Bangla Short Story Sondha Tarar Nimontrone By Dr. Rahela Khurshid jahan Monju

SHARE

 Bangla Short Story Sondha Tarar Nimontrone By Dr. Rahela Khurshid jahan Monju




       



অত্যন্ত মেধাবী আর জ্ঞান পিপাশু এই ছেলের একান্ত ইচ্ছা ছিল বিজ্ঞানের কোন বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করবে। কিন্তু বাবার একান্ত ইচ্ছার অবাধ্য সে হতে পারেনি তাই তার আর্মিতে যোগদান করা। তার মা ডাক্তার। বাবা মা দুজনেই বাংলাদেশ আর্মির কর্মকর্তা ছিলেন।Bangla Golpo তারা দুজনেই সেচ্ছায় আর্মি থেকে অবসর গ্রহন করেন। কিন্তু আর্মির বাহিরের জীবন তাদের মোটেই ভাল লাগলো না। জলের মাছ ডাঙ্গায় তুললে যা হয়, ঠিক যেন সেই অবস্থা হল তাদের। রাজির বাবা এই ছেলে সম্পর্কে অনেক উচ্চ ধারনা পোষণ করতেন তাই ছেলের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছুটা জোর করেই বাবা তাকে আর্মিতে যোগদান করতে বলেছিলেন।
কিন্তু গভীর দুঃখের বিষয় ছেলে বি এম এ থেকে বেড় হবার পড়ই বাবা মারা গেলেন। তারপর ভগ্ন হ্রিদয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে রাজি আর্মিতে কাজ করে যান। তিনি ও ডব্লিউ (OW) কোর্সে এক্স রে, আলফা গ্রেডিং পেয়ে এবং বেস্ট ফায়ারার হয়ে কোর্সে টপ করেন এবং আর্মিতে একটা বিরল রেকর্ড সৃষ্টি করে যান। তারপর অতি দক্ষ অফিসার হিসাবে আর্মিতে বিভিন্য পর্যায়ে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে কাজ করে যান। একসময় তিনি ক্যাপ্টেন পদে উন্নিত হন। তারপর তিনি প্রধান মন্ত্রির সিকিউরিটি ফোরসে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তিন বছর কাজ করেন। Bangla Love Story
কিছুদিন পর তিনি মেজর পদে উন্নিত হন। এবার মা তাকে বিয়ের জন্য তাগিদ দিতে থাকেন। তখন তিনি বিয়ের ব্যাপারে সম্পূর্ণ ভার মায়ের উপর ছেড়ে দেন। কিন্তু অনেক খোঁজার পড়ও তার সাথে মিলবে এমন মেয়ে পাওয়া গেলনা। তার উচ্চতা ছয় ফুটেরও বেশি, তার পছন্দ লম্বা মেয়ে। তাই সবদিকে মিললেও মোটামুটি লম্বা মেয়ে আর মিলল না। বছরের পর বছর পাড় হয়ে গেল কিন্তু তার যোগ্য মেয়ে আর মিলে না। তার ছোট ভাই আমেরিকায় কম্পিউটার সায়েন্স পড়তেন। পড়া শেষ করে দেশে এসে বিয়ে করলেন। এখন তাদের ঘরে এক সন্তান। তার ছোট বোনেরও বিয়ে হয়ে গেল। তাই মা একসময় হতাশ হয়ে পড়লেন। এই ছেলের বিয়ে কবে, কোথায় হবে !!
আর্মির চাকরির পাশা পাশি মেজর রাজি দুটো বিষয়ের উপর মাস্টার্স করলেন। তারপর বিভিন্ন কারনে তার আর্মিতে থাকাটা আর ভাল লাগলো না। তাই তখন অনেক চেষ্টা করার পর শেষে ২০১০ সালে মেজর রাজি সেচ্ছায় আর্মি থেকে অবসর গ্রহন করলেন। এখানে একটা ঘটনা ঘটল। রাজি আর্মি মিশন থেকে ফিরার পর তিন বছর পূর্ণ হতে মাত্র একমাস বাঁকি ছিল। আর্মির নুতন আইন মত তিন বছর পূর্ণ হবার পূর্বে কেউ চাকরী ছড়ে দিলে তার পেনশন থেকে টাকা কাটা হবে। কিন্তু এল পি আর হিসাব করলে মেজর রাজির তিন বছর পূর্ণ হয়েও এগার মাস বেশী হয়। কিন্তু ভুল বসত তা হিসাব করা হয়নি বলে তার পেনশানের টাকা থেকে ২৫% টাকা কাটা হল। আর তাই সেদিন রাজি মাকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চা শিশুর মত কেঁদেছিলেন। বলেছিলেন,“ মা আমার যে এটা রক্ত পানি করা টাকা মা”। শুনে মা শান্তনা দিয়ে বলেছিলেন, “বাবা, আল্লাহ্‌ তোমাকে সুদে আসলে এই টাকা একদিন ফেরত দিবেন, তাই দুঃখ করনা”। রাজি মায়ের কথায় বরাবরই শান্তনা খুঁজে পায়। তাই সে এবারও শান্ত হলেন মায়ের এইরূপ আশাপুর্ন দোওয়ার কারনে।
এল পি আর (LPR) এর শুরুতে মা রাজিকে বেশ কিছু টাকা হাতে দিয়ে বললেন, “তোমার দেশ ভ্রমনের সখ, যাও এবার ইউরোপের যে ক’টা দেশ পার ঘুড়ে এস, ভাল লাগবে”। মায়ের এই অচিন্তনীয় স্বদিচ্ছার কথা শুনে তিনি হতবাক হয়ে গেলেন। ইতিপূর্বে তিনি বাবা মার সাথে কখনও বা নিজে ইউরোপের বেশ কিছু দেশ ভ্রমন করেছেন, তারপরও ইউরোপ তার খুব পছন্দ বলে মায়ের দেয়া সেই টাকা পেয়ে যেন স্বর্গ হাতে পেলেন।Bangla Love Story
তারপর দুই মাসের স্যাঞ্জেন ভিসা নিয়ে প্রথমে রাজি জার্মানির ফ্রাঙ্কফোর্টে এক বন্ধুর কাছে গেলেন। এরপর অনেক দেশ ঘোরার পর দেখলেন আরও কিছু দিন তার ভিসা আছে। তাই বাংলাদেশে তার প্রিয় মোস্তফা ভায়ের সাহায্যে একবার দুইবার করে পরপর তিনবার টিকেট ক্যান্সেল করে আরও কয়েকটা দেশ ভ্রমণ করলেন। বার বার টিকেট ক্যান্সেল করাতে তার ঢাকায় ফিরার রুট পরিবর্তন হয়ে এবার জার্মানি—দোবায়—ঢাকা হল। মন না চাইলেও এবার তার দেশে ফিরার পালা। 
golpo book
দুই মাস অবিরাম ভ্রমন করার পর রাজি জার্মানির ফ্রাঙ্কফোর্ট থেকে এসে দোবাই এয়ারপোর্টে ঢাকার প্লেনের জন্য অপেক্ষা করছেন। একজন টুরিস্টের যা চেহারা হয় ঠিক সেই আলুথালু চেহারা নিয়ে তিনি লাউঞ্জে বসে আছেন। মন তার কিঞ্চিৎ ভারী, স্বর্গ থেকে নেমে আবার সেই গতানুগতিক নীরস জীবনে ফিরে আসা! অপর দিকে একই লাউঞ্জে একজন বিদেশী ভদ্রমহিলা অত্যন্ত বিষন্ন মনে বসে আছেন। 



Bangla Golpo | Bangla Love Story


তিনি শুধু ভাবছেন বাংলাদেশ এতদুর! এখনো প্লেনে আরও পাঁচ ছয় ঘন্টার পথ! তার আর কিছুই ভাল লাগছে না। এই দুরত্বের কারনেই তার অফিসের বস গত এক বছর ধরে তাকে বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য দোটানায় ভুগছিলেন। শেষে বিশেষ প্রয়োজন বলে তিন দিনের জন্য তাকে ঢাকার উদ্দেশে পাঠিয়েছেন। তারও কয়েকবার টিকেট ক্যান্সেল করাতে শেষে এই দোবায় দিয়ে তার রুট হয়েছে।
তিনি আনমনা ভাবে আচেনা বাংলাদেশের কথা ভাবতে ভাবতে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছিলেন। একসময় হঠাত মেজর রাজির দিকে চোখ পড়তেই তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল সেখানে। সেই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছিল, সেই মানুষটির সমস্থ দেহ থেকে আলোক বিচ্ছুরিত হচ্ছে। আনমনে কি সব ভাবতে ভাবতে তিনি মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েন। আর কোনও দিকেই তার খেয়াল ছিল না।
এরপর যথা সময়ে ঢাকার কানেক্টিং প্লেনে আরোহনের ঘোষণা হওয়ার পর সব যাত্রীরা লাউঞ্জ ছেড়ে প্লেনের পথে চললেন। মেজর রাজি যেতে যেতে একটু পিছনে তাকিয়ে দেখলেন একজন বিদেশী ভদ্রমহিলা একা আনমনে লাউঞ্জে বসে আছেন। তিনি তার কাছে এসে ইংলিশে প্রশ্ন করে জানতে চাইলেন, তিনি কেন এভাবে বসে আছেন, এবং কোথায় যাবেন।Bangla Golpo
উত্তরে তিনি বললেন, অফিসের কাজে তিনি ঢাকায় যাবেন। এসেছেন সুইজারল্যান্ড থেকে। মেজর রাজি বললেন, “ঢাকার প্লেন তো চলে যাচ্ছে। আমিও এই ফ্লাইটে ঢাকা যাব”। তিনি কোন কথা না বলে হতবম্ভের মত তার পিছু পিছু হাঁটতে লাগলেন। প্লেনে উঠার পর তিনি বিজিনেস ক্লাসে বসলেন। আর মেজর রাজি অনেক পেছনে গিয়ে বসলেন। তাঁদের মধ্যে আর কোনও কথা হলনা। প্লেনে বসে মেয়েটি শুধুই ভাবছেন তিনি বিজিনেস ক্লাসে যাচ্ছেন আর ছেলেটি যাচ্ছে ইকনোমিতে। কিঞ্চিত ব্যাথিত হৃদয় নিয়ে তিনি সেই কথাই বারবার ভাবছেন। একজন অচেনা মানুষ অথচ তার জন্য কেন যেন তার এই অনুভুতি প্রগার হয়ে উঠেছিল। কোথায় দিয়ে কখন যে ঢাকা বিমানবন্দরে প্লেন অবতরন করেছিল তার সেদিকে কোন খেয়ালই ছিলনা।
ঢাকায় নেমে মেজর রাজি দেখলেন মেয়েটি ইমিগ্রেশন করছেন। আর কেমন যেন এখনো অন্যমনস্ক। তিনি ঢাকায় যদি কোনও বিপদে পড়েন এই ভেবে রাজি তাকে একটা ভিজিটিং কার্ড দিলেন। আর বললেন কোনও সমস্যা হলে তাকে ফোন দিতে। আর সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি কিছু বুঝে উঠার আগেই তার লাগেজ থেকে তার সুইজারল্যান্ডের ঠিকানা সহ ট্যাগটা ছিঁড়ে মেজর রাজির হাতে দিলেন।
পরদিন রাতে মেয়েটি রাজিকে ডিনারে দাওয়াত করলেন। সেখানে তাঁদের মধ্যে নিজেদের এবং পারিবারিক বিষয়ে আলাপ পরিচয় হল। মেয়েটির নাম এঞ্জেলা। তিনি সুইস ফেডারাল গভর্নমেন্টের পররাস্ট্র উপদেষ্টা। এখানে সুইস দুতাবাসে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে একটা বড় অঙ্কের অনুদান সক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক বৈঠকের জন্য তিনি এসেছেন। মিস এঞ্জেলা ঢাকায় থাকা কালিন আরও একবার তাঁদের মধ্যে দেখা সাক্ষাত হয়। তিন দিন পর তিনি সুইজারল্যান্ডে ফিরে যান।
একদিন হঠাত এঞ্জেলা সুইজারল্যান্ড থেকে মেজর রাজিকে ফোন করলেন, কিছুক্ষন কথা বলার পর একেবারে সরাসরি তিনি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। হঠাত এমন প্রস্তাবে রাজি হতবম্ভ হয়ে গেলেন। তিনি কি উত্তর দিবেন বুঝে উঠতে পারলেন না। ‘পরে জানাব’ বলে টেলিফোন রেখে দিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে মাকে জানালেন তার এই প্রস্তাবের কথা। মেয়েটি সম্পর্কে এবং তার পরিবার সম্পর্কে রাজি যতটুকু জানতে পেরেছিলেন তা মাকে জানালেন। মেয়েটি দেখতে বেশ। ছীপ ছীপে গড়ন, ৫ ফুট ১০ ইঞ্ছি লম্বা, সোনালী চুল। সে সুইস ফেডারাল গভর্নমেন্টের পররাস্ট্র উপদেস্টা। এবং ইউনেস্কোর নির্বাচিত ডাইরেক্টার। শুনে মা বললেন নিশ্চয় তার বয়স অনেক বেশি হবে। রাজি বললেন এটা ঠিক নয় মা। সে ইকোনমিক্সে পি এইচ ডি তে রেকর্ড পরিমান স্কোর করেছিল। তাই তাকে এই অল্প বয়সে এই পজিশানে নেয়া হয়েছে। তার পরিবার সম্পর্কে মাকে একটা ধারনা দেয়ার জন্য রাজি আরও বললেন, এঞ্জেলার বাবা ইকোনমিক্সে পি এইচ ডি । তিনি সেখানকার একজন বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী এবং চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট। তার নানা দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় একজন বিখ্যাত প্রকৌশলী এবং বিজ্ঞানী ছিলেন। তার আবিষ্কৃত যন্ত্রপাতি এখনো তাদের ইন্ডাস্ট্রিতে তৈরি হয় এবং পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশ গুলিতে ব্যাবহার হচ্ছে। পৃথিবীর বেশ কটি উল্লেখযোগ্য দেশে তাদের ব্যাবসার সদর দপ্তর আছে। তার মামাও প্রকৌশলী এবং বিজ্ঞানী । তার পরিবারের সবাই শিক্ষিত।
এবার ল্যাপটপ থেকে রাজি মাকে মেয়েটির ছবি দেখালেন। ছবিটা দেখে তার মায়ের কেন যেন মনে হল, এই মেয়েই তার ছেলের জন্য সুযোগ্যা মেয়ে। কিন্তু মা সব কিছু বিবেচনা করে বললেন, দেখ বাবা মেয়েটি শুধু তোমাকে দেখে পছন্দ করেছে। কিন্তু বিয়ে হয় দুটো পরিবারের মধ্যে। তোমার কাছে যা শুনলাম, তাতে আমাদের সাথে তাদের একটা বিড়াট ব্যাবধান, তাই এই বিয়ে তার বাবা মা কি কখনও মেনে নিবেন? তুমি বরং মেয়েটিকে আমাদের পরিবার সম্পর্কে একটা ধারনা দাও।
মায়ের কথা মত রাজি মিস এঞ্জেলা কে ফোন করে তাদের সম্পর্কে সবকিছু জানালেন। তার ফোন পেয়ে এঞ্জেলা অত্যন্ত খুশী হয়ে বললেন, তার পরিবার সম্পর্কে আর কিছুই তার জানার নেই এবং তিনি আরও বললেন, তাকে সুইজারল্যান্ডে তাঁদের ফ্যামিলির সাথে থাকার জন্য তার তিন মাসের স্যাঞ্জেন ভিসার ব্যাবস্থা করতে চান। তাঁদের দেশ, কালচার আর সব কিছু তার ভাল লাগলে তবেই তাঁদের বিয়ে হবে। এবং মেজর রাজিকে আরও বললেন, তিনি নিজে ধর্ম পরিবর্তন করবেন তারপর বিয়ে করবেন। তার এই প্রস্তাব শুনে রাজি সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।
পরদিন এঞ্জেলা সুইস এম্ব্যাসিতে মেইল করলে মেজর রাজি কয়েক দিনের মধ্যে ভিসা নিয়ে তাদের পরিকল্পনা মত সুইজারল্যান্ডে গেলেন। জেনেভা এয়ারপোর্টে এঞ্জেলা তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে এই নিমন্ত্রন রক্ষা করার জন্য রাজিকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানালেন। এঞ্জেলা নিজে গাড়ী চালিয়ে তাকে লুজান শহরে তার বাড়ীতে নিয়ে এলেন। দুপরে তার বাবার বাড়ীতে তাদের নিমন্ত্রণ। রাজির উপলক্ষ্যে আত্নীয় সজনরা কয়েকজন সেখানে নিমন্ত্রনে এসেছেন। প্রথম দর্শনে এঞ্জেলার বাবা রাজিকে ভীষণ পছন্দ করলেন। মুহূর্তে তিনি তাকে আপন করে নিলেন। এঞ্জেলার মা, বাবা, ভাই, মামা আরও সব আত্মীয় স্বজনরাও তাকে ভীষণ পছন্দ করলেন। মেজর রাজি তাদের আন্তরিক ব্যাবহারে মুগ্ধ হলেন।
এরপর প্রতিদিন এখানে সেখানে বেড়ানোর পর মনলোভা সেই জেনেভা লেকের পারে বিচরন আর ঘন্টার পর ঘন্টা অলস অবসর কাটানোর লোভ রাজিকে পেয়ে বসল। ভাবছেন এই স্বর্গ ছেড়ে দেশে ফিরার দিন ক্রমেই ঘনে আসছে। কিন্তু এঞ্জেলার সাথে তার বিয়ের বাপারটা নিয়ে তিনি অনেক দন্দের মধ্যে আছেন কারন বিয়েটা অনেক বড় ব্যাপার। সেখানে দুই পরিবারের মধ্যে খাপ খাওয়ানোর বিষয় আছে। তার মা কি শেষ পর্যন্ত রাজি হবেন! এই সব ভাবতে ভাবতে পরিবারের একজন সদস্যের মত অত্যন্ত সাচ্ছন্দের সাথে সুইজারল্যান্ডে তিন মাস কাটানোর পর রাজি একরাশ সুন্দর স্মৃতি নিয়ে দেশে ফিরে আসলেন।
চলবে……।।


