কোরবানি এলেই ইসলাম বিদ্বেষী কথিত সুশীল বুদ্ধিজীবিরা চেঁচামেচি শুরু করে কেনো? এদের আসল সমস্যা গরু নাকি ইসলাম ই এদের মূল চুলকানি ?

কোরবানি এলেই ইসলাম বিদ্বেষী কথিত সুশীল বুদ্ধিজীবিরা চেঁচামেচি শুরু করে কেনো? ইসলাম ই এদের মূল চুলকানি 


যদি গরুই মূল সমস্যা হয় তাইলে তো মুরগু মাছ সবজি সব খাওয়া বন্ধ করে দিতে হবে কেননা এদের তো প্রান আছে। তারা সারাবছর কাফেরদের শুকর খাওয়া পাঠা খাওয়া নিয়ে কথা না বললেও মুসলিমদের কোরবানি ঈদ এলেই এদের পশুপ্রেম উতলিয়ে পড়ে!!



➤প্রত্যেক বছর কুরবানির সময় এলেই কথিত সুশীল সমাজের বুদ্ধিজীবিরা চেঁচামেচি শুরু করে। ধর্মের দোহাই দিয়ে কুরবানির সময় কোটিকোটি প্রাণী হত্যা নাকি বর্বরতা।

 মুসলমানদের কুরবানির সময় এরা জীব হত্যার দোহাই দেয়। কিন্তু সারাবছর ঠিকই বিভিন্ন ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে কোটিকোটি জীব হজম করছে।

 দৈনন্দিন চিকেন, গ্রীল, কাবাব, মাছ, শাক-সব্জি, উদ্ভিদ দিব্যি মজা করে খেয়ে যাচ্ছে। অথচ এগুলো সবই প্রাণবিশিষ্ট সত্তা।


আবার কুরবানির অর্থ অসহায় গরীবদের দান করার সবক দিয়ে নিজেরা ঠিকই পহেলা বৈশাখ, থার্টি ফাস্ট নাইট সহ অন্যান্য ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় উৎসব পালনে কোটকোটি টাকা নষ্ট করে।

 তখন গরীব দুঃখীদের জন্য কোন আবেদন থাকে না। অথচ কুরবানির প্রধান আবেদনই হল গরীব দুঃখিদের প্রতি। কুরবানির গোশত কুরবানিরদাতারা একা ভোগ করে না। 


এর গোশত বিপুল আকারে গরীবদের মাঝে বণ্টন করা হয় আলহামদুলিল্লাহ। আসলে যারা অসহায়দের সাহায্য করার তারা এগুলোর ভিতরেও করবে। আর যারা না করার তারা কখনোই করবে না।

আরেক অদ্ভুত যুক্তি হল জবাইয়ের দৃশ্যনাকি আমাদের আগামী প্রজন্মকে ভয়ংকর করে তুলতে পারে। এজন্য কুরবানির আয়োজন খোলামাঠে না করে গোপনে করা উচিৎ। 

যুগ যুগ ধরে মুসলিম সমাজে খোলামাঠেই কুরবানির চর্চা হয়ে আসছে। মুসলিমরা নিজ হাতে কুরবানির পশু যবেহ করেছে, গোশত বানিয়েছে।

 আর এই চিত্রের মাঝেই আমাদের সাহসী প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে। তারা পশুর গোশতে কামড় দিতে পারবে কিন্তু জবেহ দেখতে পারবে না। 

এরকম ভীত ও ডাবল স্ট্যান্ডার্ড মানসিকতা নিয়ে শত শত মুসলিমদের কুরবানি নিয়ে আপত্তি তোলার অধিকার কোন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধি রাখে না।


মূলত এই অভিযোগগুলোর উৎসস্থল একটাই। আর তা হল ইসলাম বিদ্বেষ। মুসলিমদের কাছে এসব অভিযোগের কোন অর্থই নেই। 

আমাদের জীবনের মূল লক্ষ্যই হল আল্লাহর দাসত্ব। আল্লাহর নির্দেশ, ব্যস আমরা কুরবানি করব। 

