: A Review of Bosnia and Rwanda". Human Rights Quarterly. 30 (3): 561–578. doi:10.1353/hrq.0.0024
6.
"Seventh Report on War Crimes in the Former Yugoslavia: Part II". US submission of information to the United Nations Security Council. 1993. Retrieved 27 June 2014.
7.
Turning Rape Into Pornography: Postmodern Genocide - By Catharine A. MacKinnon
- Samsul Arefin Shakti ভাই এর পোস্ট, মূল লেখকের নাম প্রকাশ করতে মানা আছে তাই নাম ছাড়া পোস্ট করেছেন। আমরাও তাই মূল লেখকের নাম দিতে পারছি না। 


  • বাকোয়াস মোডারেট ভালো মুসলিম
  • আমেরিকান মোডারেট ইসলাম
  • কোরান হাদিসের মুসলিম বনাম আমেরিকান মুসলিম

Powered by Blogger.