বাংলা ইসলামিক উপদেশ মূলক কথার পোস্ট | 'অন্তরের প্রথম রোগ: অধিক কথা বলা' ও ইসলামিক ছবি পিকচার

বাংলা ইসলামিক উপদেশ মূলক কথার পোস্ট | 'অন্তরের প্রথম রোগ: অধিক কথা বলা' | ইসলামিক ছবি পিকচার ডাউনলোড 


'অন্তরের প্রথম রোগ: অধিক কথা বলা'
(১ম পর্ব)
.
বেশ কিছু অঙ্গের সমষ্টির নাম মানুষ। অঙ্গগুলো সুন্দর পথে চললে মানুুষও আলোময় পথে চলে। মানুষের একটি ছোট্ট অঙ্গের নাম জিহ্বা বা যবান।যার সাহায্যে আমরা কথা বলি।অধিক কথা বলার রোগ এর সাথে সম্পর্কিত। 'যবান' শব্দ শরীরে ছোট্ট কিন্তু তাৎপর্য বিচারে অনেক বড়।কারণ, আমাদের এই ছোট্ট অঙ্গটির সঠিক ব্যবহার যেমনি ভাবে আমাদেরকে আমাদের আসল ঠিকানা জান্নাতের আলোকময় পথ দেখাতে পারে, অনুরূপভাবে জাহান্নামের অন্ধকার গলিতেও নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা এটির সঠিক ব্যবহার জানি না কিংবা জানলেও করি না। বরং এক্ষেত্রে আমরা এতটাই উদাসীনতা ও মন্দ-উদারতা দেখাই যে, এর কারণে জাহান্নাম আমাদের জন্য কত সহজ হয়ে যাচ্ছে! জান্নাত কত কঠিন হয়ে ওঠছে! বর্তমানে যার ব্যবহার খুব বাজে পদ্ধতিতে করা হয়।
.
আরবি ভাষায় প্রবাদ আছে- اَلْلِسَانُ جِسْمُهُ صَغِيْرٌ وَجُرْمُهُ كَبِيْر ‘জিহ্বা গঠনাকৃতি যার ছোট, তবে অপরাধ সংঘটনে বেশ বড়।’
.
মহান আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ
‘মুমিন সকল! যা কর না তা কেন বল?’
.
বল একটা আর কর ভিন্নটা-এটা আল্লাহর কাছে একেবারে অপছন্দ। এতে আল্লাহ রাগ করেন। মুমিনের যবান আল্লাহর কাছে খুবই মূল্যবান। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,
.
مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
.
‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তার জন্য তৎপর পাহারাদার তার নিকটেই রয়েছে।’
.
ইমাম ইবনে কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
'অর্থাৎ আদম সন্তান যত কথা বলে, প্রতিটি কথা পর্যবেক্ষণকারী সদা উপস্হিত ফেরেশতা রয়েছে, যে প্রতিটি কথা লিখে রাখে, একটি শব্দ বা একটি হরকতও ছাড়ে না।'
.
ইমাম আহমদ বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
' বান্দার অন্তর ঠিক হয় না, যতক্ষণ না তার যবান ঠিক না হয়। আর বান্দার ইমান ঠিক হয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত অন্তর ঠিক না হয়।'
.
