রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি আসসালাম এর হাদিস ও সুন্নাহ | হাদিস এর ব্যাপারে অজানা কিন্তু দরকারি কিছু কথা

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি আসসালাম এর হাদিস ও সুন্নাহ | হাদিস এর ব্যাপারে বাংলা ইসলামিক কথা 


আমরা আমরাই। আমরা জেনারেলগো ডিসকাশন জেনারেলগো মতন। ওলামা হযরতগণ হাসাহাসি কইরেন না। শুধু ভুল হলে ধরিয়ে দিয়েন মেহেরবানি করে। 
- Shamsul Arefin Shakti

যারা হাদিস নিয়ে ঘাঁটেন বা দীনী বইপত্রের সাথে সম্পর্ক রাখেন, তারা চেনেন 'মুতাওয়াতির' শব্দটা। হাদিসের একটা ক্যাটাগরি হিসেবে চিনি আমরা। যে হাদিস প্রতি জেনারেশনে এত সংখ্যক রাবী (বর্ণনাকারী) পৃথক পৃথক সূত্রে উল্লেখ করেছেন, যাদের পক্ষে একত্রিত হয়ে বানোয়াট কিছুকে সত্য বলে চালানো অসম্ভব। এবং প্রতি জেনারেশনেই বহু সংখ্যক মানুষ আলাদা আলাদা করে একই হাদিস Pass করেছেন পরবর্তী প্রজন্মের বহু সংখ্যক মানুষের কাছে। এই হাদিসগুলো শক্তিশালী অকাট্য হাদিস। কেননা ধরেন, মক্কায় ১০ জন, বাগদাদে ১০ জন, উন্দুলুসে ১০ জন, বুখারায় ১০ জন ভিন্ন ভিন্ন চেইনে একটাই কথা শুনেছেন এবং বলেছেন। সে কথা মিথ্যে হবার সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি। প্রতিযুগে নির্ভরযোগ্য শ্রোতা ও বর্ণনাকারীদের এই সংখ্যাধিক্যমূলকContinuity-কে বলা হয় 'তাওয়াতুর', আর হাদিসটিকে বলা হয় 'মুতাওয়াতির'। সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাকার আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. তাঁর 'ইকফারুল মুলহিদীন' (বঙ্গানুবাদ: ওরা কাফের কেন?) কিতাবে তিন প্রকার তাওয়াতুর উল্লেখ করেছেন। 

১. তাওয়াতুরে সনদ: 
হাদিসের ক্ষেত্রে কেবল যেটা আলোচনা করলাম। সনদ মানে 'বর্ণনা চেইন'। যেমন ধরেন: নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস, "যে আমার ব্যাপারে নিজ থেকে মিথ্যা বলবে, তার স্থান হবে জাহান্নাম"। ৩০ জন সাহাবী এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। মানে পয়লা যুগেই ৩০ জনা। এই তথ্যও এসেছে ১০০/২০০ জন সাহাবী প্রথম যুগে এই হাদিস বলেছেন। তাঁদের মুখ থেকে পরের যুগে অসংখ্য ব্যক্তি, এরপর তাঁদের থেকে আবার অসংখ্য এভাবে প্রতি যুগে কত মানুষ এই একটা কথা শুনেছেন ও বলেছেন? তার মানে এটা যে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুখেরই কথা এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকে আর? এই হাদিসটি মুতাওয়াতির এর একটা উদাহরণ। 

২. তাওয়াতুরে তবকা:
কোনো যুগের লোকজন আগের যুগের লোকজন থেকে কোনো রেওয়ায়েত, আকীদা বা আমল অব্যাহতভাবে শুনতে থাকলে এবং শোনাতে থাকলে তাকে 'তাওয়াতুরে তবকা' বলে। এর উদাহরণ হল: কুরআনে কারীম। মরক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়া, তানজানিয়া থেকে তাতারিস্তান প্রতি যুগে লক্ষ মানুষ তার আগের জেনারেশনের লক্ষ লোক থেকে কুরআন শিখেছে, পড়েছে, পড়িয়েছে, হিফজ করেছে করিয়েছে, বর্ণনা করেছে। প্রতি যুগে লক্ষ-হাজার-শত মানুষ। এভাবে যুগ ধরে চলে যান, শেষ অব্দি সাহাবা হয়ে নবীজীতে গিয়ে ঠেকবে। সাব্যস্ত করতে হাদিসের মত কোনো সনদের প্রয়োজন পড়বে না, কোনো রাবীর নাম নেয়া লাগে না। 
এক ভাইকে ইনবক্সে প্রশ্ন করেছিলাম, কুরআন যে প্রামাণ্য এবং আল্লাহর বাণী এ কথা কে বলে দিল আমাকে? হ্যাঁ, তার প্রমাণ এই তাওয়াতুর। অনেক ভাই বলে, কুরআন মানবো, হাদিস মানবো না। কেন? সেই সূত্রে আপনি কুরআন পেয়েছেন, সেই সূত্রে তো হাদিসও পেয়েছেন। বলে কিনা, হাদিস নবীজীর জন্মের ২০০ বছর পর নাকি সংকলিত। মূর্খতার সীমা নেই। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবদ্দশাতেই শেষ দিকে হাদিস লেখার অনুমতি দিয়েছেন। যখন কুরআনের বর্ণনাশৈলী ও হাদিসের ভাষা সুস্পষ্টভাবে সাহাবীরা বুঝে গেছেন, আর গুবলেট হবার কোনো চান্স নেই, তখন। বহু সাহাবীর নিজস্ব হাদিসের ডায়রী ছিল, যাঁরা লেখাপড়া জানতেন। সেই হাদিসগুলোই তাওয়াতুরের মাধ্যমে পরের জেনারেশনে pass হয়েছে। বুখারী শরীফকেই বেচারারা প্রথম হাদিসের কিতাব ভেবে রেখেছে। 