ডাঃ রাহেলা খুরশীদ জাহান মঞ্জু
#সন্ধ্যা তারার নিমন্ত্রনে
পর্ব- ২
রাজির হাসিমুখ দেখে মা বুঝতে পারলেন সেখানকার সব কিছু নিশ্চয় তার ভাল লেগেছে। তারপরও তিনি জানতে চাইলেন তাদের জীবন ব্যাবস্থা, কালচার, আরও অন্যান্য ব্যাপারে ছেলের অভিজ্ঞতার কথা। রাজি এক কথায় বললেন, “মা অসাধারন তাঁদের সবার ব্যাবহার আর আতিথেয়তা”।
রাজি সুইজারল্যান্ড থেকে দেশে ফিরার পর এঞ্জেলার বাবা মা তাঁদের মেয়েকে বললেন, “শুধু ছেলের ইচ্ছা থাকলেই আমরা তোমাকে এভাবে বিয়ে দিতে পারিনা। এখানে দুইটা পৃথক সংস্কৃতি এবং পৃথক দেশের ছেলে মেয়ের বিয়ে, তাই রাজির মায়ের এ বিয়েতে সন্মতি আছে কি না সেটা আমাদের জানা অত্যন্ত গুরত্বপুর্ন। আর তার জন্য তোমাকে বাংলাদেশে গিয়ে তার মায়ের সঙ্গে নিজে দেখা করে তার মতামত জানতে হবে। এটা অনেক কঠিন ব্যাপার হলেও বাবা মার এই মুল্যবান চিন্তার কথা ভেবে, এঞ্জেলা দশ দিনের ছুটি নিয়ে বাংলাদেশে আসতে চাইলেন এবং ফোনে এ ব্যাপারে রাজির মতামত জানতে চাইলেন। রাজি ফোনটা এবার তার মা রাহেলাকে দিলেন। এই প্রথম এঞ্জেলার সাথে রাহেলার আলাপ। সুভেচ্ছা বিনিময়ের পর সব কথা শুনে রাহেলা তাকে ঢাকায় আসার আমন্ত্রন জানালেন। রাহেলা একটু অবাক হলেন পাশ্চাত্যের অধিবাসী হয়েও তার অভিবভাবকের এইরুপ আচার আচরন আর তাদের পারিবারিক রিতি নীতির পরিচয় পেয়ে। এ যেন বাংলাদেশের কোনো সম্ভ্রান্ত পরিবারের নিয়ম নীতি।
এঞ্জেলা যথা সময়ে ঢাকা বিমান বন্দরে পৌঁছে গেলেন। মেজর রাজি বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে সরাসরি তাদের বাড়ীতে নিয়ে আসলেন। এঞ্জেলা যখন রাজির পেছনে পেছনে বাড়ীতে প্রবেশ করল, তাকে দেখে মনে হল যেন এক নির্মল পবিত্র অবুঝ শিশু কন্যা এক অচিন পুড়িতে প্রবেশ করছে। আপাদমস্তক সাদা ধব ধবে ড্রেস। জুয়েলারি বা কস্মেটিক্সের কোথাও কোন বাহুল্য নেই। তার কিঞ্চিৎ উদবিঘ্ন মুখচ্ছবি, আর দু’চোখ দিয়ে অবিরাম অশ্রুধারা রাহেলাকে একটু বিভ্রান্ত করল। এটা কি আনন্দাশ্রু! না কি দুশ্চিন্তা! এঞ্জেলা প্রথমেই রাহেলাকে অবাক করে একেবারে তার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। হয়তো বা বাংলাদেশের এই কালচার কারও কাছে জেনে নিয়েছিল সে। রাহেলা তাকে বুকের মধ্যে নিয়ে আলিঙ্গন করলেন। এঞ্জেলা ফ্রেন্স ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু এখানে সবার সাথে সুন্দর ইংলিশে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর তিনি তার দেশের ভাষা সম্পর্কে একটা ধারনা দিলেনBangla Golpo
সুইজারল্যান্ডের ভাষা প্রধানত তিনটা। যারা জার্মান পার্টে বাস করেন তারা জার্মান ভাষা বলেন, যারা ফ্রেঞ্চ পার্টে বাস করেন তারা ফ্রেঞ্চ এবং যারা ইটালিয়ান পার্টে বাস করেন তারা ইটালিয়ান ভাষা বলেন। আর যারা উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করেন তারা ইংল্যান্ডে গিয়ে কিছুদিন ইংলিশ শিখেন। এঞ্জেলা ফ্রেঞ্চ পার্টের তাই তারা সবায় ফ্রেঞ্চ ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু তার পরিবারের সবাই খুব ভাল ইংলিশ বলতে পারেন।Bangla Golpo
প্রাথমিক কিছু আলাপের পর রাহেলা এঞ্জেলাকে সরাসরি বিয়ের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। রাহেলার ইচ্ছা সেদিনই তাদের বিয়ে দিয়ে তাকে বৌমা হিসাবে গ্রহন করবেন। এঞ্জেলা অত্যন্ত খুশি হয়ে রাহেলার প্রস্তাবে রাজি হয়ে বললেন, তিনি মুসলিম হতে চান এবং আজই এ বিয়েতে তার কোনও আপত্তি নেই। তাই সেদিনই রাজির কিছু ঘনিস্ট আত্মীয় এবং ক’জন ঘনিস্ট বন্ধুকে দাওয়াত করা হল। রাজির পরিবারে ছিলেন একজন সুযোগ্য ব্যাক্তি। তিনি তার নানাজান, একজন ধার্মপরায়ণ ব্যাক্তি যিনি নয় বার হজ্জব্রত পালন করেছেন, তিনিই পরম আনন্দের সাথে এঞ্জেলাকে ইসলাম ধর্ম গ্রহনে সহায়তা করলেন এবং তাদের বিয়ে পড়ালেন। অত্যন্ত সুন্দরভাবে নির্বিঘ্নে বিবাহ পর্ব সম্পন্ন হল।
সেদিন রাতে রাহেলার বাড়ীতে ডিনার শেষে বেলকনিতে বসে ক’জন এঞ্জেলার সাথে গল্পে মেতে উঠলেন। রাজির নানা সহ ছোট বোন ওয়ারদা, ছোট ভাই রাফি, তার স্ত্রী অংকন তার তিন বছরের মেয়ে বিনি এবং এঞ্জেলা সবাই সবার সেদিনের অনুভুতি নিয়ে হালকা রসিকতায় আসর জমিয়ে ফেললেন। রাজির নানাজান সেদিনের সময়োপযোগী শেকস্পিয়ারের ড্রামার এক একটা ডাইলগ মুখস্ত বলতে শুরু করলেন। এঞ্জেলা অবাক বিস্ময়ে তাই মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলেন। সব কিছু নিয়ে সেই মুহূর্তে মনে হল, এ যেন এক রাত্রির সু-স্বপ্ন! কোথা থেকে এক উরন্ত পাখী তার ঘরে এলেন, আর বিধাতার কোন ইঙ্গিতে আজ তার সাথে রাজির বিবাহের মধ্য দিয়ে দোবায় এয়ারপোর্টে তাদের সেই ক্ষণিকের পরিচয় চিরদিনের হয়ে রইল। এ যেন বিধাতার দক্ষ নিপুন হাতের এক সাজানো নাটক।
সেই রাতে চাঁদের আলো ছিল না। রাহেলাদের এই দক্ষিনের বারান্দার সামনে খোলা যায়গাটা থাকায় সেখান থেকে পুরা আকাশটা দেখা যায়। সেদিন রাতের আকাশের আলো আঁধারিতে এঞ্জেলা ঠিক যেন সন্ধ্যাতারার মতই জল জল করে জ্বলছিল। মনে হল সে যেন এক বাঁধন হারা রুপকথার রাজকন্যা, সুদুর সুইজারল্যান্ড থেকে এসে আজ তার প্রানের দোসরকে খুঁজে পেয়েছে। আর এই সেই সন্ধ্যা তারা, যার নেমন্ত্রনে রাজির সুইজারল্যান্ডে যাওয়া আর তাদের এই আজকের মধুর মিলন স্বর্গ খেলা।
শুরু হল রাজির জীবনের এক নূতন অধ্যায়। তার জীবনে ধুমকেতুর মত এঞ্জেলার আগমন। এর শুভ অশুভ সব বিধাতার অদৃশ্য হাতে। ভূ-স্বর্গের মেয়ে, তাই এই নিয়ে রাহেলা বেশ একটু চিন্তিত ছিলেন। তবে আশার আলো এই যে,এঞ্জেলা খুবই নম্র, ভদ্র, নিরহংকার। গুরুজনের প্রতি তার শ্রদ্ধ্যা অপরিসীম। তাই সবার সাথে ক’দিন তার গল্পে সল্পে বেশ আনন্দে কেটে গেল। একসময় তার দশ দিনের ছুটি শেষ হয়ে এলো। এয়ারপোর্টে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ক্ষুন্নমনে তিনি এবার দেশে ফিরে গেলেন।
এ দিকে রেহান তার সুইজারল্যান্ডের রেসিডেন্ট ভিসার জন্য অপেক্ষা করছেন। নানা রকমের ভেরিফিকেশানের জন্য, এতে বেশ কয়েক মাস লেগে গেল। এঞ্জেলা প্রতিদিন ফোনে ভিসার প্রগতির খবর নিতে নিতে একসময় ক্লান্ত হয়ে গেলেন। শেষের দিকে এঞ্জেলা একুশ দিন ছুটি নিয়ে ঢাকায় এসে নিজে এটার জন্য চেস্টা করতে থাকেন। এরই মধ্যে রাজির সুইজারল্যান্ডের রেসিডেন্ট ভিসা হয়ে গেল। এই খবর পেয়ে এঞ্জেলার বাবা মা রাজির পরিবারকে নিমন্ত্রন করলেন সুইজারল্যান্ডে যাবার জন্য। সেখানে তাদের বিয়ে রেজিস্ট্রি হবে এবং তারা এ বিয়ে সেলিব্রেট করবেন। এই নিমন্ত্রন পাওয়ার পর এঞ্জেলা তার শাশুড়ি রাহেলা এবং রাজির ছোট বোন ওয়ারদাকে সুইচ এম্ব্যাসিতে নিয়ে ভিসার জন্য পরিচয় করে দিলেন এবং তিনি একটা দাওয়াত পত্র এম্ব্যাসিতে দিলেন। রেহানের ছোট ভাই ছুটি না পাওয়ায় তখন যেতে পারলেন না। তাই তাদের শুধু দু’জনের সুইজারল্যান্ডে যাবার সব ব্যাবস্থা করে দিয়ে এঞ্জেলা রাজি কে সঙ্গে নিয়ে সুইজারল্যান্ড চলে গেলেন।
বৌমার বাবার আমন্ত্রন পেয়ে রাজির মা রাহেলা এবং ছোট বোন ওয়ারদা ক’দিন পরেই সুইজারল্যান্ডে রওনা দিলেন। রাজি এবং এঞ্জেলা জেনেভা এয়ারপোর্টে তাদেরকে রিসিভ করতে আসলেন। তাদের সঙ্গে লাগেজ থাকবে বলে এঞ্জেলার বাবা তার বড় গাড়িটা পাঠিয়েছেন। তাদের বাড়ি লুজানের পথে এঞ্জেলা গাড়ি চালাচ্ছেন। তখন সেখানে গ্রীষ্মকাল। চারিদিকে গাছে গাছে নুতন পাতা। মাটিতে, গাছে গাছে, প্রতিটা বাড়ীর বেলকনিতে অপূর্ব সব ফুলের সোমারোহ। মনে হল দেশটি নানা রঙের ফুলের বিছানা দিয়ে ঢাকা। কোথাও মাটি চোখে পরে না। সমস্থ রাস্তা পানি দিয়ে নিখুঁত ভাবে ধোয়া। কোথাও একটা পাতা পর্যন্ত পরে নেই। কি পবিত্র, কি অপূর্ব সেই নিসর্গ নিমিষেই তাদের মন কেরে নিল। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের আঁকাবাঁকা সমতল পথ পারি দিয়ে তারা লুজানে পৌঁছে গেলেন। সেই শহরেই এঞ্জেলার বাসা এবং তার বাবা মা, নানা নানির এবং মামার বাড়ি। বাসায় পৌঁছার পর এঞ্জেলার বাবার বাড়িতে দুপরের খাবার দাওয়াতের জন্য সবায় ঝটপট রেডি হয়ে নিলেন। সময় মত এঞ্জেলার বাবার বাড়িতে তারা পৌঁছে গেলেন। তারা সবায় ঘড়ির কাঁটার সাথে চলেন। 
Bangla Short Story এটা রাহেলার ভীষণ পছন্দ হল কারন তার এটা সারা জীবনের অভ্যাস।
এঞ্জেলার বাবার বাড়ীতে পৌঁছার পর তার বাবা তাদেরকে সম্বর্ধনা জানানোর জন্য গাড়ীর নিকটে আসলেন। অত্যন্ত প্রাণবন্ত, ভদ্র, মার্জিত, ভীষণ লম্বা একজন মানুষ, রাজির মার সাথে প্রথম কথাই বললেন, “Oh, you are a mother of a great son”. রাহেলা অবাক হয়ে গেলেন তার বিনয় দেখে। এরপর আরও অবাক হলেন তাঁদের আতিথিয়তা দেখে। তাঁদের সব কিছু আমাদের দেশের পুরানো দিনের বনেদি পরিবারের মত।
পরদিন থেকে পুরো দু’দিন চলল বিয়ের অনুষ্ঠান। বিভিন্য দেশ থেকে এঞ্জেলার বাবার বন্ধু বান্ধব আর তাঁদের আত্মীয় সজনরা এসেছেন। প্রথম দিন সকালে তাদের বিবাহ রেজিস্ট্রি অনুষ্ঠান, সেখানে বিবাহের নানা প্রকার শর্ত সহ দুইজন সাক্ষীর সাক্ষরে রেজিট্রেশান সম্পূর্ণ হল। সেখানে রাজির বোন ওয়ারদা রবিঠাকুরের একটা কবিতা ইংরেজিতে নিজে অনুবাদ করে সেটা আবৃতি করলেন। সবায় তারা মুগ্ধ হয়ে সেই আবৃতি শুনলেন।
সেইদিন বেলা তিনটা থেকে ছিল সাত ঘণ্টা জেনেভা লেকে নৌ বিহার। সুইজারল্যান্ডের উপর দিয়ে এই অপূর্ব লেকটি প্রবাহিত। ইউরোপের বিখ্যাত আল্পস পর্বত মালার পাদদেশের কূল বেয়ে কিছুদুর প্রবাহিত হবার পর আপন গতিতে এঁকে বেঁকে চলেছে লেকটি। যেখানেই যাওয়া হকনা কেন সেখানেই দেখা হবে এই অপূর্ব লেকটির সাথে। যেন এক পরমাত্মীয়।
সুইজারল্যান্ড আর ফ্রান্সের মধ্যে ছিল এই নৌ বিহার। একটা দ্বিতল সুইস জাহাজ যেটা ছিল ১৯০৬ সালের কমিশান্ড ভিন্টেজ জাহাজ, সেটা চার্টার্ড করলেন এঞ্জেলার বাবা ডেভিড। প্রায় দুইশত অতিথি বেলা তিনটার মধ্যে জাহাজের ঘাটে উপস্থিত হলেন। অতিথিদের মধ্যে ছিলেন বিভিন্য দেশের রাস্ট্রদুত, পররাস্ট্র উপদেস্টা, ইউনাইটেড নেশানের গন্যমান্য কর্মকর্তাগন। ডেভিড সবার সাথে রাজি, ওয়ারদা এবং তাদের মা রাহেলার পরিচয় করিয়ে দিলেন। নৌ বিহার শুরুর পূর্বে একটা ঘটনা ঘটল। এঞ্জেলার বাসায় যে মহিলা গৃহ পরিচারিকার কাজ করেন তিনি তার মেয়ে, জামায়, নাত্নিদের নিয়ে এই নৌ বিহারে নিমন্ত্রিত ছিলেন। যে কোন কারনে তাদের আসতে দেরি হচ্ছিল। অপেক্ষা করতে করতে অতিথিদের মধ্যে অনেকেই একটু অসোন্তোস প্রকাশ করছিলেন। কিন্তু এঞ্জেলার বাবা শান্ত মনে তাদের অপেক্ষায় বসে রইলেন। তিনি বললেন ‘তাদেরকে বাদ দিয়ে এই প্রোগ্রাম হতে পারে না’। রাহেলা অবাক হলেন তার এই মহানুভবতা দেখে। একজন গৃহ পরিচারিকার জন্য গন্যমান্য সব অতিথিদের নিয়ে তিনি আধা ঘন্টা লেকের পারে অপেক্ষা করলেন। বেলা সারে তিনটার দিকে তারা উপস্থিত হলে ডেভিড হাসিমুখে তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে জাহাজে উঠলেন।
এবার পূর্ণ আনন্দ নিয়ে শুরু হল নৌবিহার। রাহেলা আর ওয়ারদা মহিত হয়ে দেখতে লাগলেন চারিদিকের সাজানো ভুবন। লেকের দুই কুলের অপূর্ব দৃশ্য আর পাহাড়ের গা ঘেঁসে অসঙ্খ রঙ্গিন বাড়ী গুলিকে দূর থেকে পটে আঁকা ছবি বলে ভুল হওয়া খুব স্বাভাবিক। বিখ্যাত ঐতিহাসিক শীলন কাসেল এর গা ঘেঁসে তাদের জাহাজ চলছে। এঞ্জেলার বাবা এই কাসেল সম্পর্কে রাহেলাকে একটা ধারনা দিলেন। জাহাজ চলছে তার নিজস্ব গতি নিয়ে। রাহেলা এবং তার মেয়ে বিমুগ্ধ হলেন সেখানকার প্রকৃতির সৌন্দর্যের এই লিলাভুমি দেখে। একই সঙ্গে পাহাড়, উপত্যকা আর লেকের দৃশ্য যেন বিধাতার সৃষ্ট অপূর্ব ক্যানভাস। দেখতে দেখতে ফ্রান্সের ভিতর বহুদুর পর্যন্ত গিয়ে জাহাজটি আবার ঘুরে লুজানের দিকে চলতে থাকে। তখন রাহেলার মনে হল আরও দূরে গিয়ে কেন জাহাজটি ফিরে এলোনা। আরও ভাল হত যদি অনন্তকাল এই যাত্রা অব্যাহত থাকত। ইতিমধ্যে বোটের মধ্যে কয়েকবার নানান রকমের অতি উন্যত মানের খাবার পরিবেষণ হয়ে গেছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলল সেদিনের এই নৌ বিহার আর ক্ষণে ক্ষণে বিভিন্য স্বাদের খাবার পরিবেষণ। কিছুক্ষন পর সূর্য তার দিনের কর্ম শেষে অস্তাচলের পথে ধাবিত হল। সূর্যাস্তের সে কি অপূর্ব দৃশ্য! মনে হল সূর্য তার রক্তিম রূপ লহরি নিয়ে দুই পাহাড়ের মধ্যস্থানে লেকের ধীর শান্ত পানির গভীরে গোপন অভিসারে চললেন। তারপর তারাভরা আকাশের আলো আঁধারের রূপ যেন আরও অনন্য হয়ে ভেসে উঠল। আর তারই সাথে শেষ হল সেদিনের অনন্য নৌ বিহার।
চলবে......।।