তুমি কত পুরস্কার ও কল্যাণ নষ্ট করে দিলে, হে আল্লাহর বান্দা! তুমি একটি মজলিসে বসে কথাবার্তা বলছো, কিন্তু তুমি জান না, তুমি কি হারাচ্ছো। তুমি যদি যিকির ও ইস্তেগফার এ মনোনিবেশ করতে তাহলে সেটা তোমার জন্য কতই না ভালো হত। এতে তোমার হয়ত দু তিন মিনিট সময় ব্যয় হত। তুমি যদি এ দুনিয়ায় একটি খেজুর বৃক্ষ রোপণ করতে চাইতে, তাহলে তাতে তুমি কত চেষ্টা ও সময় ব্যয় করতে! পানি দিতে, রক্ষণাবেক্ষণ করতে, পরিচর্যা করতে। এতে ফল দিতে হয়ত এক বছর লেগে যেত। আবার কখনো ফল না দেওয়ার সম্ভাবনা ও থাকত। কিন্তু তিন মিনিটের মধ্যে তুমি জান্নাতে একটি খেজুর বৃক্ষ লাভ করতে পারতে, যার কান্ড হত স্বর্ণের। তুমি কি কখনো কোন মজলিসে একশত বার
سُبْحَانَ اللّٰهِ وَبِحَمْدِهِ
বলে দেখেছো? তোমার পাঁচ মিনিটের বেশি সময় লাগত না।
.
হে ভাই! তুমি যবানের ব্যাপারে উদাসীন হওয়া থেকো সাবধান হও। কারন, এটি হল একটি হিংস্র ক্ষতিকর জন্তুর ন্যায়, তুমি যার প্রথম শিকার।
.
হে ভাই! যবানের ব্যাপারে উদাসীন হওয়া থেকে সাবধান হও। কারণ, তোমার অঙ্গ- প্রত্যঙ্গগুলোর মধ্যে এটাই তোমার বিরুদ্ধে সর্বাধিক অপরাধ করে থাকে। তুমি তোমার আমলনামায় কিয়ামতের দিন যত বদ আমল দেখতে পাবে, তার অধিকাংশই তোমার যবানই তোমার বিরুদ্ধে লিখিয়েছে।
.
ইমাম তিরমিযি বর্নণা করেন,
'মানুষের মুখের ফসলগুলোই মানুষকে জাহান্নামে উল্টোমুখী করে বা নাকের উপর করে নিক্ষেপ করে।'



'অন্তরের প্রথম রোগ: অধিক কথা বলা'
(২য় পর্ব)
.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
'মুসলিম সে ই, যার যবান ও হাত থেকে মুসলমানগণ নিরাপদ থাকে।'
হাসান ইবনে সালিহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
'আমি তাকওয়ার অনুসন্ধান করলাম। তাতে যবানের চেয়ে কম আর কিছুর মধ্যে পেলাম না।'
.
ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. থেকে বর্নিত,
তিনি আবু বকর রা. এর নিকটে গেলেন। তিনি দেখলেন আবু বকর রা. তার জিহ্বা টেনে ধরেছেন।
ওমর রা. বললেন,
থামুন! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন!
আবু বকর রা. বললেন,
এটা আমাকে অনেক ঘাটে অবতরন করিয়েছে! কে বললেন একথা? তিনি হলেন নবী রাসূলদের পরে সর্বোত্তম ব্যক্তি। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু।
.
তাউস ইবনে কাইসান রাহিমাহুল্লাহ দীর্ঘ নিরবতার ব্যাপারে ওজর পেশ করতেন। তিনি বলতেন,
'আমি আমার যবানকে পরীক্ষা করেছি, আমি দেখলাম সে হচ্ছে দুগ্ধপোষ্য শিশুর ন্যায় দুষ্ট।'
.
তো যবান কখন দুগ্ধপোষ্য শিশুর ন্যায় দুষ্ট হয়ে আপনাকে অনেক ঘাটে অবতরণ করিয়ে ছাড়বে? কখন? যখন আপনি অধিক কথা বলবেন!অধিক কথা বলার ফলে কি হয়? অধিক কথার দ্বারা এমন অনেক গুনাহের দ্বার খুলে যায় যা আমাদের কল্পনাতীত। অধিক কথার ফলে কোন না কোনভাবে নিম্নের গুণাহ এর মধ্যে নিজেকে নিজের অজান্তে জড়িয়ে ফেলা হয়।
.
