বিয়ের আবার বয়স! (পর্ব ১)

বিয়ের আবার বয়স! (পর্ব ১)
আল্লাহর সুন্নত জিনিসটা কী সেটা আমরা অনেকেই বুঝিনা। সুন্নাত মানে কর্মপন্থা, কার্যপদ্ধতি বা কৌশল। সুন্নাত বলতে সাধারণত আমরা রাসুলুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসসাল্লাম এর কথা, কাজ ও সমর্থনকে বুঝে থাকি। কিন্তু এখানে সুন্নত হলো Policy।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিজস্ব কিছু পলিসি আছে। এই পলিসি এতোটাই স্বাতন্ত্রিক যে আল্লাহর এই পদ্ধতির কোন ব্যতিক্রম হয় না। যদিওবা ব্যাতিক্রম সবই করার ক্ষমতা তিনি রাখেন।
যেমন ধরুন, আল্লাহ রিজিকদাতা। আমাদের খাওয়াবেন। কিন্তু কিভাবে খাওয়াবেন?
তিনি চাইলেই আকাশ থেকে খাবার পাঠাতে পারেন যেমনটা তিনি করেছিলেন বনি ইসরায়েলের জন্য। প্রতিদিন বেহেশত থেকে ঝুড়ি ভর্তি হয়ে মান্না এবং সালওয়া নামক দুধরনের খাবার আসতো। কিন্তু ইসরায়েলি ইহুদীদের মন ভরলোনা। তারা নিষেধ থাকা সত্বেও খাবার জমাতে শুরু করলো। আল্লাহ খাবার পাঠানো বন্ধ করে দিলেন। শাস্তি স্বরূপ কৃষিকাজের মাধ্যমে খাবার উৎপাদন করার নির্দেশ দিলেন।
কিন্তু আল্লাহ পরম করুণাময়। করুণার আধার। "লা ইউকালিফুল্লাহু নাফসান ইল্লা উস'আহা" আল্লাহ কারও উপর এমন কিছু চাপিয়ে দেন না যার ভার সে বহন করতে অক্ষম। তাই তিনি কৃষিকাজে কিছুটা শিথিলতা দিলেন।
আর সেটা হচ্ছে মানুষ শুধু গাছ লাগিয়ে নিশ্চিন্তে শুয়ে বসে দিন কাটালেও কিছুটা ফসল পাবে। গাছের খাবার যেন সে নিজেই জোগাড় করতে পারে সেজন্য তাকে বিশেষ উপায়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। গাছের অটোমোশনটা সত্যিই বেশ চমৎকার। সূর্য্যের আলো থেকে তাপ সংগ্রহ করে, ভিটামিন ডি সংগ্রহ করে, মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পানি ও খনিজ সংগ্রহ করে। শেকড় বেয়ে উপরে উঠে চলে যায় এই খাবার। শিরায় শিরায় পৌঁছে যায় নিজে থেকেই।
এই গাছের জন্য পানি প্রয়োজন। মাটির ভেতরে পানির কিছু অংশ দিয়ে রেখেছেন আল্লাহ। এই পানিকে পিউরিফাই করে শুকিয়ে উপর উঠিয়ে নেন, ঘনীভূত করে আকাশে জমা করেন। আবার বাতাসের সাহায্যে এর অবস্থান পরিবর্তন করান। অত:পর ঘনত্ব বাড়িয়ে দিয়ে প্রবল বেগে মাটিতে বর্ষণ করান। গাছ, প্রাণী সবার জীবিকা চলে এই পানি দিয়ে।
আল্লাহ বলেন, আমিই আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষন করি আর আমিই মাটিকে ফসল ফলানোর সামর্থ্যানুযায়ী উর্বর করে দিয়েছি। এর অর্থ হলো তোমাদের কৃষি নিয়ে টেনশন করতে হবেনা। খাবার নিয়ে টেনশন করতে হবেনা।
আল্লাহ রাজ্জাক তাই রিজিকের চিন্তা আমাদের নয়। কিন্তু আপনি যদি গাছ না লাগান অথবা কৃষি উৎপাদনের চেষ্টা না করেন তাহলে কৃষির সাথে জড়িত নেয়ামতগুলো আপনি পাবেন না। সোজা কথা।