ডাঃ রাহেলা খুরশীদ জাহান মঞ্জু
#সন্ধ্যা তারার নিমন্ত্রনে
পর্ব- ৩
পরদিন এঞ্জেলার বাবা সারা রাতের জন্য একটা রেস্টুরেন্ট বুক করেছিলেন তরুনদের জন্য। মিউজিক,নাচ গান ইত্যাদির আনন্দ রজনী। সারারাত সেখানে তরুনরা আনন্দ করেছিল। সেখানে ওয়ারদাও ছিল। রাজি, ওয়ারদা, এঞ্জেলা, তার ভাই ভাবীরা সহ তাদের বন্ধু বান্ধবরা এই মিশ্র কালচারের সংস্কৃতি অনুষ্ঠান অত্যন্ত উপভোগ করেছিলেন সেদিন।
সেইরাতে রাহেলা বাসায় একা একা বসে ‘রাজি- এঞ্জেলার’ বিবাহ উপলক্ষ্যে একটি গান রচনা করলেন। সুন্দর সুরও দিলেন তিনি।
“শোন কোন এক রূপকথারই গল্প কাহিনী।
এ যে কল্প লোকের সাজানো এক কল্প কাহিনী,
কেউ তা বোঝেনি।
আকাশ পথে ঊড়ে এলো, রূপকথার এক রাজকুমারি
সঙ্গি যে তার কেউ ছিলনা, মনটি যে তাই বেজায় ভাড়ী।
মাঝপথে সে হেরিল এক অচিন রাজকুমার
কেউ তা বোঝেনি।
দেখা হল শুধু হয়নি পরিচয়, ক্ষণিকের দরশনে এ কোন বিস্ময়।
প্রথম দেখায় রাজকুমারির মনটি কেড়ে নিল,
মনটি কেড়ে নিল সেই অচিন রাজকুমার।
আবার তারা আকাশ পথে, ঊড়ে এলো একই সাথে,
রাজকুমারি নামল শেষে রাজকুমারের অচিন দেশে,
এবার সাড়া দিল রাজার কুমার সেই রাজকুমারীর নেমন্ত্রনে,
কেউ তা বোঝেনি, Bangla Short Story
এক দিন যে মিলন হল মহা সোমারোহে,
কেউ তা ভোলেনি ।।
সেইদিন অতি ভোরে রাহেলা দেখলেন সমস্ত রাস্তা গুলো একটি গাড়ীর সাহায্যে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা হচ্ছে। রাহেলা এবার বুঝতে পড়লেন কেন পুরাটা দেশ এমন চকচকে ঝকঝকে। সকালে নাস্তার পর সেই গানটি রাহেলা তার মেয়ে ওয়ারদাকে নিয়ে সুর মিলায়ে গাইলেন। ওয়ারদা অপূর্ব গায়। এঞ্জেলাকে এই গানটি রাজি ইংলিশে অনুবাদ করে দিলেন। তিনি অভিভুত হলেন এই গানটি শুনে। এঞ্জেলা ভাষা না বুঝলেও ভীষণ পছন্দ করেন রবিন্দ্র সঙ্গীত আর গজল। সিডি থেকে তিনি এই গান গুলো শোনেন। তিনি সুন্দর পিয়ানো বাজাতে পারেন। তাদের বাড়ীতে তার নানার পিয়ানোটা এখনো অক্ষত অবস্থায় আছে।
সেদিন বিকেলে সবাই হাঁটতে হাঁটতে লেকের পারে বেড়াতে গেলেন। এঞ্জেলার বাসার খুব কাছেই লেকটি। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে চারিদিকে তাকিয়ে রাহেলার মনে হল, এই পুরো দেশটাই ফুলে ফুলে ঢাকা। সুইজারল্যান্ডের এই অপূর্ব নিসর্গ মনকে ছুয়ে ছুঁয়ে অন্তরের সুগভীর প্রকোষ্ঠে চির বসন্ত হয়ে বারবার তাকে যেন হাতছানি দিয়ে বলে “আবার আসিব ফিরে, জেনেভা লেকের তীরে”
পরদিন বেড়াতে বের হয়ে একটা মজার অভিজ্ঞতা হল ট্রেনে পাহাড়ের চুড়ায় ঊঠতে গিয়ে। ট্রেন এক ধরনের বিশেষ খাঁজ ওয়ালা চেনের উপর দিয়ে ধীরে ধীরে পাহাড়ের চুরায় ওঠে। চলার সময় খট খট আওয়াজ হয়। মনে হয় এই বুঝি ট্রেনটা এখনি উলটায়ে পড়ে যাবে। তারপর চুরায় উঠে দেখা গেল গ্রিস্মকালেও সেই সব চুড়ায় বরফ জমে থাকে।
রাজি যখন সাত বছরের ছিল তখন তার বাবা মা ওদের দুই ভাই কে নিয়ে ইউরোপে বেড়াতে এসেছিলেন। সেবারে ইংল্যান্ডে এসে টিউবের মধ্যে তার বাবার পাসপোর্ট চুরি হল। ফ্রান্সে এসে মেট্রোতে তার মানি ব্যাগ চুরি হল। তখন মনের দুঃখে আর তারা সুইজারল্যান্ডে আসেননি। তাদের বড় সাধ ছিল এই দেশটি দেখার। বিধাতা এতদিন পড় কিভাবে মানুষের আশা পূর্ণ করলেন! দুঃখ কেবল এই যে, যার একান্ত সাধ ছিল এই দেশটি দেখার, তিনি আজ আর তাদের মাঝে নেই। ভাবতে গিয়ে রাহেলার মনটা গভীর বেদনায় বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। সেটা কেউ বোঝার আগে নিজেকে সামলে নেন তিনি। পাছে আর কারও আনন্দ উপভোগে ব্যাঘাত ঘটে!
আজ একজনের একটা অত্যন্ত মুল্যবান ভবিষ্যৎ বানীর কথা মনে পড়ল রাহেলার। সবায় বলে ভবিষ্যৎ বানী বলে কছু নাই। রাহেলাও এটা বিশ্বাস করেন না। কিন্তু আজ তার মনে হয় সত্যি সত্যিই পৃথিবীতে এমন বিদ্যার অধিকারী মানুষ আছে। তাই একদিনের একটি ঘটনা না বলেই পারছিনা।
মেজর রাজি তখন আর্মিতে কর্মরত। তিনি ছুটিতে বাড়ী এলে একদিন তাকে নিয়ে তার মা রাহেলা তার জন্য একটি মেয়ে দেখতে যাচ্ছিলেন। যাবার পথে তাদের পূর্ব পরিচিত এক ভদ্রলোক কামাল ভাইয়ের বাসায় গেলেন। তিনি ভবিষ্যতের ভালমন্দ কিছু বলতে পারেন। তাই এই মেয়েটা রেহানের জন্য ভাল হবে কি না সেটা বলার জন্য রাহেলা তাকে অনুরোধ করলেন। তিনি কতক্ষন পর বললেন, “আপনারা যাচ্ছেন যান, কিন্তু এখানে রাজির বিয়ে হবেনা”। শুনে রাহেলার মন আত্যন্ত খারাপ হয়ে গেল। তাই তিনি এর কারন জানতে চাইলেন। তখন তিনি বললেন, মেয়েটি ডাক্তার এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। সবই ঠিক আছে কিন্তু মেয়েটির উচ্চতা কোন রকমে মাত্র পাঁচফুট দুই ইঞ্চি হবে। আপনাদের তাকে পছন্দ হবেনা। রাহেলা হতাশ হয়ে বললেন, “লম্বা মেয়ে আমরা মোটেই পাচ্ছিনা, তাহলে কি আমার ছেলের বিয়েই হবেনা কামাল ভাই”? এই কথা শুনে তিনি কিছুক্ষন চোখ বন্ধ করে রইলেন। তারপর চোখ খুলে তিনি বললেন, “রাজির বিয়ে হবে পাঁচফুট নয় ইঞ্চি লম্বা মেয়ের সাথে। আর রাহেলা আপা আপনি অনেক দিন বিদেশে থাকবেন”। তখন রাহেলা বললেন, “ভাই আপনি কেন এমন থাট্টা করছেন আমার সাথে। বাংলাদেশে এত লম্বা মেয়ে কোথায়! আর আপনি তো জানেন আমি একসময় অনেকদিন বিদেশে চাকরী করেছিলাম, তাই সেটাই বোধকরি এখন বলছেন। আজ আমার স্বামী নাই। আমি আবার কি ভাবে বিদেশে থাকতে পারি”! তিনি তখন বললেন, “এটাতো আপনার অতীতের কথা, বিদেশে চাকরী করতেন। কিন্তু আমি জানিনা, কিভাবে আবার বিদেশে দীর্ঘদিন থাকবেন, তবে আমি যা বলছি এটাই সত্যি। আর রাজির বউ হবে অনেক অনেক লম্বা”।
তার এতসব কথা শোনার পর রাহেলা আর সেদিন মেয়ে দেখতে যান নি। কিন্তু আর অন্য কোন মানানসই মেয়ে না পেয়ে সেই মেয়ের সঙ্গেই শেষে বিয়ে পাকাপাকি করে ফেলেন রাহেলা। কিন্তু এনগেজমেন্টের কয়েক ঘন্টা পূর্বে একজন ঈর্ষা করে এই বিয়েটা ভেঙ্গে দিলেন। সেদিন রাহেলা বিছানায় গড়াগড়ি করে কেঁদেছিলেন। তিনি পরিস্কার বুজতে পেরেছিলেন যে মেয়ের বাড়িতে লোক পাঠায়ে কে এই বিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। পরে মেয়ে পক্ষ এই চক্রান্ত বুঝতে পেরে ছয় মাস চেস্টা করেছিলেন রাজির সঙ্গে তাদের মেয়ের বিয়ে দিতে কিন্তু রাহেলা সেই মানুষ নয়। তিনি আর এই বিয়েতে সন্মতি দেন নি। শুধু ছেলের জন্য প্রান ভরে দোওয়া করেছিলেন। তাই সেদিনের কামাল সাহেবের সেই কথাগুলো আজ অক্ষরে অক্ষরে কিভাবে মিলে গেল, সেটাই গভীর ভাবে ভাববার বিষয়। প্রথমত এঞ্জেলা সত্যিই অনেক লম্বা। তার কথার চাইতেও লম্বা। পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি তার উচ্চতা। সুইস মেয়েরা সাধারনত লম্বা হয় না কিন্তু এঞ্জেলা অবাক করা লম্বা। দ্বিতীয়ত রাহেলা সত্যি সত্যিই আবার বিদেশে আসলেন। এবং ভবিষ্যতেও দীর্ঘদিনের জন্য ছেলের কাছে আসার একটা পাকা রাস্তা তৈরি হল। সেদিনের কামাল ভাইয়ের কথা কিভাবে অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল তার কোন ব্যাখ্যা নাই। রাজি এঞ্জেলার বিয়ের পর রাহেলা সেই কামাল ভাইকে আর খুঁজে পান নি। তার মোবাইল নাম্বার এবং ভাড়া বাসা সবই বদল হয়ে গেছে। আজও রাহেলা তাকে খোঁজেন তাকে এই সু-সংবাদটা দেয়ার জন্য।
দুইদিন বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে শুরু হল এঞ্জেলার আত্মীয় সজনদের বাড়ীতে দাওয়াতের পর্ব। তারপর রাজি, ওয়ারদা এবং রাহেলার জন্য এঞ্জেলা ট্রেনের টিকেট কেটে দিলেন, ইউরোপ ঘুরে দেখার জন্য। বিভিন্য দেশে হোটেল বুকিং এর কাজগুলু রাজি রাতের মধ্যে তারাতারি শেষ করলেন। পর দিন থেকে শুরু হল তাদের ট্রেন জার্নি। প্রথমে জার্মানি তারপর অবিরাম একটার পড় একটা দেশ ভ্রমণ করতে থাকেন তারা। সারা রাত তারা ট্রেনে ঘুমাতেন আর দিনের বেলা এক একটা দেশের বিভিন্য উল্লেখযোগ্য স্থানগুলি পরিদর্শন করতেন। প্রতিটা দেশ এক এক রকমের সৌন্দর্যে ভরপুর। ইউরোপে ট্রেনে ভ্রমণ একটা বিরাট সুবিধা, সব দেশের উপর দিয়ে চারিদিকের মনোরোম দৃশ্য দেখতে দেখতে যাওয়া যায়।
জার্মানিতে প্রবেশ করার পূর্বেই দেখা হল সেই বিখ্যাত ঐতিহাসিক রাইন নদী। নদীটির উৎপত্তিস্থল সুইজারল্যান্ডে। অতীতের বড় বড় যুদ্ধের কারন এই সেই রাইন নদী। রাহেলা চলন্ত ট্রেন থেকে অনেকক্ষন তাকিয়ে রইলেন বহমান এই নীরব নদীটির দিকে। নদীটির যদি এতোটুকুও বোধশক্তি থাকত যে তার কারনে অতীতে কত প্রান, কত দেশ ধ্বংস হয়ে আজও তার রেশ যে একেবারে মুছে যায়নি, তবে নদিটি এতদিনে শুকায়ে পাথরে পরিনত হত!
জার্মানিতে এসে রাজির এক বন্ধুর হোটেলে উঠলেন তারা। ছেলেটির নাম হাসান। বিশিষ্ট ভদ্র আর অসাধারন এক ছেলে। তার বাড়ি ঢাকায়। থাকা খাওয়া কোন কিছুর জন্য তাকে খরচ দেয়া যায়না। পরদিন তার হোটেল থেকে অতি ভোর বেলায় প্রথমে কলোন গির্জা দেখতে গেলেন তারা। জার্মানির কলোন গির্জা পৃথিবীর বিখ্যাত এক ঐতিহাসিক গির্জা যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধয়ের সময় প্রায় পঁয়ষট্টিটা বোম ফেলার পরও তার কোন ক্ষতি করতে পারেনি। বাহিরে অতি সামান্য কিছু কিছু অংশ নস্ট হয়েছিল তা পুনরায় গঠিত হয় যা দেখলেই বোঝা যায়। এই গির্জার নীচে এবং আসে পাশে পুরানো শহর সম্পূর্ণ রূপে যে ভুমিকম্পে ধংস হয়ে মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে তার নিদর্শন সরুপ কিছু স্থান সহ ধ্বংসাবশেষ সেখানে সুরক্ষিত আছে।
চলবে.........।।