আলেমগণ বলেন,
১. মিথ্যা বলায় অভ্যস্ত হয়ে পড়া।
২. গীবতে জড়িয়ে পড়া।
৩. পরনিন্দা করা। অনর্থক ঝগড়া করা।
৪. অতিরিক্ত হাসাহাসি করা, যার ফলে দিল মরে যায়। কুফরী কথার চর্চা হয়।
৫. অন্যের অযাচিত প্রশংসা করা।
ইত্যাদি গুনাহ অধিক কথার দ্বারা হয়ে থাকে। আর এ সব গুনাহের মধ্যে এমন গুণাহ ও রয়েছে যা আপনাকে সত্যই দুনিয়া ও আখেরাতে অনেক ঘাটে অবতরণ করাবে। আখেরাত বরবাদ করে দিবে। এখন, এ গুনাহগুলো ও তার ভয়াবহতার ওপর কিছু আলোকপাত করা যাক।
.
১.মিথ্যা বলা : সত্য সর্বাবস্হায় কল্যানকর।
ওমর ইবনুল খাত্তাব বলেন, 'সত্য আমাকে নিচে নামিয়ে দেওয়া(যা খুবই কম হয়), আমার নিকট মিথ্যা আমাকে উপরে উঠিয়ে দেওয়া থেকে উত্তম(যা খুবই কম হয়)।'
.
শায়খুল ইসলাম বলেন,
'সত্য হল সকল কল্যাণের চাবি, অনুরূপ মিথ্যা হল সকল অকল্যাণের চাবি।'
.
তুমি সততা থেকে কখন বঞ্চিত হবে?
.
সাহল আত-তাসতারী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
'যে অনর্থক কথাবার্তা বলে, সে ই সততা থেকে বঞ্চিত হয়।'
.
তো আপনি যখন অধিক কথা বলবেন সত্যবাদিতা নামক উত্তম চরিত্র থেকে বঞ্চিত হবেন এবং মিথ্যার ভেড়াজালে আবদ্ধ হবেন।
.
রাবাহ ইবনু ইয়াযিদ রহ. বলেন,
‘সত্যবলার অভ্যাস গড়ে তুলতে আমার সময় লেগেছে ষোল বছর।’
আর আমরা? আমরা অধিক কথার দ্বারা তা অর্জন তো দূরের কথা, তা থেকে উল্টো পথে অবতীর্ণ হই।
.
কিছু মিথ্যা তো এমন আছে, যা স্বাদহীন, অনর্থক। কিন্তু আমাদের তো অভ্যাস বলার। যেমন, ফোনে বললাম, আমি এক সেকেনডে আসছি। বলুন তো, কেউ কি এক সেকেন্ডে কোথাও যেতে পারে? স্পষ্ট মিথ্যা। ফেরেশতারা তো সেটাই লিখবে, যা সে বলেছে। এটাকে বলা হয় স্বাদহীন গুনাহ। অর্থাৎ গুনাহ করল, কিন্তু মজা পেল না।
.
এজন্য নিজেকে যাচাই করুন। দেখুন, কী পরিমাণ মিথ্যা বিনাকারণে আমরা বলি। বলার সময় নিজের কানেও নিজের কথাটা একটু শুনুন। দেখবেন, আমাদের নিত্যদিনের মিথ্যাগুলো পাথরকণার মত জমা করলে ‘মিথ্যার পাহাড়’ হয়ে যাবে। এমন নয় যে, কেবল মিথ্যাবাজরাই মিথ্যা বলে। বরং তাহাজ্জুদগুজার, নেককারলোকও মিথ্যা বলে। কিন্তু অর্থহীন মিথ্যাগুলোকে আমরা মিথ্যা মনে করি না, তাই টের পাই না। এজন্য আবারও বলছি, আজ থেকে নিজের কথাগুলো নিজের কানকেও একটু শোনান। দেখবেন, কত মিথ্যা যে আমরা প্রতিদিনই বলে যাচ্ছি!
