বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনীতি | ভারতের মত লাভজনক বাজার হতে আরো ৮ বছর অপেক্ষা বাংলাদেশের।

বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনীতি | ইন্ডিয়া বাংলাদেশ আলোচনা


অনেকে মনে করেন বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় তো ভারতের সমান বা প্রকৃত অর্থে কাছাকাছি তবে বাংলাদেশের হাইটেক ইন্ডাস্ট্রি বা গাড়ির বাজার এখনো এত ছোট কেন! 

কিংবা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বা কোম্পানীগুলো কেন তাদের স্টার্টঅাপকে ভারতের জনগনের জন্য সহজ করে দিচ্ছে? 

অথচ ভারতের সমান মাথাপিছু আয়ের বাংলাদেশের ১৮ কোটি জনসংখ্যার বাজারের উপর বিদেশি নামিদামি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো ভরসা করতে পারছে না? এর একটা সহজ ব্যাখ্যা আছে।

২১ রাজ্যের সমন্বয়ে ভারত প্রজাতন্ত্র গঠিত। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১৪০ কোটি। এ জনসংখ্যার একটি বড় অংশের বয়স ৩০ বছর বা তার চেয়ে কম।

 লক্ষ্য করলে দেখবেন বিশ্ব গনমাধ্যমে ভারতকে নিয়ে ১০ বছর আগে যে আলোচনা হতো বর্তমানে তার বিষয়বস্তু পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। 

অন্যান্য খবর বাদ দিলে ভারতকে এখন উদীয়মান 'ইকোনোমিক পাওয়ারহাউজ' হিসেবেই বেশি সম্বোধন করা হয়।

কি এমন 'মন্ত্র' যা ভারতের মতো একটি গরিব দেশকে এমন বিশেষণ এনে দিয়েছে?

১০ বছর আগেও যে দেশ দারিদ্র্যতার গোলকধাঁধার জন্য বিশ্ব গনমাধ্যমে উদাহরণ হতো তাকে কেন অর্থনৈতিক উন্নয়নে উদাহরণ হিসেবে ধরা হচ্ছে?

প্রথম কথা হচ্ছে আসলেই কি ভারতের গড় মাথাপিছু আয় তাদের জনগোষ্ঠীর প্রকৃত আয়কে প্রকাশ করে কি না।

 ২০২০ সালের জুন মাসে ভারতীয় স্টেট ব্যাংকের ২০১৯ বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। 

সেখানে জনসংখ্যার সাথে আয়ের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।


রাজ্য হিসেবে, গোয়া রাজ্যের নাগরিকদের মাথাপিছু আয় ৫ হাজার ডলার বা তার কিছু বেশি। মহারাষ্ট্র রাজ্যে প্রায় ৪ হাজার ডলার।

এছাড়া গুজরাট, দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুসহ ৪-৫ টি রাজ্যে মাথাপিছু আয় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার ডলারের মতো।

বাংলাদেশের পাশ্ববর্তী ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে মাথাপিছু আয় দুই হাজার ডলারের কাছাকাছি।

 প্রতিবদন থেকে দেখা যায় পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোই মূলত ভারতের গড় জীবনমান থেকে এগিয়ে আছে।

ভারতের পিছিয়ে পড়া রাজ্যগুলোর মধ্যে বিহারের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। বিহারের মাথাপিছু আয় সাতশত ডলারের কিছু বেশি যা বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর সমান।

 এরপর আছে উত্তর প্রদেশ। তাদের মাথাপিছু আয় নয়শত ডলারের কিছু বেশি এবং তাদের জনসংখ্যা প্রায় ২৩ কোটি। 

অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্য সরাসরি যোগাযোগের অভাবে পিছিয়ে আছে। তাদের নাগরিকরা মূলত মেইনল্যান্ড ইন্ডিয়ায় পড়াশোনা থেকে শুরু করে চাকরি, ব্যবসা করে থাকে।

 পশ্চিমবঙ্গ, ওরিশ্যা সহ কিছু রাজ্য ভারতের গড় জীবনমানকে প্রতিফলিত করে।

এতকিছুর সাথে ব্যবসার সম্পর্ক কোথায়?


ভারতে ৪-৫ হাজার ডলার মাথাপিছু আয়ের রাজ্য যেমন আছে তেমনি ৭-৮ শত ডলার মাথাপিছু আয়ের রাজ্যও আছে। 

দেশটির ৫-৬ টি রাজ্যের মাথাপিছু আয় ৩-৫ হাজার ডলার এবং সে রাজ্যগুলোতে বড় বড় শহর থাকার সুবাদে রাজ্যগুলোর জনসংখ্যাও বেশি। 

ভারতের মতো বড় অর্থনীতির ক্ষেত্রে ৫ হাজার ডলার বা তার বেশি গড় মাথাপিছু আয় থাকলে তাকে উচ্চ মধ্য আয় হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় যদিও সত্যিকার অর্থে উচ্চমধ্য আয়ের সীমা মাথাপিছু ৮-১০ হাজার বা তার থেকে বেশি। 

