বাঙলায় মুসলিমদের আগমন। বাংলাদেশে ইসলামের ইতিহাস ও মুসলিম শাসন

বাঙলায় মুসলিমদের আগমন। বাংলাদেশে ইসলামের ইতিহাস ও মুসলিম শাসন ।




১।
বাঙলায় ইসলামের আবির্ভাব ঠিক কখন হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট কোনও প্রমাণ ইতিহাসে সংরক্ষিত নেই।


তবে নানাবিধ প্রমাণ থেকে আন্দাজ করতে অসুবিধে হয় না যে, হিজরি প্রথম শতাব্দীর শেষাংশে কিম্বা এর অব্যবহিত পরপরই এই অঞ্চলে ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছিল।

কুমিল্লায় এবং রাজশাহীতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রাপ্ত হারুন অর রশিদের আমলের স্বর্ণমুদ্রা এর প্রমাণ বহন করে। 

১৭০ হিজরিতে পঞ্চম আব্বাসীয় খলিফা হিসেবে তিনি ক্ষমতায় আসেন।

আল্লামা ইবনে খুরদাযবিহ, জন্ম গ্রহণ করেছিলেন হিজরি ২০০ সালে। যিনি আব্বাসী খলিফা মুতামিদের সময় গুরুত্বপূর্ণ একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ছিলেন। 

তাঁর প্রণীত কিতাব আল মাসালিক ওয়াল মামালিক থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, বাঙলায় আরব মুসলমানদের যাতায়াত এবং বসতিও ছিল।

এমনকি অন্যান্য বেশ কিছু ঐতিহাসিক ব্যাপার থেকে এও ধারণা করা যায়, হিজরি তৃতীয় শতাব্দীর শুরুর ভাগে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, স্বন্দীপ প্রভৃতি অঞ্চলে ছোট ছোট মুসলিম সালতানাত গড়ে উঠেছিল। এটা খ্রিস্টীয় দশম শতকের ঘটনা।


এ কথা সত্য বাঙলার ইতিহাসে সব থেকে বড়ো অধ্যায় ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর ১২০৪ সালের নদীয়া বিজয়। 

কিন্তু এও সত্য ইসলামের সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের পরিচয় এই বিজয়াভিযানের বহু আগেই।

বহু বিখ্যাত উলামা মাশায়েখের দ্বীন প্রচারের জন্য এ অঞ্চলে আগমন আরও বহু আগেই ঘটেছে। 

যেমন খিলজীর বাঙলা বিজয়ের কমপক্ষে দেড়শো বছর আগেই প্রান্তিক অঞ্চল নেত্রকোনার মদনপুরে ক্বমর উদ্দিন রুমী রহ. এঁর খানকাহ প্রতিষ্ঠিত হয়।


২।
ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী কোনও রাজবংশে জন্ম নেওয়া কেউ ছিলেন না।

 নিতান্ত সাধারণ পরিবারের সন্তান মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর কর্ম জীবনের শুরুতে বর্তমান আফগানিস্তানের যে ঘুর প্রদেশ, সেখানে তদানীং সুলতানের রাজস্ব অফিসার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন।

কিন্তু রাজস্ব দফতরের কাজে মন বসে না বলে তরুণ বখতিয়ার ভারত এলেন, ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে। 

চেষ্টা করলেন কুতুবউদ্দিনের সেনাবাহিনীতে ঢোকার। কিন্তু তিনি ছিলেন খাঁটো। চেহারাতেও তেমন যোদ্ধা সুলভ ভাব ছিল না। বাদ পড়লেন।

বাদায়ুনে (বর্তমানে উত্তর প্রদেশে) জেনারেল মালিক হিজবার উদ্দিনের সেনাবাহিনীতে অল্প কিছুকাল 

চাকুরিকালেই তিনি অযোধ্যার গভর্নর মালিক হিশাম উদ্দীনের দৃষ্টি আকর্ষণে সফল হন। 

তাঁকে এলাহাবাদের একটা এস্টেট জায়গির দেওয়া হয়।

তিনি ছোট্ট একটা সেনাদল গঠন করেন। মাত্র দুইশজন অশ্বারোহী নিয়ে তিনি উদন্তপুরী (বর্তমান বিহার) বিজয় করেন। 

এর মধ্য দিয়ে তাঁর জন্য বাঙলা বিজয়ের দ্বারোন্মুক্ত হয়। তিনি বাদায়ুনে কুতুব উদ্দিনের কাছে গণিমতের মাল ও কর প্রদান করতে যান।