ডাঃ রাহেলা খুরশীদ জাহান মঞ্জু
#সন্ধ্যা তারার নিমন্ত্রনে
পর্ব- ৪
এরপর তারা রাজধানী বার্লিনে গেলেন। সেখানে একটা টুরিস্ট বাসে উঠে তারা সেখানকার অনেক ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান দেখার পর জার্মানির সেই ‘চেক পয়েন্ট চার্লি’ আর ঐতিহাসিক প্রাচীর ‘বার্লিন ওয়াল’ দেখার জন্য গেলেন । হঠাত রাতারাতি একদিন এই প্রাচীর তৈরি হয়েছিল জার্মানিতে যা জার্মানিকে পূর্ব জার্মানি আর পশ্চিম জার্মানিতে বিভক্ত করেছিল। ১৯৬১ সালের ১৩ই আগস্টে নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল। জার্মানির দুই অংশকে বিভক্ত করেছিল ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত। আর এটা ভাঙ্গা হয় ১৯৯১ সালে। এখন তার কিছু অংশ সুরক্ষিত করে রাখা হয়েছে সেই ভয়াবহ ইতিহাস মনে রাখার জন্য। এই প্রাচীর যেদিন শুরু হয় যে যেখানে ছিলেন সেখানেই থেকে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। 
Sondha Tarar Nimontrone এক দিকে স্বামী অন্য দিকে স্ত্রী, এক দিকে সন্তান অন্য দিকে মা বাবা। কারও সাধ্য ছিলনা পালিয়ে আসার বা যাবার। অসংখ মানুষের প্রান দিতে হয়েছিল নদীতে সাঁতরিয়ে পালানোর সময়, বা অন্য ভাবে পালানোর সময়। সেই দেয়ালের পুরানো ইতিহাসের কথা মনে হয়ে গভীর ব্যাথায় দুচোখ জলে ভেসে গেল রাহেলার। এইসব দেখার পর তারা ফ্রাঙ্কফোর্টে ফিরে আসলেন তখন এঞ্জেলার ফোন আসলো। পরদিন তার খালার বাড়িতে নিমন্ত্রণ। তার খালাতো ভাই সিঙ্গাপুরে চাকরি করেন। তিনি সেখানে চলে যাবেন বলে এই দাওয়াত। এটা এড়ানো গেলনা। তাদের কালচার, যে দেশেই থাকুন না তারা, দাওয়াতে আসতে হবে। তাই সেখান থেকে তাদেরকে সুইজারল্যান্ডে আবার ফিরে আসতে হয়েছিল শুধু একটা দাওয়াত রক্ষা করার জন্য। তার খালু ছিলেন ইংল্যান্ডের লর্ড পরিবারের ছেলে। তিনি প্রিন্স চার্লসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। একইসাথে তারা বিভিন্য বিনোদনে অংশ গ্রহন করতেন আর প্রায় শিকারে যেতেন।
অপূর্ব সুন্দর যায়গায় তাঁদের খালার বাড়ীটা। আল্পস পর্বতের গায়ে ভারবিয়ারে। এই ভারবিয়ারে বিশ্বের সর্ব বৃহৎ স্কি পয়েন্ট আছে। প্রায় সতের কিলোমিটার ঢালু এই স্কি গ্রাউন্ড। এখান থেকে খুব কাছেই গ্লেসিয়ার অর্থাৎ বরফের নদী। সেটা উনিশ হাজার ফুট উচুতে অবস্থিত। এঞ্জেলা তাদেরকে নিয়ে গেলেন সেখানে। সুন্দর গাড়ী চালান তিনি। পাহাড়ি এলাকা অত্যন্ত আঁকা বাঁকা পথ। একটু অন্য মনস্ক হলেই পতন অনিবার্য।
সমতল ভুমি থেকে দশ হাজার ফুট উপরে গাড়ী পার্ক করে তারপর বিশাল কেবল কারে (একশ জনের ক্যাপাসিটি) চরে উপরে উঠতে হয়। পর পর দুটো কেবল কারে উঠতে হয়। এরপর সেই বরফের নদী। তারা পৌঁছে গেলেন সেখানে। বিশাল বড় সুন্দর ক্যান্টিন আছে সেখানে। তারা কফি আইচক্রিম ইত্যাদি খেয়ে বাহিরে আসলেন। কি অপূর্ব সেই দৃশ্য! এক এক দিকে এক এক রকমের প্রাকৃতিক দৃশ্য। সারা বছর এখানে বরফ থাকে। মনে হবে বরফ নদীর মত আস্তে আস্তে ঢেউয়ে ঢেউয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তাই এটাকে বলা হয় গ্লেসিয়ার বা বরফের নদী। ওখানে স্লেজ গাড়ীতে চরে তারা ঘুড়লেন।
এতো উঁচু পাহাড়ের ভিতরে আবার বিশাল লেকও আছে। সে এক অভিনব দৃশ্য! এক এক দিকের এক এক রকম ল্যান্ড স্কেপ। দেখে অবিভুত হতে হয়। মনে প্রশ্ন জাগে, বিধাতার কোন খেয়ালে কি উদ্দেশ্যে এই অপূর্ব সৃষ্টি! এখান থেকে খুব কাছেই এঞ্জেলার বাবার এই আল্পস পর্বতে একটি বাড়ী আছে, তাদের বিনোদনের জন্য, আবার শীত কালে স্কি করার জন্য এসে এখানে সবায় তারা একসাথে থাকেন। অপূর্ব সুন্দর এই বাড়ী গুলোকে শ্যালে বলা হয়। এখান থেকে দেখা যায় সূর্যাস্তের ঠিক আগ মুহূর্তে পাহাড়ের চুড়া, সূর্যের রক্তিম আভায় কেমন লালে লাল হয়ে যায়। এটা বেশিক্ষন থাকেনা, খুব বেশি হলে পাঁচ মিনিট। প্রকৃতির কি অপরূপ রঙ বদলের খেলা! কাল পাহাড়ের মাথায় যেন টকটকে লাল মুকুট।
এঞ্জেলা এবং তার আত্নীয় সজনের থেকে বিদায় নিয়ে পরদিন রাজি তার মা এবং আবার দেশ ভ্রমনে বেড় হলেন। তখন ইউরোপের প্রায় আট নয়টা দেশ দেখা সম্ভব হয়েছিল কারন মেজর রাজি অনেক বার ঐ দেশগুলি ভ্রমণ করেছিলেন। প্রতিটা পথ ঘাট তার সঠিক ভাবে চেনা ছিল।
এবার তারা ফ্রান্সের মধ্যে প্রথমেই স্ট্রান্সবার্গে আসলেন। এটা পুরানো ফ্রান্স বা ‘পতি ফ্রান্স’। সেখানকার দুর্গ গুলি সম্পূর্ণ ভিন্য ডিজাইনে গড়া। আর সব পুরানো ধাঁচের সুন্দর বাড়ীগুলো অতি যত্নে আজও সংরক্ষিত। নানা প্রকার নুতন ফুলের সোমারহে অলংকৃত এই পুরানো ফ্রান্স সত্যিই মনে হল একটি অসাধারন স্থান।
‘ইভোআর’ ফ্রাঞ্চের একটা পুরানো ছোট্ট শহর। একহাজার বছর পূর্বে শহরটি তৈরি হয়। বাড়ি গুলি পাথরের ব্লক দ্বারা এব্র থেব্র করে তৈরি। এটা ইউনেসকো ইনহেরিটেজ করা। যেখানে পূর্বে যা ছিল ঠিক সেভাবে সংরক্ষিত করা হয়েছে। লেকের গা ঘেঁসে একটা দুর্গ আছে সেখানে। লোকজন সেই পুরানো বাড়ি গুলোতে এখনও বাস করে। এখানে এসে মনে হল বংলা দেশের কোন পুরানো শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছি। বিশাল বড় বড় পুরানো গাছের বাগানটা দেখলে গা ছম ছম করে ওঠে। সেখানে হস্ত শিল্পের অসঙ্খ দোকান টুরিস্টদের জন্য সাজিয়ে রেখেছে। নানা রকম ফুলের সোমারোহ নিয়ে নিরিবিলি এই ছোট্ট শহরটিতে যেন পৃথিবীর সব শান্তি লুকিয়ে আছে। সেখানে গেলে আর ফিরতে ইচ্ছা করেনা। মনে হয় যেন মায়ের কোলে বসে আছি।
তারপর সেখান থেকে ফ্রান্সের প্যারিসে গিয়ে তারা একটি হোটেলে উঠলেন। পারিসের বিভিন্ন স্থানগুলি রাহেলার পূর্ব পরিচিত তথাপি মনে হল যেন সবকিছু নুতন করে তিনি দেখছেন। সেই আইফেল টাওয়ার, নটরডাম, মাইকেল মধুসুদন দত্তের এবং ড শহিডুল্লাহর সেই ইউনিভার্সিটি, যেখানে তারা পড়তেন। বাংলাদেশের এই দুই বিখ্যাত ব্যাক্তির অধ্যায়নের পুরানো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখে রাহেলার মন নুতন করে আনন্দে ভরে ঊঠল।
তারপর পৃথিবী বিখ্যাত সেই লুভ মিউজিয়াম যা সাত দিনেও দেখে শেষ করা যায় না। সেখানে অপূর্ব সুন্দর এক কাঁচের মত সচ্ছ পদার্থ দিয়ে নির্মিত পিরামিডের মধ্য দিয়ে তারা প্রবেশ করলেন । ভিতরে ঢুকে সেখানে যেটা দেখলে অবাক লাগে, তা হল কোন প্রযুক্তিতে তারা বিশ্বের অসংখ দেশ থেকে বহু চিত্র এবং বিশাল বড় বড় পিলার, অসংখ কীর্তি, ইত্যাদি দেয়াল সহ অক্ষত অবস্থ্যায় এখানে এনে সুন্দর বসায়ে রেখেছে। এখানে এসে রাহেলার মনে পড়ে গেল ব্রিটিশ মিউজিয়াম আর টাওয়ার অফ লন্ডনের কথা, যেখানে দুই ঘর ভর্তি শুধু বড় বড় সোনার বিবিধ প্রকার জিনিস পত্র। সেখানে একটা বৃহৎ সোনার ডেকচি ছিল যার গলার চতুরদিকে বড় বড় সোনার আঙ্গুরের পাতা আর আঙ্গুরের থোকা দিয়ে ডিজাইন করা ছিল। সেটাতে রাজাদের জন্য মদ বা সুরা ঠান্ডা করা হত। এগুলি সবই পৃথিবীর বিভিন্য দেশ থেকে সংগ্রহ করা। আবার সুরক্ষিত চেম্বারে পাহাড়া রত কাঁচের ভিতরে সেই বিখ্যাত কহিনুর হীরার মুকুট সহ নানা আকারের ছোট বড় গোলাপি, সচ্ছ অসংখ হীরার কথা। তার চাইতেও অনেক বিস্ময়কর মনে হল এই লুভ মিউজিয়াম, যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। আর সব চাইতে অবাক সেই বিখ্যাত লিওনারদো দ্যা ভেন্সির পেইন্ট করা ‘মোনালিসার’ আসল ছবিটা। যেটাকে বুলেট প্রুফ কাঁচ দিয়ে অতি যত্নে দেয়ালে সংরক্ষন করা হয়েছে। কি আছে এই ছবির মধ্যে, আর তার হাসির মধ্যে! এতবড় মিউজিয়ামে কোথাও কোন ভীড় নেই, অথচ ছোট্ট এই ছবিটির ঘরে কোন ঠাঁই নেই। মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে আছে ছবিটির দিকে তাকিয়ে। ঘরের দরজা থেকে শুরু করে ছবি পর্যন্ত একটা সুঁচ ঢোকার জায়গা নেই। রাহেলা তার ছেলে মেয়ে সহ প্রায় এক ঘন্টা দাঁড়ায়ে থাকার পরও ঘরে ঢুকতে না পেরে রাহেলা একটা কবিতা লিখলেন সেখানে। কাগজ কলম তার সাথেই থাকে। তিনি আর্টের কিছুই বোঝেননা তবুও তার নিজের অনুভুতি এই কবিতার মাঝে উজার করে দিলেন।
মোনালিসার হাসি