অধিকন্তু সেকুলারদের এসব আপত্তি অবান্তর এবং কুযুক্তিতে ভরপুর। যার আড়ালে রয়েছে তাদের ইসলামবিদ্বেষী মানসিকতা। 

তারা নিজেদের এই ঘৃণ্য চরিত্র প্রকাশের জন্য সামান্যতম সুযোগও মিস করে না। প্রতিবছরই তাদের এমন নিকৃষ্ট চেঁচামেচির বিরুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষ থেকে আলোচনা হয়। 

এর মাধ্যমে তাদের কুৎসিত চেহারা প্রকাশ পেয়ে যায়। বিগত কয়েকবছর যাবৎ আমরা সেকুলারদের কাছ থেকে উপরে উল্লেখিত কয়েকটা আপত্তি শুনতাম। 

ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রতি বছর এই যুক্তিগুলোই তারা সামনে নিয়ে আসত। মুসলিম সমাজে এর কোন প্রভাবই পড়ত না আলহামদুলিল্লাহ।

কিন্তু এবারের কুরবানির সময়টা একটু ভিন্ন। সেকুলার গোষ্ঠী নতুন এক অজুহাত পেয়েছে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ। 

ইতিমধ্যে তারা এই অজুহাতকে সামনে রেখে কুরবানি বন্ধের দাবি করার মত দুঃসাহসও দেখিয়ে ফেলেছে।

 ভয়ের জায়গা হল মুসলিম সমাজের আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণির মাঝে সামান্য হলেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। শয়তান তাদের মনের ভিতর নানা কুযুক্তি ঢুকিয়ে দিচ্ছে।

 "করোনার কারণে ব্যাপকভাবে হজ্ব বন্ধ, মসজিদ বন্ধ ছিল তাহলে কুরবানিও তো বন্ধ থাকতে পারে"

এই ধরণের সংশয়ের শিকার ব্যক্তিগতভাবে কেউ কেউ হচ্ছে। 
আল্লাহ মুসলিম সমাজকে শয়তানি সংশয় থেকে হেফাজত করুন।


কুরবানি ইসলামী শরীয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি শি'আর। জমিনে আল্লাহর উবুদিয়্যাত বাস্তবায়নের অন্যতম নিদর্শন। 

এর পিছনে রয়েছে আমাদের জাতিপিতা হযরত ইবরাহিম আঃ এবং তাঁর সন্তান নবী ইসমাইল আঃ এর ত্যাগ ও নিষ্ঠার পবিত্র নজরিয়ানা। 

আমাদের জীবন-মৃত্যু সব কিছুই যে আল্লাহর জন্য- এই মহান শিক্ষাই তো নিহিত কুরবানির আমলের মাঝে। 

তাহলে করোনার ভয়ে কীভাবে আমরা কুরবানির ইবাদাত থেকে বিরত থাকতে পারি!

 মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন,"(হে নবী!) আপনি (মুশরিকদের) বলুন! আমার নামায, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মরণ বিশ্ব-প্রতিপালক মহান আল্লাহ তা'য়ালারই জন্যে।" (৬:১৬২)


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে সামর্থ থাকার পরও কুরবানি করল না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে। (মুসনাদে আহমাদ)

কুরবানির গুরুত্ব এতোই যে, কোন নির্দিষ্ট এলাকা কুরবানির আমল ছেড়ে দিলে তাদেরকে হত্যার বিধান পর্যন্ত কোন কোন ইমাম থেকে বর্ণিত হয়েছে।

হজ্ব জীবনে একবারই ফরজ হয়। কিন্তু কুরবানির আমল প্রতিবছরই ওয়াজিব।

 করোনার সময় মসজিদে উপস্থিতি সীমিত হয়েছিল, কিন্তু নামাজের ফরজ বন্ধ হয়নি। তাছাড়া জগতের সবকিছুই এখন চলছে। সুতরাং এরকম চিন্তাভাবনা এবং অজুহাতের কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই। 

না শর'য়ী দৃষ্টিকোণ থেকে আর না বাস্তবতার দিক থেকে। শয়তানের প্ররোচনায় সেকুলারদের ফাঁদে পড়া যাবে না।