আল্লাহ সব প্রয়োজনই পুরণ করেন তবে একটি গ্রহনযোগ্য মাধ্যমে। অলৌকিকভাবে নয়। পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে তাপের প্রয়োজন। এই তাপ তিনি প্রদান করতেই পারতেন গায়ে গায়ে আগুন জ্বালিয়ে কিন্তু তিনি সেটা করেননি। কোটি কিলোমিটার দূরের একটি গ্যাসীয় দাহ্য বস্তুর দহনের তাপ, আলো, সৌরশক্তি তিনি পাঠিয়ে দিচ্ছেন দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে। আবার এই তাপ সহ্য করার জন্য দিয়েছেন রাত।
আপনার খুব টাকার প্রয়োজন। এই মুহুর্তে আকাশ থেকে একটা একহাজার টাকার একটা নোট পড়বে, এমন কামনা করছেন। ঠিক এই সময় আপনার প্রতিবেশি আপনাকে এক হাজার টাকা দিয়ে বললেন 'ভাই, আপনি আমার কাছ থেকে পেতেন, গতমাসে নিয়েছিলাম'। আল্লাহ এভাবে সাহায্য করেন।
কেউ রোগাক্রান্ত হলে আল্লাহ মুহুর্তে তা সেরে তোলার ক্ষমতা রাখেন কিন্তু তিনি তা করেন না। তিনি আপনাকে একজন ভালো চিকিৎসকের মাধ্যমে শিফা দান করেন। আপনি যে ওষুধ খান তার মাঝে আল্লাহ কল্যান দান করেন। আপনি যখন বিপদে পড়েন তখন আপনি ভাবেন আল্লাহ নিজে এসে আপনাকে উদ্ধার করবেন। কিন্তু আল্লাহ আপনাকে ভুলে যান নি, তিনি তাঁর পক্ষ থেকে একজন অভিভাবক, একজন সাহায্যকারী পাঠিয়ে আপনাকে উদ্ধার করেন।
এটা হচ্ছে আল্লাহর পলিসি। মানুষেরও দায়িত্ব আছে এখানে। আল্লাহ রিজিকদাতা কিন্তু আপনি যদি কোন কাজ না করে বসে থাকেন তাহলে আল্লাহ ক্ষমতা থাকা সত্বেও আপনাকে খাওয়াবেন না, কারন আপনি খেয়াল করেননি আল্লাহ বলেন 'অতঃপত তোমরা বেরিয়ে পড়ো হালাল রিজিকের সন্ধানে'। আল্লাহ আপনাকে বসে খাওয়াবেন না, আপনাকে একটি গ্রহনযোগ্য পন্থা বেছে নিতে হবে। এই পন্থায় আপনার বরাদ্দ রিজিক আপনি পাবেন।
অর্থাৎ বান্দার কাজ হচ্ছে আল্লাহর থেকে চাওয়া ও পাওয়ার চেষ্টা করা আর আল্লাহর কাজ হচ্ছে বান্দাকে সেই মাধ্যমে তা প্রেরণ করা। কেউ বিয়ে না করে যদি সন্তান কামনা করে তাহলে এটা তার জন্য হাস্যকর হবে, যদিওবা আল্লাহ কোন পিতামাতা ছাড়াই সৃষ্টি করতে সক্ষম আর তার উদাহরন আছে। কিন্তু আল্লাহর জেনারেল পলিসি হচ্ছে তিনি গ্রহনযোগ্য পদ্ধতিতেই দান করেন।
বান্দার দায়িত্ব হচ্ছে তার সকল প্রচেষ্টা করা এরপর আল্লাহর কাছে দোয়া করা, "হে আল্লাহ আমার পক্ষে যতটুকু করা সম্ভব ছিল সবটাই করেছি এখন সবকিছু তোমার হাতে"। বান্দাকে ঘোড়া বাঁঁধতে হবে এরপর আল্লাহর উপর ভরসা করতে হবে। আল্লাহর প্রতিশ্রুতিগুলো সত্য কিন্তু সবকিছুতে জাহেরী অর্থে গ্রহন করলে হবেনা। কেউ যদি কোন চেষ্টা না করেই আল্লাহর সাহায্যের অপেক্ষায় থাকে তাহলে আল্লাহ সাহায্য করেন না।
স্বর্ণযুগে জনৈক আলেমকে বলা হলো 'শায়েখ, আল্লাহই তো তাঁর দ্বীন রক্ষা করবেন, তাহলে আমরা কেন যুদ্ধ করি?'। উত্তরে তিনি বলেন 'তুমি যদি অংশ না নাও তবুও দ্বীনের বিজয় হবে, তোমার অংশগ্রহন(প্রচেষ্টা) কেবলমাত্র তোমার জন্যই'। অর্থাৎ আল্লাহর দ্বীন তো আল্লাহ রক্ষা করতেই পারেন, কিন্তু আমি আপনি দ্বীনের জন্য কী করছি সেটা পরিক্ষা না করে আল্লাহ আমাদের পুরষ্কৃত করবেন না।