দুঃখ, ব্যাথা, ক্লেশ,
গভীর যন্ত্রণা আর সমাহিত বিরহের ফাঁকে
যে ক্ষণিকের মৃদু হাসি,
সেই তো মোনালিসার হাসি।
কিছু কিছু মানুষের জীবন এমনি বেদনার আবাসভূমি ।
ছোট বড় সাদা কাল ক্লেশ পাখীরা
উড়ে এসে বাসা বাঁধে মনের আবেসে ধারাবাহিক ভাবে।
অমর অক্ষয় হয়ে রয় সুদৃঢ় কণ্টক নীড়,
সারাটি জীবন ধরি ।
তবুও কখনও ফুটে ওঠে স্মিত হাসির রেখা
সেই আঁধার জীবনের ফাঁকে
ঠিক বিজলীর রেখার মত,
যেথায় থাকেনা কোন গর্জন বর্ষণ ।
এ যেন সেই নীরব হাসি, একান্ত বিজনে,
“মোনালিসার হাসি”।
সেদিন সারাদিন ঘুরে যতটুকু সম্ভব মিউজিয়ামের কিছু অংশ দেখে তারা আইফেল টাওয়ারে গেলেন। রাতের আইফেল টাওয়ার স্বপ্নের মত সুন্দর। কিন্তু আইফেলের নির্বাক মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে তার জীবনের শেষ মুহূর্তের কথা ভেবে শধুই প্রশ্ন জাগে মনে, কেন সব ভালোর আড়ালে এমন কস্ট লুকিয়ে কাঁদে!!
তারপর দিন তারা বেলজিয়াম হয়ে নেদারল্যান্ডের আমস্টারডামে গেলেন। সেখানে ঐতিহাসিক কিছু স্থাপনা দেখলেন। বিশাল দেয়াল ঘেড়া রাজবাড়ীর পাশে বিস্তীর্ণ খোলা জায়গাটায় প্রচুর খেয়ালী মানুষ তাদের নানা প্রকার বাদ্য যন্ত্র নিয়ে আপন মনে গান গেয়ে চলেছে। কেউ শোনে বা না শোনে সেদিকে কারোরই যেন মাথা ব্যাথা নাই। মনে হল জগতের সব শান্তি যেন বিধাতা তাদের উজার করে দিয়েছে। সেখান থেকে রাহেলার মন চাইছিলনা এক পাও সড়তে। কিন্তু উপায় নাই একটু পরেই ট্রেনের সময় হয়ে যাবে। তাই তারা নদীর ধারে গেলেন। অসঙ্খ নদীর দেশ নেদারল্যান্ড। এখানে সেখানে ব্রিজ আর ঘন ঘন নদীর সে এক অপূর্ব নয়নাভিরাম ছবির মত দৃশ্য। বিধাতা যেন একটা বিশাল ক্যানভাসে অতি সজত্নে ছবি এঁকে তার বুকে নাব্য নদী গুলুকে ছেড়ে দিয়েছেন। সারাদিন এখানে ঘোরা ফিরার পর বিকেলে তাদের ট্রেনের সময় হয়ে গেল।
চলবে.........।।

ডাঃ রাহেলা খুরশীদ জাহান মঞ্জু
#সন্ধ্যা তারার নিমন্ত্রনে
পর্ব- ৫
ট্রেনে চলতে চলতে তারা প্রবেশ করল অস্ট্রিয়ার মধ্যে। ইউরোপে ট্রেনযোগে একদেশ থেকে আর এক দেশে প্রবেশ করার জন্য কোন ঝামেলা পোহাতে হয় না, কারন ট্রেনের মধ্যেই ইমিগ্রেশান হয়। সেখানেই সব চেকিং হয়। তারা অস্ট্রিয়ার সেই বিখ্যাত সত্য ঘটনা নিয়ে ইংলিশ ছবি “The Sound Of Mugic” যেখানে শুটিং হয়েছিল সেই সব স্থান দেখতে দেখতে এক সময় তারা ভিয়েনায় পৌঁছে গেলেন। সেখানে তারা একটা হোটেলে ঊঠে পরদিন বিভিন্য স্থান পরিদর্শন শেষে ভিয়েনার অপূর্ব সুন্দর রাজবাড়ীতে এসে বিমোহিত হয়ে গেলেন। রাজবাড়ীর সামনে বিখ্যাত মিউজিশিয়ান মোজার্ট এর এক বিশাল মূর্তির সামনে এসে রাজির বোন ওয়ারদা স্তব্ধ হয়ে দেখতে লাগলেন তার প্রিয় সেই মিউজিশিয়ানকে। ওয়ারদা মিউজিকের সঙ্গে পুরানো দিনের ইংলিশ জ্যাজ গান গায় বলে সে মিউজিক কিছুটা বোঝে। তাই সে কখনও এই অসাধারন মিউজিশিয়ানের সামনে এসে দাঁড়াবে এটা তার কল্পনায়ও ছিল না। তারপর তারা অসাধারন সুন্দর রাজবাড়ীটি ঘুরে ঘুরে দেখলেন। রাজবাড়ীর বাইরে সে যুগের নিসংস নির্যাতনের প্রতীক পাথরের মূর্তি গুলোর দিকে তাকানো যায়না। কস্টে বুক ফেটে যায়। এইসব সুন্দর প্রাসাদের আড়ালে কত ট্রাডেজি যে লুকিয়ে আছে তার কোন ইয়াত্তা নাই! এখান থেকে তারা বিখ্যাত মিউজিসিয়ান বেটোভেনের বাড়ি দেখতে গেলেন। তিনি একজন বিখ্যাত মিউজিক কম্পোজার ছিলেন তিনি পরবর্তিকালে কানে শুনতেন না। ভাবতে অবাক লাগে, জীবনের শেষ দশ বছর তিনি সব চাইতে বেশী কাজ করেছিলেন যখন তিনি একেবারেই কানে শুনতেন না।
এখানে সারাদিন কাটানোর পর আবার তারা ইটালির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। তারপর ইতালিতে প্রবেশ করে ইতালির সেই বিসুভিয়াস আগ্নিয়গীরি বিধ্বস্ত পোম্পের ধংস লীলা দেখার জন্য রাহেলা জেগেই ছিলেন। একসময় রাজি তার মাকে সেই কাল আঁধারের মত ধংস লীলা দেখালেন। কষ্টে তার মন ব্যাথিত হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে ইতালির রোম, ভেনিস, পিজা, ফ্লোরেন্স (যেখান থেকে রেনেসারসুচনা হয়), এবং আরও অনেক যায়গা সহ ইতালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত তারা ভ্রমন করলেন। প্রথমেই তারা সিসিলি পথে যাত্রা শুরু করলেন।সিসিলি যেতে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। ট্রেন ফেরীতে পাড় হয়। ট্রেনকে দুই ভাগ করা হয়, এরপর একটা একটা করে পাড় করা হয়। বেশ সময় লাগে এতে।
সিসিলিতে অনেক পুরান কীর্তি, ভুমধ্য সাগরের তীরে সমতল ভুমি থেকে বহু উছুতে অবস্থিত বিশাল এলাকা নিয়ে সেই পুরানো রাজবাড়ীর শিংহ ভাগই ধ্বংস লিলায় পরিনত হয়েছে। প্রায় ১০,০০০ দশ হাজার বছর আগের গ্রীক সভ্যতার ঐতিহ্যের নিদর্শন দেখলে অবাক হতে হয়। রাজ বাড়ির ভিতরে বিশাল এলাকা নিয়ে সু-উচ্চ গোলাকার গ্যালারী সহ অডিটোরিয়াম এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেখানে এখনও নাটক থিয়েটার সহ আরও বিভিন্য অনুস্টানাদি প্রদর্শিত হয়। এই গ্যালারী বেয়ে তার স্থাপনার চুরায় উঠলে খুব নিকটেই সেখানে জীবন্ত আগ্নেয়গিরি দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল তাদের। ক্রমাগত আগ্নিয়গিরির লাভা পড়াতে ভুমধ্য সাগরের পানি বহুদুর পর্যন্ত কয়লার মত কাল রং ধারন করেছ।
সিসিলি থেকে ফিরে তারা ইতালির ফ্লোরেন্সে এসে সেই বিখ্যাত আরটিস্ট মাইকেল এঞ্জেলের আর্ট গ্যালারি দেখলেন। অসাধারন তার সমস্ত শিল্প কলা। শত শত বছর আগের (১৪৭৫- ১৫৬৪সাল) তার অসংখ শিল্পকর্ম এমনভাবে সংরক্ষিত আছে যে মনে হবে মাত্র ক’দিন আগের তৈরি। দেখে চোখ ফিরানো যায় না। সেখানকার গির্জা অপূর্ব সুন্দর কারুকাজ করা। পুরা ছাদটাতে আর্ট করা আর সব যেন জীবন্ত হয়ে নিজেরা নিজেদের প্রকাশ করছে।
এবার তারা গেলেন রোমে। বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের সেই কলোসিয়ামের ভিতরে গিয়ে মনে হল আশ্চর্য স্থাপনাই বটে। তারপর সেখানকার অতীতের লোমহর্ষক কাহিনীর কথা মনে পড়ে মনটা অজান্তেই বিষন্ন হয়ে গেল। সেই বাঘের সাথে মানুষের, সিংহর সাথে মানুষের যুদ্ধ। কি করুন সেই ইতিহাস ! সেখান থেকে জুলিয়াস সিজারের বাড়ীতে গেলেন। রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠতে হয়। তার বাড়ির এই রাস্তাটা তৎকালীন প্রথম রাস্তা। সেখানে গিয়ে বিশ্বসুন্দরী রানি ক্লিউপেট্রার কথা মনে পড়ল। তার জীবনের শেষ পরিণতির কথা ভাবতে গিয়ে হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ঊঠল। ইতিহাস বুঝি এমনি নিষ্ঠুর!
তারপর সেখান থেকে তারা ইতালির পিজার সেই হেলানো টাওয়ার দেখতে গেলেন। যেটা পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের মধ্যে একটি। সেই টাওয়ার দেখে সত্যিই শিকার করতে হয় এটা আশ্চর্যই বটে। কারন গত পাঁচশত বছর ধরে কিভাবে এতো উচু একটি টাওয়ার এভাবে হেলেও গর্বের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। টুরিস্টরা সবায় দূরের একটি দেয়ালে দাঁড়িয়ে হাত লম্বাকরে বাড়ায়ে ছবি তুলছে। রাহেলা এর কারন জিজ্ঞেস করল রাজিকে। সে কোন উত্তর না দিয়ে মাকে বলল, তুমি দেয়ালে উঠে দাঁড়াও, আমি ছবি তুলে দিচ্ছি। মাকে কোন ভাবে দুই ভাই বোন ধরে দেয়ালে উঠায়ে দিলেন। তারপর সবার মত হাত বাড়ানো কয়েকটা ছবি তুলে মাকে দেখালেন। মা মেয়ে দুজনেই হেসে কুটি কুটি। ছবিতে মনে হচ্ছে তার মা তার সর্ব শক্তি দিয়ে টাওয়ারটাকে ঠেলে ধরে রেখেছেন যাতে করে এর পতনটা রক্ষা হয়। মা অবাক হল মানুষের ছবি তোলার এই অভিনব কৌশল দেখে।
তারপর তারা গেলেন ইতালির ভেনিস শহরে। শেখস্পিয়ারের বিখ্যাত নাটক ‘ মার্চেন্ট অব ভেনিস” এর শহর। অভুত পূর্ব এই শহর বিধাতা এবং মানুষের দ্বৈত নির্মাণ শৈলীর এক অনবদ্য সৃষ্টি। সমস্থ শহরটাই পানির উপরে নির্মিত। মনে হল দোকান পাট আর অপূর্ব সুন্দর বাড়ি গুলো পানির মধ্যে ভাসছে। এক বাড়ি থেকে আর এক বাড়ীতে যেতে হলে ছোট ছোট স্পিডবোট ব্যাবহার হয়। হাঁটতে হাঁটতে একটা কংক্রিট রাস্তার মধ্যে এক বাঙ্গালীর দোকানের সামনে তারা দাঁড়িয়ে গেলেন। দোকানি ছেলেটির নাম গফুর। তার বাড়ী বাংলাদেশের ঢাকায়। মনটা তাদের আনন্দে ভরে ঊঠল এতদুর এসে এক বাংলাদেশীর সাথে দেখা হয়ে। ছেলেটি বললেন, “এই যে রাস্তার উপরে আমরা দাঁড়িয়ে আছি এর নীচেও শুধুই পানি”। ছেলেটি এতো খুশী হল তাদেরকে পেয়ে, সে জোড় করে তাদেরকে একটা রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাওয়াল আবার তার দোকান থেকে বাচ্চাদের অনেক খেলনা সহ কিছু ডেকোরেশান পিচ তাদেরকে উপহার দিল। তাই বলতেই হয় স্বজন প্রীতি আর দেশ প্রীতি সর্বকালের সর্বজনের সম্পদ।
সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদ্বারল্যানড, ফ্রাঞ্চ, অস্ট্রিয়া, ইতালির বিভিন্য যায়গা ঘুড়তে ঘুড়তে একসময় দিন ফুরিয়ে এলো। তারা সুইজারল্যান্ডে ফিরে এলেন। মা এক মাসের বেশি ছুটি পেলেন না বলে সেখানে আর থাকা সম্ভব হল না। তাই মন না চাইলেও ছেলেকে সেই দেশে রেখে ভারাক্রান্ত মনে মা আর মেয়ে ওয়ারদা বাংলাদেশে ফিরে এলেন। এর কিছুদিন পর রাহেলা চাকরি ছেড়ে দিলেন কারন প্রতিবছর একবার কখনও দুইবার তিনি সুইজারল্যান্ডে যান।
সেবারে সময় অভাবে স্পেনে যেতে পারেন নি তারা। এর আগে স্বামীর সাথে এসেও স্পেনে যেতে পারেননি রাহেলা। তার সারা জীবনের সখ ছিল গ্রানাডার আলহামরা প্রাসাদ দেখার। এটা যখন তার বউমা জানতে পারলেন তখন এক গ্রীষ্মের ছুটিতে শাশুড়ী, স্বামী আর, বাচ্চাদেরকে নিয়ে পনের দিনের জন্য স্পেনে গিয়েছিলেন তিনি। মালাগা এয়ারপোর্টে নেমে এঞ্জেলা রেন্ট এ কার নিয়েছিলেন। তিনি নিজে গাড়ী চালিয়ে পনের দিন ধরে গ্রানাডা, করদোভা সেভিল, মারভেলা, মালাগার বিভিন্ন স্থান তারা পরিভ্রমন করেন।
আন্দালুসিয়ার পুরানো স্থাপত্য গুলো দেখার জন্য রাহেলার আর তর সইছিলনা। তাই প্রথমেই তারা গ্রানাডায় গেলেন। গ্রানাডায় আলহামরা প্রাসাদ অবস্থিত। পুরা এলাকাটা ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ দ্বারা সংরক্ষিত। সেখানে গাড়ী ঢোকানোর পারমিশন নেই বলে গাড়ি বহু দূরে পার্ক করে আসতে প্রায় দুই ঘন্টা সময় নস্ট হল। তাদের এই বিলম্ব আর সহ্য হচ্ছিলনা। সেই আট নয় শত বছর আগের মুসলিম কীর্তি এই আলহামরা প্রাসাদ। প্রাসাদটির রং লাল বলে এটির আরবি নাম ‘আলহামরা’। এটির অর্থ ‘লাল’। এর সীমাহীন রূপ সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। কলম থেমে যাবে। বিশাল এলাকা নিয়ে অপূর্ব সুন্দর এই প্রাসাদ। আট ঘন্টা ঘুরেও প্রাসাদটি দেখে শেষ করা যায়নি। প্রাসাদটি সমতল ভুমি থেকে অনেক উপরে অবস্থিত। সেখান থেকে পুরা গ্রানাডা শহর দেখা যায়। প্রাসাদের যেখানে পূর্বে যা ছিল এখনো তা অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। প্রাসাদের গায়ে আরবি লিখাগুলো এখনো অক্ষত আছে। একটার পর একটা অপূর্ব কারুকাজ করা প্রকোস্ট গুলো বিভিন্য ডিজাইনে তৈরি। প্রাসাদের প্রতিটি স্থাপনা যেন একটা চাপা হাসি দিয়ে অতি কস্টে সেই পুরানো ঐতিহ্যের ইতিহাস দর্শকবৃন্দের কানে কানে পৌঁছে দিয়ে বলছে, “ তোমাদের পদধূলিতেই আমাদের আত্মার প্রশান্তি”। প্রাসাদের প্রাঙ্গনে অপূর্ব সুন্দর বিশাল বাগানের সবুজ লতাগুল্ম দ্বারা বেষ্টিত দেয়ালগুলি আর সারি সারি পিলার গুলি দেখলে মনে হয় বুঝি কোন মেকি দেয়াল বা পিলার। রানী ইছাবেলার সদিচ্ছায় এই প্রাসাদটি যত্ন সহকারে রক্ষা করা হয়েছিল। মেজর রাজি এই প্রাসাদের ভিতরেই একটা বাড়ি ভারা নিয়ে তারা চার দিন এখানে ছিলেন, আর রাত দিন এই প্রাসাদের সৌন্দর্য উপভোগ করেছিলেন। প্রথম দিন এসেই তারা বিকেলের আকাশে রংধনু দেখতে পেলেন। মনে হল, রংধনুটি মেঘলা আকাশ থেকে প্রাসাদের চুড়ায় নেমে সাতটি রং এর আলপনা এঁকে কল্প সুতার জাল বুনছে। সে এক অভিনব দৃশ্য! Sondha Tarar Nimontrone
এখানে রানী ইছাবেলার টম্ব অপূর্ব সুন্দর, শুধু সোনা দিয়ে অপূর্ব কারুকাজ করা। এখানে ছবি তোলা নিষেধ। তাই তারা সুন্দর স্থাপনাটা ধরে রাখতে পারেনি। গ্রানাডার জিপসি নাচ (ফ্লামিংগো) পৃথিবী বিখ্যাত। আমেমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন এই ফ্লামিঙ্গো নাচ দেখতে এখানে এসেছিলেন। রাজিরা সবায় মিলে সেখানে জিপ্সি নাচ দেখলেন। সম্পূর্ণ ভিন্য ধরনের এই নাচে পা দিয়ে ডায়াসে এক ধরনের ইলেক্ট্রিক তবলা বাজানো হয়। ছেলে এবং মেয়ে আলাদা আলাদা নাচেন। তবলার আওয়াজ এতো উঁচু যে কান ফেটে যাওয়ার অবস্থা।
জিপ্সিরা প্রায় তিনশত বছর পূর্বে এসে এখানে বসতি স্থাপন করেছে। তারা তাদের পুরা এলাকাটা ঘুরে দেখলেন। জিপ্সিরা সর্বদা নানা প্রকার জুয়েলারি দিয়ে সাজ গোজ করে থাকে। তারা সুযোগ পেলেই টুরিস্টদের কাছে মোটা অংকের অর্থ বা গহনা দাবি করে। সেটা সেখাকার বাড়িওয়ালা আগে থেকেই সাবধান করে দিয়ে ছিলেন রাহেলাদেরকে।
চলবে......।।