.
অবাক করা ব্যাপার হল, এইযুগে শয়তান মিথ্যার জঘন্যতাকে সহজ করে তোলার উদ্দেশে মিথ্যার আরেকটি নাম দিয়েছে ‘বাহানা’। কেননা, ‘মিথ্যা’ শব্দ শুনতে একটু হলেও খারাপ লাগে কিন্তু ‘বাহানা’ শব্দ বললে এই খারাপ লাগাটা আর বাকি থাকে না। স্ত্রী বলে, স্বামীকে একটা বাহানা দেখিয়ে দিয়েছি। স্বামী বলে, স্ত্রীর কাছে একটা ‘বাহানা’ পেশ করে দিয়েছি। ছেলে বলে, বাবার কাছে ‘বাহানা’ দেখিয়ে টাকা আদায় করে নিয়েছি। অথচ এসবই মিথ্যা। আল্লাহর কাছে এগুলো মিথ্যা হিসাবেই লিপিবদ্ধ হয়। সুতরাং আজ থেকে নিজের কানে নিজের কথা শোনার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। দেখবেন, নিজেই নিজের মিথ্যার দীর্ঘ তালিকা দেখে অবাক হবেন। ভাববেন, এত মিথ্যা আমি বলি! অনেক সময় তো ক্ষণিকের লজ্জা থেকে বাঁচার জন্যও আমরা মিথ্যা বলি। একটু ভাবুন, ক্ষণিকের লজ্জার চাইতে আল্লাহর কাছে কেয়ামতদিবসের লজ্জা আরো কত বেশি হবে! কত ক্ষতির সওদা আমরা প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছি।
.
একবার মজলিসে নবীজী হেলান দেওয়া থেকে সোজা হয়ে উঠে বসলেন, বললেন, আরে ভালো করে শুনে রাখ! (বড় কবীরা গুনাহের অন্যতম হল,) মিথ্যা বলা, মিথ্যা বলা, মিথ্যা বলা। নবীজী অতি গুরুত্বের সাথে এ বাক্য বারবার বলতে লাগলেন। এ দেখে আমরা (মনে মনে) বলে উঠলাম, (নবীজীর তো কষ্ট হচ্ছে!) নবীজী যদি একটু চুপ করতেন!
-সহীহ বুখারী, হাদীস ২৬৫৪
.
মিথ্যার পরিণাম কি?
মিথ্যার পরিণাম জাহান্নাম। দুনিয়ার পরিণাম হলো লাঞ্ছনা। কারণ, মিথ্যা গোপন থাকে না; কোনো না কোনোদিন প্রকাশ পেয়েই যায়। একটি মিথ্যা দশটি মিথ্যা টেনে আনে, পাপের বোঝা বাড়াতেই থাকে। একপর্যায়ে মিথ্যার জাল থেকে বের হওয়া কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং সাময়িক ও বাহ্যিক ক্ষতি বা শাস্তি মেনে নিয়ে হলেও মিথ্যা থেকে একশ হাত দূরে! নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
.
وَإِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ، فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ، وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ، وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَكْذِبُ وَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللهِ كَذَّابًا.
.
তোমরা মিথ্যা থেকে দূরে থাকো। নিশ্চয় মিথ্যা পাপের পথে নিয়ে যায়। আর পাপ জাহান্নামে নিয়ে ফেলে। ব্যক্তি মিথ্যা বলতেই থাকে, মিথ্যার খোঁজে থাকে; এক পর্যায়ে আল্লাহর খাতায় ‘কায্যাব’ (মহা মিথ্যাবাদী) হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়।
-সহীহ বুখারী, হাদীস ৬০৯৪;
সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬০৭


অন্তরের প্রথম রোগ : অধিক কথা বলা
(৩য় পর্ব)
.
