বাংলা ছোট চটি গল্প কনফিউশন | ভালবাসার কাহিনি গল্প

SHARE

বাংলা ছোট চটি গল্প কনফিউশন  | প্রেমের গল্প 



কনফিউশন লেখকঃ মৌরি মরিয়ম

চায়ের কেটলি চুলায় বসালো আরশি। দশ মিনিট আগে তিরা ফোনে জানিয়েছে সে স্টেশন থেকে রিক্সা নিয়েছে। তার মানে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে। এসেই বায়না ধরবে চা খাওয়ার। তিরার ধারণা যদি চা বানানোর কোনো প্রতিযোগিতা হতো তবে আরশি সেখানে চ্যাম্পিয়ন হতো। 

বাংলা ছোট গল্প পর্ব ১




কলিং বেল বাজতেই আরশি দৌড়ে গেল বারান্দায়। বাড়ির মূল ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে তিরা। তাকে দেখতে পেয়েই আরশি বলল,
"দাঁড়া আসছি।" বাংলা ছোট গল্প
আরশি দৌড়ে নিচে নামলো। ছোটো বাগান পেড়িয়ে গিয়ে গেট খুলতেই তিরা ঝাপিয়ে পড়ে জড়িয়ে ধরলো আরশিকে। আরশিও তিরাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
"অবশেষে আসলি! আমি তো ভেবছিলাম এবার বাড়ি থেকে আসবিই না।" Bangla Story
"কি করব বল। এতদিন পর গেলাম কিছুদিন তো থাকতেই হয়। তার উপর আবার এখন পড়াশোনা নেই।" Bangla New Golpo
আরশি তিরাকে ছেড়ে গেট লাগাতে লাগাতে বলল,
"এখনই পড়াশোনা সবচেয়ে বেশি।"
"ওহ বড়দের মত জ্ঞান দিস না তো। আর কতদিন দাদীমা থাকবি?"
তিরা আরশির দিকে তাকিয়ে কথা বলতে বলতে পেছনের দিকে উলটো হাঁটছিল। আরশি বলল,
"তুই কতদিন বাচ্চা থাকবি?"
একথা বলে আরশি তিরার দিকে ঘুরতে না ঘুরতেই একটা ঘটনা ঘটলো। তিরা কাব্যর সাথে জোরেসোরে একটা ধাক্কা খেলো। কাব্য কোনো কাগজপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে দ্রুত হেঁটে আসছিল, আর তিরাও উলটো হাঁটছিল তাই কেউই খেয়াল করতে পারেনি। তিরা প্রচন্ড ব্যাথা পেলো। ঝগড়া করার জন্য পেছনে ঘুরতেই কাব্য বলল,
"মাফ করবেন, আমি বেখেয়ালে হাঁটছিলাম। আপনি কি ব্যাথা পেয়েছেন?"