কুতুব উদ্দিন তাঁকে বাঙলায় অভিযানের অনুমতি দেন এবং বিজিত অঞ্চলের শাসনভার প্রদান করেন। 

আরো পড়ুনঃ➤ বাংলাদেশে ইসলাম 



১২৫০- ১২৬০ সময়কালে রচিত তাবাক্বাত এ নাসিরির বর্ণনা থেকে জানা যায়-

মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি যখন বিহার থেকে বাঙলা অভিমুখে রওনা করেন তখন তাঁর সাথে মাত্র আঠারো জন অশ্বারোহী নিয়ে তিনি নদীয়ায় প্রবেশ করেন।

 নগরিতে ঢোকার সময় তিনি খুব শান্ত, বিনয়ীবেশে প্রবেশ করেন। প্রহরীদের বিভ্রান্ত করা ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।

নগররক্ষীরা তাঁকে কোনও থ্রেট মনে না করে বিনা বাঁধায় নগরে প্রবেশের সুযোগ দেয়। 

প্রহরীদের ধারণা ছিল, তিনি সম্ভবত ঘোড়া বিক্রি করতে এসেছেন। তিনি শহরে প্রবেশের পরপরই সোজা রাজপ্রাসাদে ঢুকে পড়েন।

সে সময় সবে মাত্র রাজসভা শেষ হয়েছে। মধ্যাহ্ন ভোজনের সময় ছিল। 

অপ্রস্তুত রাজমহলে ঢুকে যাওয়ায় রাজা লক্ষণ সেন ভয় পেয়ে পেছনের দরজা দিয়ে খালি পায়ে পালিয়ে যায় এবং বিক্রমপুরে আশ্রয় নেন।


ছোটখাটো বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের কথা বাদ দিলে প্রায় বিনা রক্তপাতে তিনি বাংলা বিজয়ের সবচে' বড়ো ধাপ সম্পন্ন করেন। 

এরপর একে একে সমগ্র বাঙলা বিজয় করে থানা ও তহশিল এবং সেনানিবাস স্থাপন করেন। 

তারিখে ফারিশতা থেকে জানা যায়, রংপুরের অদূরে তাঁর স্থাপিত একটা বৃহৎ সেনানিবাস ছিল।


৩।
ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী কতসালে বাঙলা বিজয় করেছেন তা নিয়ে ১১৯৯ থেকে ১২০৫ পর্যন্ত কমপক্ষে এই ছয়টি সালের মধ্যে বিতর্ক আছে।


 কিন্তু ১২০৫ সালে রচিত হাসান নিজামির, তাজুল মাসাইর গ্রন্থটি এর সমাধান টানে।

তিনি লিখেছেন, ৫৯৯ হিজরির রজব মাসে বখতিয়ার খিলজী কুতুব উদ্দিনের সাথে সাক্ষাত করেছিলেন।

( খ্রিস্টাব্দের হিসেবে তা ছিল মার্চ ১২০৩ ) এর পরের বছর নদীয়া বিজয় করেন তিনি। তাবাক্বাত ই নাসিরির বর্ণনাও এটাকে সমর্থন করে।

রজব, হিজরি বর্ষের সপ্তম মাস। সে হিসেবে ১২০৩ সালের সেপ্টেম্বরে হিজরি পরবর্তী বছরের সূচনা হয়। 

সমসাময়িক অন্য সব ঘটনাবলী বিচার করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, ১২০৩ এর শেষভাগে নয় বরং ১২০৪ সালের অগ্রভাগেই বখতিয়ার খিলজী বাঙলা বিজয় করেন।


কারণ, কুতুবউদ্দিনের সাথে তাঁর সাক্ষাত ও বাংলা অভিযানের মধ্যে এক বছরের থেকে বেশি ছিল না। 

ফলে বাংলা বিজয় ১২০৪ সালেই হয়েছে এটাকেই আমি বিশুদ্ধ মত বলে মনে করি।


(সম্প্রতি কয়েকটা পোস্ট আমার নজরে এসেছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি বাঙলা বিজয় করেন ১৯ রমযান। দিনটিকে কেন্দ্র করেই সেসব পোস্ট করা হয়েছে।