 আখের নিজের মহামূল্যবান সম্পদ ঈমান হারানো ছাড়া কিছুই অর্জন হবে না।

বর্তমানে অনলাইন, অফলাইন, মিম্বার সব জায়গা থেকে কুরবানি নিয়ে কথা বলতে হবে। যেন কোন মুসলিম এই ব্যাপারে সংশয়ে না পড়ে, নিজের ঈমানি বল হারিয়ে কুরবানি থেকে পিছু সড়ে না যায়।


প্রথমত শর'য়ী দৃষ্টিকোণ থেকে কুরবানি বর্জনের কোন সুযোগ নেই। আমাদের মুসলিমদের জন্য শরীয়তের অবস্থানই যথেষ্ট।

দ্বিতীয়ত কুরবানির সাথে মানুষের জীবন-জীবিকা ও দেশের সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জড়িত।

 খেটে খাওয়া মানুষদের থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক স্বার্থ এখানে জড়িয়ে আছে।

 খামারিতে অনেক ব্যবসায়ীরাই সারাবছর কুরবানিকে সামনে রেখে পশু লালন পালন করেছেন। 

গ্রামের অনেক দরিদ্র পরিবার আছে যারা ব্যক্তিগতভাবে ঈদে বিক্রির জন্য দুয়েকটা পশু পালন করেছেন। 

এই বিক্রির টাকায় একটা সময় পর্যন্ত তাদের জীবন চলে এবং অভাব কমে।দেশের চামড়া শিল্পের সিংগভাগ কাঁচামাল জোগান নিশ্চিত করে কুরবানির পশুর চামড়া। আবার চামড়া ব্যবসায়ের নানা পর্যায়ে আছে বিভিন্ন শ্রমিক ও ব্যবসায়ী। 

তাছাড়া পশুর হাট, পশু কুরবানি ও মাংস বানানো সহ নানা পর্যায়ের মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক চাহিদা এখানে রয়েছে। 

গরীব, ইয়াতিমদের জন্য কিছুদিনের খাবারের জোগানের ব্যাপারটিও এখানে উল্লেখযোগ্য। যা তাদেরকে সেই দিনগুলোতে খাবারের পিছনে ব্যয় করতে হয় এমন পরিমাণ অর্থের নিশ্চিয়তা দিচ্ছে।


প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী ঈদে প্রয়োজনের চেয়েও অধিক ৯ লাখ গবাদি পশু বাজারে আসার জন্য অপেক্ষমাণ এবং সেটা বাংলাদেশের ভিতর থেকেই।

 তাছাড়া মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বর্তমান নিম্নের দিকে। সব মিলিয়ে হাট ও কুরবানি বন্ধের চিন্তা কিংবা এখানে শিথিলতা করা সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতির জন্য মোটেও কল্যাণকর হবে না। 

এতে লোকসানে খাতা গুণতে হবে বৃহত্তর এক গোষ্ঠীর।
তৃতীয়ত কুরবানির মাধ্যমে দেশের অনেক মানুষের সামান্যতম হলেও পুষ্টিগত চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা হচ্ছে। 

গরু, মহিষ, ছাগলের গোশত গরবীরাতো বটেই মধ্যবিত্ত ফ্যামিলিও বছরে অল্পই খেতে পারে। 

এটা পুষ্টিগত দিক থেকে একটা শূন্যতা তৈরি করে। কুরবানি উপলক্ষে তারা এই শূন্যতা কিছুটা হলেও পূরণ করতে পারছে।


আবার প্রাকৃতিক দিক থেকে প্রাণী জগতের ভারসাম্যতা রক্ষাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। নতুবা জমিন মানব সমাজের জন্য বসবাসের অযোগ্য হয়ে যেত। 

ফলে কুরনানির নিয়ে শিথিলতা সবার আগে নিজেদের দ্বীনের জন্য ক্ষতিকর। তারপর অর্থনৈতিক, স্বাস্থ্যগত এবং প্রাকৃতিক ক্ষতি তো আছেই।


কুরবানির গুরুত্ব নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি আমাদের জন্য জরুরি হল, তিনটা বিষয় নিয়ে তৎপর হওয়া।