আমাদের আলোচনা চলছিল অধিক কথার ফলে যেসব গুনাহ সংগঠিত হয় এ ব্যাপারে। প্রথম গুনাহ 'মিথ্যায় অভ্যস্ততা' নিয়ে গত পর্বে আলোচনা হয়েছে। আজ বাকিগুলো নিয়ে আলোচনা।
.
২. গীবত :
অধিক কথা বলার ফলে ব্যক্তি নিজের অজান্তে গীবত এ জড়িয়ে যায়। অথচ, এটা মানুষের সমাজে শত ফ্যাসাদের কারণ। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে এ ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। এর নিকৃষ্টতা ব্যক্ত করেছেন- নিজের মৃত ভাইয়ের গোস্ত ভক্ষণের সাথে তুলনার মাধ্যমে-
.
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اجْتَنِبُوْا كَثِیْرًا مِّنَ الظَّنِّ ؗ اِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ اِثْمٌ وَّ لَا تَجَسَّسُوْا وَ لَا یَغْتَبْ بَّعْضُكُمْ بَعْضًا اَیُحِبُّ اَحَدُكُمْ اَنْ یَّاْكُلَ لَحْمَ اَخِیْهِ مَیْتًا فَكَرِهْتُمُوْهُ وَ اتَّقُوا اللهَ اِنَّ اللهَ تَوَّابٌ رَّحِیْمٌ.
হে মুমিনগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, কোনো কোনো অনুমান গুনাহ। তোমরা কারো গোপন ত্রুটির অনুসন্ধানে পড়বে না এবং একে অন্যের গীবত করবে না। তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? এটাকে তো তোমরা ঘৃণা করে থাকো। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।
-সূরা হুজুরাত (৪৯) : ১২
.
গীবত সম্বন্ধে আরো বহু বর্ণনা রয়েছে। গীবত থেকে বাঁচার জন্য আজ শুধু এতটুকু জেনে নিই- গীবত ও পরনিন্দার শাস্তি কত কঠিন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
.
لَمَّا عُرِجَ بِي مَرَرْتُ بِقَوْمٍ لَهُمْ أَظْفَارٌ مِنْ نُحَاسٍ يَخْمُشُونَ وُجُوهَهُمْ وَصُدُورَهُمْ، فَقُلْتُ: مَنْ هَؤُلَاءِ يَا جِبْرِيلُ، قَالَ: هَؤُلَاءِ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ لُحُومَ النَّاسِ، وَيَقَعُونَ فِي أَعْرَاضِهِمْ.
মে‘রাজের সময় আমি কিছু লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, যাদের ছিল তামার নখ। সেই নখ দিয়ে তারা নিজেদের চেহার এবং বুক ক্ষত-বিক্ষত করছিল। আমি বললাম, জিবরীল! এরা কারা? উত্তরে তিনি বললেন, যারা (দুনিয়াতে) মানুষের গোশত খেত (গীবত করত) এবং মানুষের সম্মান হানি করত। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৮৭৮; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৩৩৪০
.
৩. পরনিন্দা :
সামাজিক ফাসাদের ক্ষেত্রে পরনিন্দা আরো মারাত্মক। পরনিন্দা বলা হয় - বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একের দোষ অন্যের কানে লাগানো। অধিক কথা বলার ফলে প্রায়ই আমরা কথার ফাঁকে
এ ধরণের চর্চা করে থাকি। অথচ, পরনিন্দাকারী অন্যকে লাঞ্ছিত করতে গিয়ে একসময় নিজে লাঞ্ছিত হয়; যখন মানুষ তার আসল উদ্দেশ্য জেনে যায়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে এ স্বভাবের নিন্দা করে বলেন,
وَیْلٌ لِّكُلِّ هُمَزَةٍ لُّمَزَةِ.
দুর্ভোগ প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির, যে পেছনে ও সামনে মানুষের নিন্দা করে।
-সূরা হুমাযাহ, (১০৪) : ১
.