ডাঃ রাহেলা খুরশীদ জাহান মঞ্জু
#সন্ধ্যা তারার নিমন্ত্রনে
পর্ব- ৬
স্পেনের গ্রানাডায় চারদিন থাকার পর দুর্গম পথ বেয়ে এঞ্জেলা স্বপ্নের জিব্রাল্টার প্রনালীতে নিয়ে গেলেন। ছোট বেলায় ভুগোলে পড়া এই প্রণালী আটলান্টিক মহাসাগর আর ভুমধ্য সাগরের যূক্তস্থল। এই প্রনালীর ওপারে মরক্কো দেশ, এপারে স্পেন। এপার থেকে ওপার পরিস্কার দেখা যায়। জিব্রাল্টার প্রনালী দেখার সৌভাগ্য তাদের জন্য ছিল বিধাতার একটা পরম উপহার। এঞ্জেলা বলেছিলেন, তিনি পৃথিবীর অসংখ্য যায়গা দেখেছেন কিন্তু জিব্রাল্টার এই প্রথম। তার শাশুড়ী না চাইলে তিনি কখনই এই দুর্গম পথে আসতেন না। জিব্রালটারের পাশে দুই হাজার বছর আগের পাথর চাপা পরা শহর যেটা গত একশত বছর আগে খনন করা হয়েছে, সেখানে তারা গেলেন। সেখানে বাড়ি ঘর সহ ইতালির মত পাহাড় থেকে পানি সরবরাহের সেই লম্বা উচু পাথরের তৈরি সরু পথ “একুয়া ডাক্ট” দেখে অবাক হতে হয়, কত কঠিন কাজ তখন তারা সম্পন্য করেছিল। এঞ্জেলা এখানে এসে নিজেও অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন।
এরপর তারা স্পেনের সেভিলে এসে একটা নূতন ডুল্পেক্স বাড়ীতে চার দিন থাকলেন। বাড়িটি আগে থেকেই রাজি ভাড়া নিয়েছিলেন। এখানকার যে রাজবাড়ী সেটাও অপূর্ব এবং বৃহৎ। সাত ঘন্টা লেগেছিল এই রাজবাড়ী ঘুরে দেখতে। রাজবাড়ীর বাগানে প্রচুর ময়ূর তাদের সামনে দিয়ে দিব্যি হেটে বেড়াচ্ছে। এখানে এসে রাজি তার এক বন্ধুকে গাইড হিসাবে নিলেন। তিনি সারা দিন ধরে তাদের সঙ্গে ছিলেন। বাচ্চাকে পাফেট শো দেখালেন। খোলা রেস্টুরেন্টে তারা যখন বসে খাচ্ছিলেন, তখন অনেক ময়ূর তাদের সামনে খাওয়ার জন্য ঘোড়া ফিরা করতে লাগল। তারা হাত বাড়ায়ে রুটি খেতে দিলে সুন্দর ভাবে টোকায়ে খাচ্ছিল। আর খোলা রেস্টুরেন্টের সামনে বাগান বিলাশের ঘন বেগুনি ফুলের গাছ অগনিত ফুল নিয়ে মাটি থেকে চারতলা পর্যন্ত বিস্তৃত। সে এক মায়াভরা দৃশ্য, যা কখনও ভোলার নয়।
এরপর সেখান থেকে তারা এলেন মারভেলায়। এখানে এসে তারা সাত দিন একটা হোটেলে থাকলেন। ভূমধ্য সাগরের তীরে হোটেল Iberostar. হোটেলটি খুব সুন্দর। এটি একটি five star hotel.
তাদের দুটো রুমের বেলকনি থেকেই পুরা সাগরের ভিউ দেখা যায়। খাবারের ব্যবস্থা হোটেলেই ছিল। ডাইনিং রুমে প্রায় তিনশ রকমের বিভিন্য দেশের খাবার প্রতি সন্ধ্যায় এখানে পরিবেশন করা হয়। যেটা যার পছন্দ খাওয়া যায়। সুইট ডিসও প্রায় দুইশত রকমের। পৃথিবীর বিভিন্ন্য দেশের মানুষ এসে এই হোটেলে থাকেন। হোটেলের খুব কাছেই বিশাল সমুদ্র বন্দর। বিশ্বের বিভিন্য দেশের ধনী ব্যক্তিরা নিজেদের জাহাজে করে বিভিন্য দেশ থেকে রোলস রয়েলস, মারসিটিজ, ভল্ভো, বি এম ডব্লিউ আরও অনেক দামী দামী গাড়ী এইসব জাহাজে করে আনেন। অবসর বিনোদনের জন্য এসে এই হোটেলে থাকেন। আর তারা নিজেদের ঐ সব গাড়ী নিয়ে ঘুরা ফিরা করেন। একদিন একটা অতি অল্পবয়সের মেয়ে একটা লাল রঙের রোলস রয়েলস চালিয়ে তাদের ঠিক সামনে হোটেলে এসে থামলেন। দেখে রাজি তার মাকে দেখালেন আর অবাক হলেন ধনীর বিলাস দেখে। তারা হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্র বন্দরে গেলেন। সেখানে অসংখ জাহাজ তীরে লঙ্গর করা ছিল। এখানকার দর্শনীয় স্থানগুলি দেখার পর তারা মালাগায় ফিরে গেলেন। সেখানে একটা ব্যাপার দেখে তাদের ভাল লাগল। সমুদ্রতীরে লঙ্গর করা জাহাজে ঘর ভাড়া নিয়ে এখানে হোটেলের মত থাকা যায়। কিন্তু সেখানে থাকার তাদের আর সময় ছিলনা। তাই পনের দিন স্পেনে ভ্রমনের পর প্রানভরা সুন্দর স্মৃতি নিয়ে তারা সুইজারল্যান্ডে ফিরে এলেন।
রাজির অত্যন্ত দেশ ভ্রমনের সখ ছিল। বিধাতার অসীম দয়ায় আজ রাজি যখন যে দেশে খুশী যেতে পারেন। কখনও একা, কখনও ফেমেলি নিয়ে। তার স্ত্রী নিজেই তাকে বেড়ানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। নভেম্বর ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ৯০ (নব্বই) টা দেশ রাজি ভ্রমণ করেছেন । bangla love story book
যখন মেজর রাজি তিন বছর প্রধান মন্ত্রীর স্পেসাল সিকিউরিটি ফোরসে ছিলেন তখন বিশ্বের বত্রিশটা দেশের হেড অফ স্টেটের সঙ্গে তার কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। তখন মেজর রাজি অত্যন্ত দক্ষ সুরক্ষা কৌশল, তার সর্ব বিষয়ে আন্তরিক সহযোগিতা, তার আচার আচরন এবং তার একাত্মতা দেখে তারা সবাই মুগ্ধ হতেন। এই সল্প দিনের সল্প পরিসরের পরিচয়ে তিনি নিজ গুনে সবার অত্যন্ত প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন। তাই তখন তারা তাকে তাদের দেশ ভ্রমনের জন্য ব্যাক্তিগত ভাবে নিমন্ত্রণ করতেন । আর তাই এখন ঐ সব দেশে যখন রাজি ফেমিলি নিয়ে বেড়াতে যান, তখন সেখানকার এম্বাসেডরের আমন্ত্রনে তাদের অতিথি হয়ে তারা যে কদিন খুশি থাকতে পারেন। ইচ্ছামত এম্ব্যাসির গাড়ী ব্যাবহার করেন। আবার জেনেভায় কোনও বাংলাদেশের আর্মি অফিসার ভিজিটে গেলে, সব সময় মেজর রাজিকে সেখানে বাংলাদেশ এম্ব্যাসিতে দাওয়াত করা হয়। সত্যিই এটা একজন অবসর প্রাপ্ত জুনিয়র অফিসার হিসাবে তার পরম পাওয়া। আবার মেজর রাজি নিজেও অত্যন্ত অতিথি পরায়ন। দেশ থেকে বন্ধুরা যখন সুইজারল্যান্ডে ভ্রমনে যান, তারা যে কদিন খুশী রাজির বাসায় থাকতে পারেন। বিভিন্য জায়গা পরিদর্শনের জন্য তাদেরকে সাথে নিয়ে যান।
মেজর রাজি বর্তমানে ফ্রাঞ্চের ক্যান শহরে পাইলট ট্রেনিং করছেন। এটা তার ছোট বেলার সখ ছিল। কিন্তু বাবা মা ভয়ে কখনও সন্মতি দেন নি। এখন তিনি এক রকম জোর করেই এই কোর্স করেছেন। তার স্ত্রী নিজের গাড়িটা তাকে দিয়েছেন। রাজি প্রথম যখন ক্যানে ট্রেনিং এ যোগদান করতে যান তখন তার স্ত্রীর গাড়িটা নিয়ে তার মাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। তারা ইতালির বিভিন্ন শহর দেখতে দেখতে যাবেন বলে ইতালির পথ দিয়ে যাত্রা করলেন। সুইজারল্যান্ডের বর্ডার পাড় হলেই ইতালি। কিছুক্ষনের মধ্যেই সেই বিখ্যাত তের কিলোমিটার লম্বা টানেলের ভিতর দিয়ে গাড়ী চালাতে লাগলন রাজি । ভীষণ ভয় ভয় লাগছিল রাহেলার। সুইজারল্যান্ড আর ইতালির টানেল এর মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। অতি অনুজ্জ্বল আলোটাই যেন বেশি খারাপ লাগছিল তার। এরপর শুরু হল প্রতি কয়েক সেকেন্ড পরই টানেল আর তার জন্য টোল। পাহাড়ের ভিতর দিয়ে প্রায় দুইশত টানেল পাড় হয়ে ফ্রান্সে পৌঁছলেন তারা। golpo guccho Online
ক্যানে এসে রাহেলার বিরাট স্বস্তি। তার খুব ভাল লাগলো যায়গাটা। থাকার সুন্দর ব্যাবস্থা। ডুপ্লেক্স বাড়ি। সাথেই সুইমিং পুল। চারিদিকে উঁচু পাহাড়। ভূমধ্য সাগরের খুব কাছেই এই এলাকাটা। এখানে ফিল্ম ফেস্টিভাল হয়। ইয়াট ফেস্টিভাল হয়। তখন ফেস্টিভালের সময় ছিল। হাজার হাজার ইয়াট সাগরে পার্ক করা ছিল।
দুইদিন পড়ে রাজির ক্লাশ শুরু হয়ে গেল। তিনি সারাদিন ক্লাশ করার পর প্রতিদিন মাকে নিয়ে রাতে এসব জায়গায় বেড়াতে আসেন। রাতে ইয়াটগুলো না না রঙ্গের আলোক সজ্জা দিয়ে সাজানো হয়। দেখে মনে হয় সমস্ত সমুদ্র তীর যেন বিয়ে বাড়ির সাজে অপরূপ রূপে সেজেছে। পুরাতন ক্যান শহর ইউনেস্কো দ্বারা সংরক্ষিত। এখানে বিখ্যাত আর্টিস্ট পাভলো পিকাসোর মিউজিয়াম আছে। এখানকার রাতের দৃশ্য অপূর্ব।
ক্যান থেকে দেড় ঘন্টার পথ নিস শহর। সাগরের তীরে অপূর্ব এই শহর। এটা পূর্বে ইতালির মধ্যে ছিল। পরে রাজা নেপোলিয়ান এই শহর দখল করেন তাই এটা এখন ফ্রান্সের অংশ। একদিন নিস শহরে বেড়ানোর পর মন্টিকারলোর পথে যেতে যেতে একটা ছোট সমুদ্র বন্দরে রাজি গাড়ী থামালেন। মাকে বললেন, এখানে সুন্দর বসার যায়গা আছে। চলো আমরা কতক্ষন বসি। জায়গাটির নাম বলিউ (Beaulieu)। চারিদিকের দৃশ্য অতুলনীয়, এখান থেকে মোনাকোর পাহাড়গুলি দেখা যায়। দেখতে দেখতে কখন সন্ধ্যা হয়েছে তারা টের পায়নি। রাহেলা হঠাত সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দেখেন সূর্য ডুবছে। বিশাল লাল সূর্য। রাজি অনেক দূরে পেছনে হাঁটছিলেন। তিনি দৌড়ে গিয়ে তাকে বললেন “রাজি তাড়াতাড়ী ছবি তোল”। তিনি ক্যামেরা অ্যাডজাস্ট করতে করতে দেড়ি হল। তারপর তারা দেখল সূর্যটা ডোবার পরিবর্তে পানির অনেকটা উপরে ঊঠে আসছে। তারা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। কিছুই বুঝতে পারছেনা। সন্ধ্যা বেলায় সূর্য উঠছে মানে এখন আবার কিয়ামত হবে না তো! এটা যে কোণ দিক তাও বোঝা যাচ্ছেনা। তবে সূর্যটা যখন আরও উপরে ঊঠল তখন তারা বুঝতে পারল, এটা চাঁদ। এটা ছিল পূর্ণ চন্দ্র বা পূর্ণিমা। হয়তো পানির উপর বলেই চাঁদটাকে অসাধারন বড় দেখাচ্ছিল। সমুদ্র তীরে সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত তারা দেখেছেন। কিন্তু চন্দ্রোদয় যে কখনও দেখতে পাবে এটা স্বপ্নেও ভাবেননি। তাও আবার পূর্ণিমার চাঁদ।  
bangla new love story চাঁদের আলোটা পরেছিল সম্পূর্ণ সমুদ্রের পানিতে। এই নির্মল পবিত্র অসাধারণ দৃশ্য দেখতে দেখতে সেদিন তারা সমুদ্র তীরের পথ ধরে ক্যানে ফিরে আসলেন। চাঁদটাও যেন গভীর মমতায় তাদের সাথে সাথে ক্যানে এসে দাঁড়িয়ে রইল। সেদিন আর মোনাকো যাওয়া হলনা।