৩. তাওয়াতুরে আমল/তাওয়াররুস: 
প্রত্যেক যুগে বহু সংখ্যক মানুষ দীনের যেসব বিষয় আমল করেছে নবী-সাহাবাযুগ থেকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে, মাঝে কোথাও গিয়ে হারিয়ে যায়নি, কিংবা নবীযুগ থেকে খবর নেই, ৫০০ বছর পর এসে এ বুজুর্গ পর্যন্ত পাওয়া যায়। মানে নতুন জিনিস শুরু হয়েছে। এইসব বিষয় ও তার হুকুম আহকামও মুতাওয়াতির। যেমন ধরেন: ওযু, মিসওয়াক, কুলি, নাকে পানি, জামাআতে নামায। নবীজীর জীবদ্দশায় সোয়ালক্ষ সাহাবী। লক্ষ সাহাবী তাঁদের সন্তানকে ওযু শিখিয়েছেন, প্রতি যুগে লক্ষ বাবা তাদের সন্তানকে ওযু শিখিয়েছেন। এখন কেউ যদি এসে বলে, ওযু দরকার নেই, সাহাবীরা খেতখামারে কাজ করতেন তাই ওযু করতেন, এসিরুমে যারা থাকে তাদের ওযু লাগে না। নগদে এই লোক কাফের হয়ে যাবে, চাই হাজী-গাজী যাই হোক। 

মূল আলোচনা শেষ। এখন তিনটে পয়েন্ট আলোচনা থেকে:
★দীনের কিছু বিধানের মধ্যে ৩ প্রকারের তাওয়াতুরই আছে। যেমন: ওযুতে মিসওয়াক করা, কুলি করা, নাকে পানি। এর হাদিসও মুতাওয়াতির, বিষয়টাও মুতাওয়াতির, প্র্যাকটিক্যালি কাজটাও মুতাওয়াতির। 
★ অনেক ভাই তাওয়াতুরের সংজ্ঞা না জানায় মনে করেন, মুতাওয়াতির হাদিস ও বিষয়ের সংখ্যা বোধ হয় কম কম। না ভাই, বরং আমাদের শরীয়তে মুতাওয়াতির বিধানের সংখ্যা এতো বেশি যার তালিকা করতে মানুষ ব্যর্থ। অধিকাংশ বিধানই তিন প্রকার তাওয়াতুরের কোনো এক প্রকারে অবশ্যই পড়বে। সুবহানাল্লাহ। 
★ বহু হাদিস ও হুকুম এমন আছে, আমরা সেটা মুতাওয়াতির হবার খবরই জানি না (যেকোনো এক প্রকার)। পরে দেখায় সেটা কোনো না কোনো প্রকার মুতাওয়াতির। 

সুতরাং হুট করে কোনো সুন্নাহ বা হাদিস অস্বীকার করা যাবেনা। কেননা ঐ জিনিস যদি আসলেই মুতাওয়াতির হয়ে থাকে, তবে জেনে রাখেন: মুতাওয়াতির সুন্নাহ অস্বীকার করা কুফর। নসীহা নিই, সতর্ক হই। এখানে সুর ফতোয়ার না, নসীহতের। 
★ নামায পড়া ফরয, একে ফরয জানাও ফরয, শেখাও ফরয। ফরয বলে বিশ্বাস না করা কুফর। নামায সম্পর্কে মূর্খ থাকাও কুফর। 
★ মিসওয়াক করা নবীর সুন্নত, এর উপর আমল করাও সুন্নত। কিন্তু মিসওয়াককে সুন্নত বলে বিশ্বাস করাটা আবার ফরয। সুন্নত বলে অস্বীকার করাটা কুফর। অর্থাৎ, মুতাওয়াতির সুন্নাতকে সুন্নাত মনে না করা কুফর। 

কাউকে ফতোয়া দিবেন না। এগুলো আলিমগণের ফিল্ড। আমরা জাস্ট নিজে শিখি, সতর্ক থাকি। 

সূত্র: 'ওরা কাফের কেন?' পৃষ্ঠা: ৪৫-৪৭ অবলম্বনে
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি আসসালাম এর হাদিস ও সুন্নাহ | হাদিস এর ব্যাপারে অজানা কিন্তু দরকারি কিছু কথা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি আসসালাম এর হাদিস ও সুন্নাহ | হাদিস এর ব্যাপারে অজানা কিন্তু দরকারি কিছু কথা Reviewed by Dr.Mira Hasan on May 23, 2020 Rating: 5
Powered by Blogger.