আর পরনিন্দাকারীর পরিণাম বড় ভয়াবহ। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ.
পরনিন্দাকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
-সহীহ মুসলিম, হাদীস ১০৫; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস ১০৫৯০
.
৪. হাসি-তামাশা :
‘হে মুমিনগণ! কেউ যেন কাউকে উপহাস না করে। কেননা যাকে অবজ্ঞা করা হয় সে অবজ্ঞাকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে।’
.
ঠাট্টা-উপহাস নিষিদ্ধ করার কারণ হল, এ সময় যবান থেকে আজেবাজে কথা বের হয়ে যায়। যবান তখন মুখরাপনা হয়ে ওঠে। খুব সহজেই আরেকজনের অন্তরে আঘাত করে বসে। অথচ কেয়ামতের দিন এসব উচ্চারিত কথা সত্য হিসাবে প্রমাণ করা নিদারুণ কঠিন হবে।আর, অধিক কথা বলার ফলে এর ও চর্চা হয়ে থাকে।
.
৫. কুফরিকথা :
ওলামায়ে কেরাম ‘কুফরি কথাগুলো’ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হল, এই কুফরি কথাগুলোর মধ্য থেকে কিছু কথা বর্তমানে মুসলমানদের মুখেও শোনা যায়।
نقل كفر كفر نہ باشد
‘কুফরি কথা বোঝানোর উদ্দেশে বর্ণনা করা কুফরি নয়।’ তাই কিছু কুফরিকথার কিছু উদাহরণ পেশ করছি। যেমন,
.
–কেউ জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় থাকেন?’ আপনি উত্তর দিলেন, ‘অমুক জায়গায় থাকি।’ তখন প্রথমোক্ত লোকটি বলে বসল, ‘ওহ! এতদূর! আল্লাহর পেছনে!’ এই কথাটা কুফরি কথা। আমরা তো হাসি-তামাশা করেই বলে বসি, ‘আল্লাহর পেছনে…’। অথচ এটা কুফরি কথা। কুফরি কথার দ্বারা ঈমান চলে যায়, স্ত্রী তালাক হয়ে যায়।
.
–কেউ বলল, ‘অমুক কাজটি শরিয়ত-মাফিক হয়েছে।’ তখন আরেকজন বলে বসল, ‘আরে রাখো তোমার শরিয়ত।’ এটাও কুফরি বাক্য।
.
এ জাতীয় কুফরিকথা আমরা প্রতিদিন কমবেশি শুনি। একবারের ঘটনা। আমি এক ফ্যাক্টরির ম্যানেজারের কাছে বসা ছিলাম। তিনি এক ব্যক্তিকে ডাকলেন। যাকে দেখতে-শুনতে ভদ্র, ধার্মিক ও বুদ্ধিমান মনে হচ্ছিল। মুখে খোঁচাখোঁচা ছোট দাঁড়িও আছে। ম্যানেজার সাহেব লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বল তো ভাই! দিনকাল কেমন যাচ্ছে?’ লোকটি উত্তর দিল, ‘আগে তো পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যেই দুআ শুনত। এখন শোনে না। কি-জানি কোথায় যে চলে গেল! তাই আমিও নামায ছেড়ে দিয়েছি।’
.
আল্লাহর মহত্ব ও বড়ত্ব সামনে রাখুন। লোকটির উক্ত মন্তব্যের প্রতিও দেখুন। আসতাগফিরুল্লাহ… বিশ্বাস করুন, লোকটির মন্তব্যটা শুনে আমার কান গরম হয়ে গেল। যেন আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যেতে লাগল। অথচ দেখলাম লোকটি একেবারে স্বাভাবিক। মনে হচ্ছে যেন হাসি-তামাশার উদ্দেশ্যেই কথাটা বলেছে অথচ এজাতীয় কথা কুফরি।
‎إصلاح-Islah
Powered by Blogger.