কাব্যকে দেখে আর তার কথা শুনে তিরার ব্যাথা কোথায় গায়েব হয়ে গেল। ছেলেটা জিন্স, পোলো টিশার্ট পড়া। লম্বা, ছিপছিপে শরীরের কালো দেখতে একটা ছেলে। কিন্তু কিছু একটা মুগ্ধ করে ফেলল তিরাকে যা সে ধরতে পারলো না। তিরা মৃদু হেসে বলল,
"ইটস ওকে। আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না।"
"আমি কাব্য। আমি এবাড়ির নিচতলাটা ভাড়া নিয়েছি।"
"ওহ আচ্ছা।"
ততক্ষণে আরশি এসে তিরার পাশে দাঁড়িয়েছে। সে বলল,
"ওহ আচ্ছা আপনি সাহিল ভাইয়ার বন্ধু অনন্ত ভাইয়ার ছোটোভাই?"
কাব্য তাকালো আরশির দিকে,
"জ্বী।"
তিরা হাত বাড়িয়ে বলল,
"আমি তিরা। আপনার নিকটস্থ প্রতিবেশী। দোতলায় সাহিল ভাইয়াদের সাথেই থাকি। সাহিল ভাইয়া আমার মামাতো ভাই।"
কাব্য হ্যান্ডশেক করে বলল,
"পরিচিত হয়ে ভাল লাগলো।"
এরপর কাব্য আরশির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
"আপনি?"
আরশি কিছু বলার আগেই তিরা বলল,
"ও আরশি, সাহিল ভাইয়ার ছোটো বোন।"
"আচ্ছা আজ তাহলে আসি। গরীবের বাসায় আপনাদের চায়ের দাওয়াত রইলো, দেখা হবে।"
তিরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। কাব্য বেরিয়ে গেল। তিরা মাটিতেই বসে পড়ে গালে হাত দিয়ে তাকিয়ে রইলো কাব্যর চলে যাওয়া পথের দিকে। ঠোঁটে একটা লম্বা হাসি ঝোলানো। আরশি তিরার হাত ধরে টেনে ওঠাতে ওঠাতে বলল,
"এসব কী হচ্ছে?"
"জানেমান আমি ক্রাশ খেয়ে ফেলেছি।"
"হোয়াট? এই ব্যাটার উপর?"
"প্লিজ ডোন্ট কল হিম ব্যাটা। হি ইজ সো কিউট!" আরশি হেসে বলল,
"উফ তুই না আজকাল যার তার উপর ক্রাশ খাওয়া শুরু করেছিস! চা বসিয়ে এসেছি। আমি গেলাম, তুই তাড়াতাড়ি উপরে আয়।"
ছাদে বসে চা খেতে খেতে তিরা আরশিকে জিজ্ঞেস করলো,
"আচ্ছা ভাবী কোথায় রে?"
"ভাবী বাবার বাড়িতে গেছে। ওর ডেলিভারি ডেট কাছে চলে এসেছে না?। একেবারে বাবু হওয়ার পর আসবে।"
"ওহ।"
"তুই কোনো এডমিশন কোচিং এ যাবি কবে থেকে।"
"কাল থেকেই যাব ভাবছি, কাল ক্লাস আছে না?"
"হ্যাঁ। এত দেরী করে এলি! প্রথম কতগুলো ক্লাস মিস করলি!"
"সমস্যা নেই তুই তো ক্লাস করেছিস, তুই আমাকে বুঝিয়ে দিস।"
"তা দেয়া যাবে।"
"আচ্ছা আরশি ভাইয়া না বলেছিল কোনো ব্যাচেলর ভাড়া দেবে না! তাহলে এবার হঠাৎ দিল যে?"
"উনি তো অনন্ত ভাইয়ার ভাই, বাসা পাচ্ছিল না। অনন্ত ভাইয়া সাহিল ভাইয়াকে অনুরোধ করেছিল কোনো একটা ব্যবস্থা করে দিতে। তখন ভাইয়াই তাকে বলে যে আমাদের নীচতলা খালি। আর উনি তো একা থাকে। ওইরকম দলবাঁধা ব্যাচেলর তো না।"
"ভাগ্যিস ভাড়া দিয়েছিল। নাহয় ওকে পেতাম কোথায়! কি সুন্দর নাম কাব্য! কি সুন্দর চোখ, কি সুন্দর ঠোঁট! উফফ উফফ আমাকে চায়ের দাওয়াত দিয়েছে আমি তো মরে যাব জানেমান।"
"ধ্যাত তুই এই বুড়ো ব্যাটাকেও ক্রাশ খেতে ছাড়লি না! আমার জাস্ট হাসি পাচ্ছে।"

"এসব বললে হবে না। এ প্রজেক্টে তোর আমাকে সাপোর্ট দিতেই হবে।"
"কেন আগের প্রজেক্টের কী হলো?"
"ধুর ওটাকে বাদ দিয়ে দিয়েছি। ১ মাস প্রেম করেই বলে রুমডেটে যেতে!"




আরশি হাসতে হাসতে বলল,
"যার তার উপর ক্রাশ খেয়ে প্রেম করলে এরকমই হবে।"
"শোন আগেরটা যা তা হলেও কাব্য কিন্তু যা তা না। আর তুই আজকেই সাহিল ভাইয়ার মোবাইল থেকে ওর নাম্বার চুরি করে দিবি।"


"আমি পারব না। এই কাজ তো একদমই পারব না। ধরা খেলে ভাইয়া আমাকে জবাই করে ফেলবে।"
তিরা কাচুমাচু হয়ে বলল,
"মানুষের অনুভূতির প্রতি তোর কোনো শ্রদ্ধা নেই কেন রে বোন?"
আরশি হেসে বলল,
"এক দেখাতেই এত অনুভূতি!"
তিরা খুব সিরিয়াস মুখ করে অনুরোধের সুরে বলল,
"তুই এটলিস্ট একটা প্রেম কর বোন। একটা প্রেম করলেই তুই এসব বুঝতে পারবি তার আগে বুঝবি না। আমি তোকে বেস্ট একটা ছেলে খুঁজে দেব।"