এবার তারা সেখানে গাড়ী পার্ক করে কার্লটন ক্যান হোটেলে ঢুকলেন। একটা অপূর্ব সুন্দর হোটেল। ফিল্ম ফেস্টিভালের অডিটরিয়ামের সামনেই এই হোটেল। এখানে ফিল্ম স্টাররা এসে থাকেন। এবং বিভিন্ন দেশের গন্যমান্য ব্যাক্তিরা রাজারা এসে এই হোটেলে থাকেন। রাজির কাছে এই হোটেলের মেম্বারশিপ কার্ড আছে। রাজি তার মাকে এই হোটেলের ভিতরটা ঘুরে দেখালেন। অপূর্ব সুন্দর হোটেলটার দেয়ালে প্রিঞ্চেস ডায়নার ছবি এবং হলিউডের স্টারদের ছবি দেখে রাহেলার চোখে পুরানো দিনের ইংলিশ ছবিগুলো ভেসে উঠল। সেই দিন আরব দেশের রাজা সেখানে অবস্থান করছিলেন। হোটেলের বাহিরে নাচঘরে মেয়েরা অ্যারাবিয়ান বাদ্যজন্ত্রের তালে তালে নৃত্য পরিবেশন করছিলেন। রাজি আর তার মা হোটেলে কিছু স্ন্যাক্স, কফি খাওয়ার পর বাহিরে নাচঘরে এসে বসলেন।
পরদিন রবিবার ছুটির দিন ছিল। অতি ভোরে রাজি মাকে নিয়ে মোনাকোর উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। পথে নিস শহরে তারা থামলেন। সপ্তাহে একদিন রবিবারে এখানে ফুলের হাট বসে। সেই ফুলের হাটের বর্ণনা দেয়ার ক্ষমতা নেই। কত হাজার রকমের ফুল, ক্যাক্টাস, আর পাতা বাহার তা গুনে শেষ হবেনা। কতটা লম্বা জায়গা জুড়ে এই হাট বসেছে তা হেঁটে শেষ করতে পারেনি তারা। চোখ ঝলসানো নানান রঙ্গের নানা ধরনের ফুল দেখলে শুধু অবাক হতে হয় বিধাতার সৃষ্টি নৈপুণ্য দেখে। ফুলের দোকানগুলি খোলামেলা শেডের মধ্যে। তার মধ্যেই রেস্টুরেন্টের খাবার ব্যাবস্থা। রাজি তার মাকে নিয়ে সেখানে নাস্তা খেলেন। মনে হল তাদের নিজেদের বাড়িতে এই ফুলের মেলা বসেছে আর তারা সেখানে বসে বসে খাবার উপভোগ করছেন। এরপর তারা মন্টিকারলো তে পৌঁছে গেলেন। ভূমধ্য সাগরের তীরে অতি ছোট্ট একটি দেশ। সাগর আর পাহাড়ের সমন্ময়ে এই অপূর্ব সুন্দর দেশটির তুলনা হয়না। বিভিন্য দেশের অনেক জাহাজ সেখানে কুলে ভিড়ানো। সব ধনী ব্যাক্তিরা এখানে বাস করে। এখানে বহু পুরানো বিখ্যাত হোটেল ‘হোটেল ডি প্যারিস’ এ রাজি তার মাকে নিয়ে গেলেন। তার কাছে মনাকোর রাজার সোসাইটির মেম্বারশিপ কার্ড আছে। তাই তিনি রয়ালটির সার্কেলের যে কোন জায়গায় যেতে পারেন। ভিষন সুন্দর এবং ঐতিহ্যবাহী এই হোটেলে সেই আমলে যেখানে যা যেমন ছিল সব তেমনি আছে। সেখানে কোন কম্পিউটার নাই। সব হিসাব কিতাব কাগজে কলমে হয়। বাথরুম সব সেই আমলের। এখানে একটা রুম আছে যার একদিনের ভাড়া ছিয়াশি লক্ষ টাকা। রাজা বাদশারা এসে থাকেন সেখানে। এখানে কিছু স্ন্যাক্স, কফি খাওয়ার পর তারা ক্যাছিনোতে গেলেন। এটা রাজবাড়ী নয় কিন্তু রাজবাড়ীর মত, খুবই সুন্দর। তারপর একটা টুরিস্ট বাসে পুরা শহরটা তারা দেখলেন। দুইবছর আগে রাজি এই শহরে এসে একমাস ছিলেন। এঞ্জেলা তাকে বিনোদনের জন্য পাঠিয়েছিলেন। তখন মোনাকোর রাজা তাকে খুব পছন্দ করতেন তাই তিনি তাকে তার রয়্যাল সোসাইটির কার্ড দিয়েছেন। তাই তিনি সেখানকার সোসাইটির যে কোন প্রগ্রামে যেতে পারেন। মন্টি কার্লো পুরাটা দেখা হলে ফিরার পথে বিভিন্ন স্থানে গাড়ি পার্ক করে সাগরের তীরে বসে চারিদিকের অপরূপ নিসর্গ উপভোগ করতে করতে প্রকৃতির নির্মল স্নিগ্ধ মায়ার জালে বন্দী হয়ে গেলেন তারা। এক এক স্থানের এক এক সৌন্দর্য। কিছুদুর পর পর একটা পুরানো রাজবাড়ী। সেগুলো সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
চলবে.........।।



bangla new love story
ডাঃ রাহেলা খুরশীদ জাহান মঞ্জু
#সন্ধ্যা তারার নিমন্ত্রনে
পর্ব- ৭
এভাবে চলতে লাগলো রাজির পাইলট ট্রেনিং ক্লাশ। আর বিকেলে মাকে নিয়ে বেড়ানো। একদিন বলতে গেলে একটা বিচিত্র অভিজ্ঞতার সন্মুখিন হলেন তারা। ট্রেনিং ক্লাশে গিয়ে রাজি একদিন তার ডাইরেক্টারকে বললেন, “স্যার আমার সাথে আমার মা আছেন। আপনি অনুমতি দিলে আমার ফ্লাইং স্কুলটা ওনাকে দেখাব”। তখন সাথে সাথে উনি বললেন, হ্যাঁ ছুটির দিনে তোমার মাকে নিয়ে এস। উনাকে প্লেনে পুরো ক্যান শহর ঘুড়ে দেখাব। আর চিফ ইন্সট্রাক্টারকে বলে দিলেন তিনি নিজে যেন তার মাকে প্লেনে ঘুড়ে দেখান। তার কথা শুনে রাজি বিশ্বাস করতে পারছেন না এটা কি করে হয়! এতো ব্যায়বহুল এই প্লেনের ফ্লাইং, তার মায়ের জন্য কেন খরচ করবেন তারা!
যা হোক উনার কথামত ছুটির দিনে রাজি মাকে সাথে নিয়ে এলেন এবং পরিচয় করে দিলেন হেড ইন্সট্রাক্টারের সাথে। তিনি সুন্দর ইংলিশ বলতে পারেন। এবার ঘুড়ে ঘুড়ে সমস্ত অফিসটা তিনি রাহেলাকে দেখালেন। কফি খাবার পর তিনি হ্যাংগার থেকে প্লেন ডি-৪০ বেড় করতে বললেন। এরপর রাহেলাকে ডেকে তিনি প্লেন চালানো শিখাচ্ছেন। প্রতিটা অপারেশন এর সাথে প্লেনের পাখা লেজ ইত্যাদির মুভমেন্ট ঘুরে ঘুরে দেখালেন। জয় স্টিক ছিল এই প্লেনে। সেটার ব্যাবহারও শিখালেন তিনি। মা ও ছেলে দুজনেই ভাবছেন এসব শিখে তার কি হবে। এবার তাদের অবাক করে দিয়ে উনি রাহেলাকে ক্যাপ্টেনের সিটে বসতে বললেন। দুজনে অবাক বিস্ময়ে উনার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। তখন উনি দৌড়ে গিয়ে একটা চেয়ার আনলেন। যাতে করে রাহেলা সহজে প্লেনে উঠতে পারেন। রাজি বললেন, “মা তোমাকে এখানে বসতে বলছেন বস”। রাহেলা এবার ক্যাপ্টেনের সিটে বসলেন। ইন্সট্রাক্টার পাশের সিটে এবং রেহান পেছনে বসলেন।
উনি প্লেন চালায়ে যখন ভূমধ্য সাগরের উপর উঠলেন, তখন রাহেলাকে ইংরেজি ভাষায় বললেন, এখন তুমি চালাও। একবার, দুবার, তিনবার বলার পর উনি বললেন, দেখ আমি হাত ছেড়ে দিলাম। তোমাকে শিখায়েছি এখন তুমি চালাও। রাজি বললেন মা তুমি চালাও। তিনি জানেন ইন্সট্রাকটারের কাছে কন্ট্রোল আছে, তথাপি ভয় হচ্ছে কারন ডানে বামে নেয়ার সাথে সাথে প্লেন কাত হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল এই বুঝি প্লেনটা ভূমধ্য সাগরে পরে গেল। তখন ইন্সট্রুাক্টার আবার পা দিয়ে কন্ট্রোল করছেন। এভাবে কতদুর চলার পর সামনে এলো অপূর্ব দ্বীপ সান্ট্রোফে। এটা পৃথিবীর একটা বিখ্যাত দ্বীপ। এখানে প্রিন্সেস ডায়না প্রায় আসতেন। একপ্রকার ঝিনুক এখানে পাওয়া যায়, তিনি সেটা খেতে খুব পছন্দ করতেন। এবার চিফ ইন্সট্রাক্টারের নির্দেশ মতো এই দ্বীপের উপর থেকে ইউ টার্ন করে প্লেনটাকে ঘুড়ায়ে আনলেন রাহেলা। তারপর মন্টিকারলোর পাশ দিয়ে আসার সময় তার কাছ থেকে কন্ট্রোল নিলেন চিফ ইন্সট্রাক্টার। তিনি সর্বমোট এক ঘন্টা ধরে প্লেনে ঘুড়ে দেখালেন আরও অনেক দ্বীপ। bangla fairy tales সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা যা কখনও কল্পনা করেন নি তিনি।