আল্লাহ চাইলে ফেরেশতা পাঠিয়ে আল্লাহর সব শত্রুদের দমন করতে পারেন যেমনটা তিনি বদরের যুদ্ধে, ওহুদের যুদ্ধে করেছেন। কিন্তু আল্লাহ আমাদের প্রচেষ্টাকে দেখতে চান বলেই আমাদের নিজেদের তা করতে বলেছেন।
ঠিক তেমনি, আল্লাহর প্রতিটি ওয়াদার একটি গ্রহনযোগ্য মাধ্যম থাকে। এই মাধ্যম ছাড়া আল্লাহ সরাসরি কিছু দেন না।
আমাদের সমাজে আবেগপ্রবণ অনেক ভাই/বোন আছেন যারা বেকার অবস্থায় বিয়ে করতে চান। নিজেরা তো আয় রোজগারের মাধ্যমে সচ্ছলতা আনয়নের কোন চেষ্টা করেনই না, বরং বেকার অবস্থায় বিয়ে করে আরেকজনের বিপদ ডেকে আনতে চান। এটা আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল নিঃসন্দেহে কিন্তু ইসলামের মূলনীতি কোন অন্ধ আবেগ বা জাহেরী মতবাদ(বাহ্যিকতা) উপর নির্ভরশীল নয়। তারা অনেকেই সূরা নূর এর ৩২ নাম্বার আয়াতটি তাদের মতের সপক্ষে পেশ করেন যেখানে আল্লাহ বলেন,
'তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ন, তাদেরও। তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।'
অথচ এরপরের আয়াতটি যেন আমাদের সেই ভাই/বোনদের চোখেই পড়েনা, যেখানে আল্লাহ বলেনঃ
"যারা বিবাহে সামর্থ নয়, তারা যেন সংযম অবলম্বন করে যে পর্যন্ত না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেন।..." সূরা নূর, আয়াত ৩৩।
আল্লাহ অবশ্যই অভাব দূর করবেন, তাঁর ওয়াদা সত্য কিন্তু তার জন্য বান্দাকে অবশ্যই কিছু না কিছু চেষ্টা করতে হবে। কোন চেষ্টা না করে বসে থাকাটা কোন বুদ্ধিমান মূ'মীনের কাজ নয়। রাসুল সাঃ ২৫ বছর বয়সে বিয়ে করেন, তখন তিনি মক্কার অন্যতম সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি বেকার ছিলেন না।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, বেকারত্ব সাময়িক অনিশ্চিত জীবন, এই অনিশ্চিত জীবনের সাথে আরেকজনকে জড়ানোটা জুলুম। অপরদিকে আপনি যদি মাসে দুই হাজার টাকাও আয় করেন তাহলে সেই এক ধরনের 'প্রচেষ্টা'। আল্লাহ তাঁর প্রাচুর্য্যতা থেকে দান করবেন ওয়াদা অনুযায়ী ইনশাআল্লাহ। আপনি যদি এক টাকাও আয় না করেই বিয়ে করতে চান তাহলে সেটি ঢাল ও তলোয়ার ছাড়াই যুদ্ধে গমনের মতই ভয়ানক হবে। আপনি আল্লাহর সাহায্য কামনা করছেন অথচ নিজেই নিজেকে সাহায্য করেন না।
বর্তমান সমাজে বেকারাবস্থায় বিয়ে হচ্ছে পারিবারিক অশান্তি, কলহ ও প্রতিবেশীদের কন্ঠ শোনানো প্রতিযোগীতার প্রথম ধাপ। সামর্থ্য না হলে রোজা রাখুন আর যদি একান্তই বিয়ে করতে চান তাহলে ইনশাআল্লাহ কিভাবে হালাল রোজগার করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
(চলবে ইনশাআল্লাহ...)
বিয়ের আবার বয়স! (পর্ব ১) বিয়ের আবার বয়স! (পর্ব ১) Reviewed by Dr.Mira Hasan on April 22, 2020 Rating: 5
Powered by Blogger.