কিন্তু ইতিহাসের সে কালের সমসাময়িক তো বটেই বরং পরবর্তীতেও গ্রহণযোগ্য কোথাও এই বিজয় কিম্বা অভিযানের কোনও প্রকার তারিখ উল্লেখ নেই। যেখানে সাল নিয়েই এত দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে, সেখানে এইভাবে তারিখ নির্দ্দিষ্ট করাটা ঐতিহাসিক সত্যতা বিবর্জিত।)


৪।
চারশো বছরের বৌদ্ধ শাসনের ইতি ঘটিয়ে দক্ষিণ ভারতীয় সেন রাজশক্তি বৃহৎ বাঙলা অঞ্চল দখলে নিলে বৌদ্ধরা যে ব্যাপক দলন-দমন ও হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছিল। 


এর ফলে বৌদ্ধদের অনেকেই নিজের জীবন ও ধর্ম রক্ষায় নেপাল, তিব্বত, চীনে পালিয়ে চলে যায়।

বাঙলা ভাষার সর্বপ্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদ নেপাল থেকে আবিষ্কৃত হওয়া এটাই জানান দেয় যে 'বৌদ্ধধর্ম সংগীত' বুকে ধারণ করেই বাঙালি বৌদ্ধরা হিন্দু সেনবংশীয় সেই শাসনকালে সদূর নেপালে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল।


তদানীং মাত্র একশ বছরের সেন সাম্রাজ্যকালে অত্যাচারমূলক সাম্প্রদায়িক নীতির কারণে এ অঞ্চলের সংখ্যাগুরু বৌদ্ধরা জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছিল।

আজো হয়ত নেপাল, মিয়ানমার, চীনের কোনও প্রান্তরে এই বাঙালি বৌদ্ধের অধঃস্তন উত্তরাধিকারের বাস রয়েছে৷

বিপরীতে সমসাময়িককালে মুসলমানদের ভারত বিজয়ে যে শান্তি ও সমৃদ্ধি কায়েম হয়েছিল- সেন বংশের রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করার মধ্য দিয়ে বাঙলাতেও সেই ধারাবাহিতা শুরু হয়।

ড. দীনেশ চন্দ্র সেন মুসলিম বিজয়ের দিকে ইঙ্গিত করে লিখেন-

'ইতিহাসে কোথাও একথা নাই যে সেনরাজত্বের ধ্বংসের প্রাক্কালে মুসলমানদিগের সঙ্গে বাঙালি জাতির রীতিমত কোনো যুদ্ধবিগ্রহ হইয়াছে। 

পরন্তু দেখা যায় যে বঙ্গবিজয়ের পরে বিশেষ করিয়া উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সহস্র সহস্র বৌদ্ধ ও নিম্নশ্রেণীর হিন্দু, নব ব্রাহ্মণদিগের ঘোর অত্যাচার সহ্য করিতে না পারিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণপূর্বক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়াছে।'

চর্যাপদের আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লিখেন,

 - 'একদিনেই বৌদ্ধদের অর্ধেক ইসলাম গ্রহণ করেন।'


এই জনপদে ইসলাম আগে থেকেই ছিল। কিন্তু রাজশক্তি হিসেবে ইসলামের এই বিজয় ছিল মাজলুমের জন্য সুরক্ষা।

 নির্যাতিত বৌদ্ধদের, আর নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মুক্ত জীবনের ত্রাতা হিসেবে এর আবির্ভাব ঘটেছিল। আর মুসলমানদের দান করেছিল ইজ্জত।

এই বিজয়ের মধ্য দিয়েই 'বাঙলা' অঞ্চল প্রথমবারের মত একটা রাষ্ট্রকাঠামোয় রূপ নেয়। তাই এই বিজয় এদিক থেকেও ছিল ইতিহাসে যুগান্তকারী এক ঘটনা।

ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী কেবল এ অঞ্চলে নয় বরং ইসলামের সামগ্রিক ইতিহাসের বিচারেই অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি।

তিনি এমন এক অঞ্চলে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করে ছিলেন যা উমাইয়া কিম্বা আব্বাসীয় খেলাফতকালে কারো চিন্তাতেও ছিল না।

আল্লাহ্‌ তাঁকে জান্নাতে উঁচু মাকাম দান করুন।
- Arju Ahmed
বাঙলায় মুসলিমদের আগমন। বাংলাদেশে ইসলামের ইতিহাস ও মুসলিম শাসন বাঙলায় মুসলিমদের আগমন। বাংলাদেশে ইসলামের ইতিহাস ও মুসলিম শাসন Reviewed by Dr.Mira Hasan on May 14, 2020 Rating: 5
Powered by Blogger.