ধীরে ধীরে ক্যানের দিনগুলি ফুরায়ে এলো রাহেলার জন্য, কারন ২০ শে সেপ্টেম্বর তার ঢাকায় ফিরার ফ্লাইট। রাজি মাকে বিদায় দেয়ার জন্য চারদিনের ছুটি নিলেন। ১৭ই সেপ্টেম্বর রাতে তিনি মাকে নিয়ে সুপার মার্কেটে গেলেন। সেখানে দেশের জন্য কিছু কেনা কাটা করার পর হঠাত তার চোখে পড়ল ড্রেস করা কোয়েল পাখী, যেটা ওখানে সচরাচর পাওয়া যায়না। সে খুশী হয়ে এক প্যাকেট কিনে ফেলল। ঐ প্যাকেটে ছিল এগারটা পাখী। তাই দেখে রাহেলার তো অবস্থা খারাপ। কারন এই এতরাতে তাকেই সব চাকু দিয়ে কাটতে হবে আবার রান্না করতে হবে সেও আবার দোপিঁয়াজি, তারজন্য অনেক পিয়াজ কাটতে হবে। এইসব চাকু দিয়ে কেটে রাহেলা অভ্যস্ত নয়। যা হক ছেলের মহা খুশী দেখে তিনিও খুশী হয়ে বাসায় ফিরে এলেন। তারপর সব কাটা, রান্না, সাথে আবার খিচুড়ি রান্না। এসব সাড়তে রাত সারে বারটা বেজে গেল। তারপর খেতে বসে রাজির সে কি আনন্দ। দেশ থেকে যাবার পর এই প্রথম সে পাখীর মাংস খাচ্ছে। মা কিছু মাংস আর খিচুড়ি ফ্রিজে রাখলেন, রাজি ফিরে এসে খাবে। আর পরদিন পথে খাবার জন্য কিছু আলাদা করে নিলেন।
ওইদিন রাত চারটায় রাজি মাকে নিয়ে সুইজারল্যান্ডের পথে রওনা দিলেন। এবার ইতালীর মধ্য দিয়ে নয়, ফ্রান্সের ভিতর দিয়ে তারা যাচ্ছেন। অতি সুন্দর রাস্তা। নেপোলিয়ান একসময় এই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন রাজ্য জয় করার জন্য। পথে এক ব্রেক নিয়ে রাজি মনের আনন্দে আবার সেই পাখীর মাংস আর খিচুড়ি খেয়ে নিলেন। তার যে কি খুশী সেই পাখীর মাংস পেয়ে তা বলার নয়। তাই দেখে রাহেলার কি পরিমান কস্ট হচ্ছিল তা প্রকাশ করার মত নয়। এই ছেলেকে আবার বিদেশে (ক্যানে) একা ফেলে তাকে বাংলাদেশে ফিরতে হবে। কেন যেন একটা অজানা আশঙ্কায় তার মনটা হঠাৎ কেঁদে উঠল। পাইলটের ট্রেনিং, তার কোন সমস্যা হবে না তো! নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি বললেন, চলো বাবা এবার রওনা দেয়া যাক। কিছুক্ষন পর তারা আবার যাত্রা শুরু করলেন। এরপর পথে আর একটা বিরতি নিয়ে ছয় ঘন্টা পর তারা জেনেভায় পৌঁছলেন। তারপর লুজানে এঞ্জেলার বাসায়। এরপর সেখানে দুদিন থাকার পর জেনেভা এয়ারপোর্টে সবার বিদায় দেয়া নেয়ার পালা। bangla fairy tales২০ শে সেপ্টেম্বর মা বাংলাদেশের আর রাজি ক্যানের পথে যাত্রা করলেন।

মায়ের মন সেদিন কেন অজানা আশঙ্কায় কেঁদে উঠেছিল সেই বর্ণনা এখন দিতে গিয়ে আমার বুক কেঁপে উঠছে। রাহেলা সেখান থেকে ফিরে আসার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই সেই ঘটনা। সেদিন ৩ রা অক্টোবর ২০১৫ সন। রাত্রি ১০ টা ঝিপ ঝিপ বৃষ্টি হচ্ছে সাথে মেঘের ডাক। রাজি তার ডুপ্লেক্স বাসার নীচ তলায় একটা বেডে শুয়ে শুয়ে পড়াশুনা করছেন। প্রতিদিন ক্লান্ত হয়ে তিনি রাত নটার দিকে ঘুমায়ে পড়েন। সেদিন কেন যেন তার ঘুম আসেনি। হঠাত দেখেন প্রচণ্ড শব্দে হুর হুর করে কাঁচের দরজার ফাঁক দিয়ে প্রবল বেগে পানি ঢুকছে তার ঘরের মধ্যে। মুহূর্তের মধ্যে তার হাটু পরিমান পানি। সে বুদ্ধি করে তাড়া তাড়ি সমস্ত ইলেট্রিক প্লাগ গুলো একে একে খুলে তার ল্যাপটপ সহ আরও নানা প্রকার ইলেক্ট্রিক্যাল সরঞ্জাম যতটা পারেন কাঠের শিরি বেয়ে দোতালায় নিতে থাকলেন। একসময় ছয় ফুট লম্বা এই ছেলের কান পর্যন্ত পানি ঊঠে গেল। বরফের মত ঠান্ডা কাদা যুক্ত পানি। তখন বই পুস্তক আর জিনিসের মায়া ছেড়ে পিচ্ছিল কাঠের সিঁড়ি বেয়ে কোন রকমে দোতালায় গিয়ে বসে বসে সারা রাত প্রার্থনা করছেন। বাহিরে প্রচণ্ড ঝড়ের তান্ডব লীলা আর পাহাড়ি ঢল সারা রাত চলতে লাগল। বড় বড় গাছ ভেঙ্গে বাড়ির দরজা জানালা ভেঙ্গে, গাড়ি গুলো ভেসে ভেসে উল্টে পালটে লন্ড ভন্ড অবস্থা। পরদিন বেলা ১ টা পর্যন্ত তার ঘরের মধ্যে পানি। আসবাব পত্র সব লন্ড ভন্ড অবস্থা। ওই এলাকায় প্রায় তিনশত ডুপ্লেক্স বাড়ি ছিল। এগুলো টুরিস্টদের জন্য তৈরি। ওই সময় সেপ্টেমবরে টুরিস্ট সিজন শেষ। তাই একমাত্র ছাত্র রাজি সেখানে পহেলা অক্টোবর থেকে এলাকায় একা বাস করছিলেন। ফ্লাইং স্কুল থেকে এটা তার জন্য ভাড়া নিয়ে দিয়েছিল।
এদিকে সেই রাতেই এঞ্জেলা এবং তার বাবা মা খবরে ফ্রান্সের এই দুর্যোগ দেখে সারা রাত তারা পেরেশানি হয়ে ফ্রেন্স পুলিশের সাথে যোগাযোগের চেস্টা করে বিফল হলেন। এঞ্জেলা সারা রাত কেঁদে কেঁদে শুধু বিধাতাকে ডাকতে থাকেন। বেলা একটার দিকে তারা পুলিশের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। পুলিশ তখন সেই এলাকায় গিয়ে তাকে খোঁজেন। রাজির মোবাইল পানিতে ডুবে গেছে। দোতালায় তার মা পুরানো মোবাইলটা রেখে আসছিলেন। সেই মোবাইলে ফ্রান্সের সীমে সামান্য কিছু ইউরো ছিল। রাজি বহু কস্ট করে কাদার মধ্যে একটা কাঁচের দরজা গায়ের জোরে একটু ফাঁক করে ঘর থেকে বেড়িয়ে আসেন। এঞ্জেলার সাথে খুব চেস্টা করছেন ফোনে যোগাযোগ করতে। এমন সময় পুলিশ এসে তাকে বলেন, “ফেমেলির সাথে কথা বলেন”। রাজি তার মায়ের ছেড়ে যাওয়া মোবাইল থেকে কোনভাবে এঞ্জেলাকে বললেন, “প্লিজ কল ব্যাক”। তারপর তারা কথা বলতে পেরে সবার জানে প্রান ফিরে আসে। এদিকে বেলা পাঁচটা বাজে রাজির কিছু খাওয়া হয়নি রাত থেকে উপোষ। খাবার পানি পর্যন্ত নেই । বাহিরে সব লন্ড ভন্ড অবস্থা, রাস্তা ঘাট বড় বড় গাছ আর ভেসে আসা গাড়ি দিয়ে বন্ধ। ইলেক্ট্রিসিটি বন্ধ। রাস্তাঘাট সব গাড়ি চলার অযোগ্য। সে এক ভয়াবহ দিন। রাজি প্রানে বেঁচে আছে এটাই বেশী। ফ্রান্সের দুইশত বছরের ইতিহাসে এমন দুর্যোগ হয়নি। বেশ কিছু প্রানহানি হয়েছিল সেদিন। রাজি ঐ সময় ঘুমিয়ে থাকলে তার ভাগ্যে কি ছিল বিধাতাই ভাল জানেন! আর সেই কারনেই বুঝি মায়ের মন সেদিন পথের মধ্যে এক অজানা আশঙ্কায় কেঁদে ঊঠেছিল।
মিসেস এঞ্জেলা বর্তমানে আফ্রিকার একটা দেশ বেনিনের এম্ব্যাসেডর। এতো অল্প বয়সে এই প্রথম কোন এক সুইচ এম্ব্যাসেডর। এবং তিনি গত দুই টারম ধরে ইউনেস্কোর ইলেক্টেড বোর্ড অফ ডাইরেক্টর। তিনি নিষ্ঠাবান এবং অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজ করেন বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। বেনিনের জনগণের শিক্ষার উন্নতি এবং দারিদ্র বিমোচনের লক্ষ্যে কাজ করবেন বলে তিনি সেচ্ছায় বেনিনে পোস্টিং নিয়েছেন। রাহেলা তাঁদের সঙ্গে এবার বেশ কিছুদিন থাকবেন বলে এক বছরের সুইচ ভিসা নিয়ে সুজারল্যান্ডে এসেছেন। এবার রাহেলার সঙ্গে এসেছেন তার ছোট ছেলে রাফি, তার স্ত্রী অংকন এবং মেয়ে বিনি। প্রথম দিনে এঞ্জেলার বাবার শহরের বাড়িতে নিমন্ত্রনে এসে রাফিরা সবাই তাদের বাড়ীতে বিচিত্র রকমের ফুলের আর ফলের বাগান দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। এর পরদিন সবায় তাদের পাহাড়ের বাড়িতে গেলেন। সাপের মত একে বেঁকে অতি দুর্গম পথ পার হয়ে প্রায় দশ হাজার ফুট উচুতে তাদের এই বাড়ি। এটাকে শ্যালে বলা হয়। চারিদিকের বিচিত্র ধরনের পাহাড় আর সবুজ গাছ ঘেরা অসংখ বাড়ি গুলি এখানে বছরের বেশীর ভাগ সময় খালি থাকে। শীত কালে স্কি আর গ্রীষ্ম কালে বিনোদনের জন্য তারা এখানে আসেন। এখানে সবায় একদিন থাকার পর এবার নুতন করে শুরু হল নুতন নুতন দর্শনীয় স্থান গুলু দেখা।
সুইজারল্যান্ডে একটি সুইমিং পুল আছে যেখানে সারা বছর প্রাকৃতিক ভাবে পাহাড় থেকে গরম পানি অবিরাম প্রবাহিত হয় এটির নাম ফ্রেন্স ভাষায় (Sole Uno Wellness)। এটা আল্পস পর্বত থেকে কিছুদুর নেমেই অবস্থিত। সেখানে তারা সবাই মনের আনন্দে সাঁতার কেটে লুজানে ফিরে আসলেন। তারপর জেনেভা, জুরিখের বিভিন্য স্থানগুলি দেখার পর জেনেভা লেকের তীরে অবস্থিত অতি প্রাচীন বিখ্যাত ক্যাসল (Chillon Castle) পরিদর্শনে গেলেন। bangla fairy talesক্যাসলের ভিতরে অন্ধকার কারাগার দেখলে গা শিউরে ওঠে। বছরের পর বছর কারাবন্ধিরা এখানে জীবন কাটিয়েছেন। একজন ব্যাক্তির সত্তর বছর কারাদণ্ড হয়েছিল। এটা রাজনৈতিক কারাদণ্ড ছিল। তখন লর্ড বাইরন তার সাথে দেখা করতে এসে একটা সাংঘাতিক অর্থবহ কবিতা লিখে যান। সেটি এখনও সেখানে রক্ষিত আছে। এইসব দেখতে দেখতে দশ দিন পার হয়ে গেল। এবার রাফি তার পরিবার সহ এথেন্সের পথে রওনা হলেন। সেখানে কিছুদিন কাটানোর পর নেদারল্যান্ডে যাবেন তারা। সেখানে রাফির দুই শ্যালক থাকেন। সেখান থেকে ফ্রান্সের প্যারিস হয়ে তাদের দেশে ফিরার কথা।

ছোট ভাই রাফিকে বিদায় দিয়ে মেজর রাজি তার পাইলট ট্রেনিং স্কুল ফ্রান্সের ক্যানে ফিরে গেলেন। তার মা রাহেলা বৌমা আর বাচ্চাদের সাথে সুইজারল্যান্ডে রয়ে গেলেন। এরমধ্যে এঞ্জেলার বিদায় অভ্যর্থনার বেশ কটি অনুষ্ঠানের আয়োজন হয় সেখানে। রাহেলা সব অনুষ্ঠানেই যোগদান করেন। সবায় এঞ্জেলাকে ভারাক্রান্ত হ্রিদয়ে বিদায় জানান। তাই দেখে রাহেলার মনও ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে, যদিও তিনি তারই সাথে বেনিন যাবেন। কয়দিন পর এঞ্জেলা তার শাশুড়ি রাহেলাকে এবং দুই বাচ্চাকে নিয়ে ক্যানে রাজির কাছে গেলেন। সেখানে কটা দিন ভুমধ্য সাগরে সাঁতার কেটে আর বিভিন্য দর্শনীয় স্থানগুলি পরিদর্শন করে কাটালেন তারা। দুই সপ্তাহ পর এঞ্জেলা দুই বাচ্চাকে নিয়ে সুইজারল্যান্ডে বাবার বাড়িতে ফিরে এলেন। তারপর সেখানে নানা নানীর কাছে বাচ্চাদেরকে রেখে এঞ্জেলা আফ্রিকার বেনিন দেশে গিয়ে কর্মস্থলে যোগদান করলেন।
চলবে.........।।



SHARE

Author: verified_user