এক. কুরবানির হাটকে নিরাপদ ও সহজলভ্য করা। প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত শহর ও এলাকাগুলোতে অনলাইন মার্কেটিংয়ের প্রতি গুরুত্ব দেয়া এবং এই ক্ষেত্রে প্রতারণার সুযোগগুলোর পথ বন্ধ করার ব্যবস্থা করা। 

আর যেখানে স্থানীয়ভাবে পশু ক্রয়ের সুযোগ আছে সেখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পশু পালনকারী বিক্রেতার কাছ থেকেই পশু ক্রয় করা। মোটকথা হাটের পরিমাণ কমিয়ে আনা। 

একেবারে হাট বন্ধ করা সম্ভব না এবং এটা উচিৎ ও কল্যানকরও না। তাই হাট বসানোর ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপক, ক্রেতা, বিক্রেতা সবাই সচেতন হওয়া। সব হাটে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।


আর ক্রেতাদের জন্য জরুরি হল, প্রতিবারের মত বিভিন্ন হাটে ঘুরে ঘুরে বিলাসী মোডে পশু ক্রয় থেকে বিরত হওয়া।

 এবার বরঞ্চ নির্দিষ্ট একটি হাট থেকে পশু কিনে সন্তুষ্ট থাকা। আরেকটা ব্যাপার হল, ক্রেতাদেরকে এই বছর কম মূল্যের পশু কিনে বাকি টাকা দান করে দেয়ার প্রতি ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করা তেমন উপকারী হবে বলে মনে হয় না। 

এতে পশুর হাটের ব্যালেন্স নষ্ট হবে। নির্দিষ্ট ধরণের পশু বিক্রি হয়ে বাকিগুলো বাজারে অলস পণ্যে পরিণত হবে। ধারাবাহিকভাবে কয়েক পর্যায়ের মানুষকে গোশতের ঘাটতিও বহন করতে হবে। 

তাছাড়া বেচে যাওয়া অর্থ গরীব দুঃখীদের কাছে পৌঁছার ব্যাপারটিও অনিশ্চিত এখানে।


দুই. ঈদের দিনে কুরবানির কাজ সম্পাদনের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং নিরাপদ ব্যবস্থা করা। পশুর মল- মূত্র তৎক্ষণাৎ সাফ করে যথাস্থানে ফেলে দেয়া।

তিন. কুরবানির গোশত বণ্টনের ক্ষেত্রে নিরাপদ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করা।

 যেন গরীব ও অসহায় লোকেরা গোশত সংগ্রহ করতে এসে গ্যাদারিং সৃষ্টি না করে এবং সামাজিক দুরুত্ব বজায় থাকে, সেই দিকে সর্বোচ্চ সতর্ক দৃষ্টি রাখা। 

উত্তম হলে, নিজেরা নিরাপত্তসহ গরীবদের কাছে তাদের হক পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা।

মোটকথা কুরবানির সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিষয়ে পরিষ্কার- পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপত্তার ব্যাপারে যত্নবান হওয়া।

 বিষয়গুলো নিয়ে সব জায়গা থেকে বিশেষত সম্মানিত উলামায়ে কেরাম এবং ইমাম সাহেবদের মিম্বার থেকে সবার আগে বেশি বেশি আলোচনা হওয়া।

 যেন সুযোগসন্ধানী সেকুলার শ্রেণি কথা বলার জন্য কোন স্কোপ না পায়। যদিও চুন থেকে পান খসলেই তারা তীলকে তাল বানিয়ে চেঁচামি শুরু করবে।

 তথাপি আমাদের মুসলিম জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করেই বিষয়গুলো নিয়ে সোচ্চার হতে হবে। 

যেন আমাদেরই বিশাল জনগোষ্ঠী কোন রকম সমস্যায় না পড়ে। তাকদীরে থাকলে সব কিছুই হতে পারে। 

কিন্তু আমাদের চেষ্টার কমতি রাখা বৈধ হবে না। এটা আমাদের ঈমানি দায়িত্ব।
Iftekhar Sifat
Powered by Blogger.