সেক্ষেত্রে গরিব অধ্যুষিত দেশ হিসেবে উক্ত রাজ্যগুলোতে মিশ্র জনসংখ্যা থাকায় ধরে নেয়া হয় সেখানে উচ্চ মধ্য আয়ের নাগরিকের সংখ্যা উল্লেখ করার মতো। 

এ রাজ্যগুলিতে ভারতের জনসংখ্যার প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ মানুষ বাস করে। 

এ রাজ্যগুলোতে ৪-৫ কোটি এবং পুরো ভারতে ৭-৮ কোটি উচ্চ ও উচ্চ মধ্য আয়ের লোক বাস করে যারা উন্নত জীবন-যাপন করে থাকে এবং তাদের আয় সীমা ৫ হাজার ডলার বা তার উপরে।

 এর সাথে পুরো ভারতের মধ্য ও নিম্ন মধ্য আয়ের আরও ২৫-৩০ কোটি জনসংখ্যাকে যোগ করলে প্রায় ৩৫-৪০ কোটি উচ্চ থেকে মধ্য সামর্থের জনগোষ্ঠীর বিশাল বাজারের চিত্র বের হয়ে আসে। 

ভারতের বাজারে সেই ৭-৮ কোটি উচ্চ ও উচ্চমধ্য আয়ের নাগরিকরা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে জাতীয় ভোগ সূচকে। 

আর এ ৩৫-৪০ কোটি মোটামুটি জনসংখ্যার তুলনামূলক বেশি ক্রয়ক্ষমতা থাকার অন্যতম কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন। 

এর ফলে কম দামে তারা তুলনামূলক বেশি সুবিধা ভোগ করতে পারছে। 

তবে দুঃখের ব্যাপার হল এ আশীর্বাদপুষ্ট জনসংখ্যার বাইরে ভারতের ৯০-৯৫ কোটি মানুষের সামর্থ ও অর্থনৈতিক অবস্থা নিম্নমুখী। 


জনসংখ্যার এ বড় অংশ এখনো মৌলিক অধিকার পূরণ করতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে। ভারতের অতি দরিদ্র নাগরিকের সংখ্যা পার্শ্ববর্তী অন্যান্য অনেক দেশের জনসংখ্যার থেকেও বেশি।

 এছাড়া সাম্প্রতিক উগ্র জাতীয়তাবাদ ভারতের মতো বহুজাতিসত্ত্বার রাষ্ট্রে সামাজিক উন্নয়নে ইতিমধ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে যার আঁচ লেগেছে সাম্প্রতিক অর্থনীতিতেও। 

উগ্র জাতীয়তাবাদের স্থায়ীত্ব ভারতের জন্য দীর্ঘকালীন অার্থসামাজিক ক্ষতি বয়ে আনবে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন সেদেশের সমাজ ও অর্থনীতিবিদরা। 

ভারতের বড় জনসংখ্যা উচ্চ বা মধ্য আয়ের নাগরিকদের কম দামে বেশি সেবা ভোগ করার জন্য আশীর্বাদস্বরূপ হলেও দেশটির সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য একটি অভিশাপ। 

অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ সামাল দিয়ে সরকারি কার্যক্রম বিস্তৃত হতে পারছে না। এছাড়া এত বড় জনগোষ্ঠীকে অগ্রসরমান করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। 

যার ফলে এখনও ভারত বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ হিসেবে বহির্বিশ্বে পরিচিত।


বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় প্রায় ২ হাজার ডলার। দেশে আয় বৈষম্য থাকলেও অঞ্চলভেদে মাথাপিছু আয় খুব বেশি ওঠানামা করে না। 

সে হিসেবে বাংলাদেশের কনজ্যুমারদের বড় সংখ্যাই মধ্য ও নিম্নমধ্য পরিসরের অন্তর্ভুক্ত। 

বৈশ্বিক বিচারে জনসংখ্যার যে অংশটি সিংহভাগ সম্পদের মালিক তা ভারতের বিচারে এক দশমাংশ।

 এ কারণে বৈশ্বিক বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের চেয়ে ভারতের বাজারকে বেশি প্রাধান্য দেয় এবং স্থানীয়ভাবে সেখানে পণ্য উৎপাদন করে। 

ফলে এর সুবিধা সাধারণ ভারতীয়রা পেয়ে থাকে। 

মাথাপিছু আয়ে ভারতকে বাংলাদেশ ছাড়িয়ে গেলেও প্রকৃত অর্থে ভারতের মতো লাভজনক বাজারে পরিনত হতে এবং অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধা পেতে হলে বাংলাদেশকে আরও প্রায় ৭-৮ বছর অপেক্ষা করতে হবে।

 এমনকি অর্থনীতিতে বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে পড়া পাকিস্তানের অবকাঠামোর সমপর্যায়ে যেতে আমাদের আরও প্রায় ৫ বছর অপেক্ষা করতে হবে। 
Mahmudul Hasan Shuvo
Powered by Blogger.