"এভাবে ছেলে খুঁজে আমি প্রেম করব না। ভালো লাগা থেকেও করবো না। কখনো যদি কারো প্রতি ভালবাসা হয়ে যায়, সেও যদি ভালবাসে তবেই প্রেম করব। সত্যিকারের প্রেম এত প্ল্যান করে হয়না তিরা। যখন হওয়ার এমনিতেই হয়ে যায়। কিছুতেই আটকানো যায় না। তুই ভাল লাগা থেকে প্রেম করিস বলেই তোর প্রেম টেকে না।"

"আজকাল প্রেম টেকানো বহু কঠিন রে।"
"বাদ দে তো এসব চল নিচে যাই সন্ধ্যা হয়ে গেছে।"
রাত ঘুমানোর সময় তিরা আবার বলল,
"আরু.. জানেমান.. প্লিজ আমাকে কাব্যর ফোন নাম্বারটা চুরি করে দে। তুই যা চাইবি আমি তাই দেব।"



"আমার মাথা খাচ্ছিস কেন তিরা? আমি এসব চুরি চামারির মধ্যে নেই। তোর ব্যবস্থা তুই করে নে।"
"এটাকে চুরি বলে না সোনা। প্লিজ কাজটা করে দে।"
"আমি পারব না। ভাইয়া টের পেয়ে গেলে কি জবাব দেব? আমি এটাও বুঝতে পারছি না কী আছে এই ছেলের মধ্যে? তুই এত দ্রুত প্রেমে পড়িস কীভাবে বল তো?"
"কী আছে মানে? বল কি নেই? এই ছেলে তো চরম সেক্সি হবে মামা।"
"ছি।"
"ছি ছি করিস না তো। 



"Bangla Choto Golpo ke Kew Bangla "Choti Golpo" Vebe Vul Korben Na. Eta Online e Bangla Small Story Reading Headline Type Er Golpo. Bangla Choto Golpo Online Reading"

- BanglaFeeds Team. 


ও একদম আমার মনের মত হবে দেখিস।"
"একবার দেখেই এতকিছু কীভাবে বুঝলি শুনি?"
"উফ আরশি আমি তো তোর মত অন্ধ না। আমি ছেলেদের দেখলেই বুঝে যাই কে কেমন! বয়স তো ১৮ হয়ে গেছে আর এখনো একটা বয়ফ্রেন্ড জোটাতে পারলি না! কী আছে তোর জীবনে? পান্তাভাত জীবন তোর। আর আমার জীবন দেখ, ইটস লাইক কাচ্চি বিরিয়ানি।"



"তোর কাচ্চি বিরিয়ানী নিয়ে তুই থাক। আমার পান্তাভাতেই চলবে। আর একবারো এইসব নাম্বার চুরি করার কথা বলবি না। এক ফ্লোর নিচেই থাকে। যখন ইচ্ছে গিয়ে কথা বলে আসবি। চায়ের দাওয়াত দিয়েছেই মনে নেই?"
"ওহ শিট! চায়ের দাওয়াতের কথা তো ভুলেই গিয়েছিলাম। এইজন্য তোকে এত ভালবাসি।"
একথা বলতে বলতেই তিরা আরশিকে জাপটে ধরে গালে একটা চুমু দিল। আরশি হেসে ফেলল।

আরো পড়ুন ঃ বাংলা ইসলামিক গল্প 




   বাংলা মজার গল্প পর্ব ২


তিরা যখনই নিচে যায় দেখে কাব্যর ফ্ল্যাটে তালা ঝোলানো। কাব্য বাসায় কখন থাকে এটাই সে বুঝতে পারছে না। এদিকে সাহিল ভাইয়ার ফোন থেকেও নাম্বার চুরি করাটা সম্ভব হয়নি।
ঘটনাটা ঘটলো শুক্রবার। শুক্র শনিবার সাহিলের অফিস নেই। তার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। গত শনিবার স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়িতে রেখে আসার পর আর দেখতে যাওয়ার সময় পায়নি। তাই শুক্রবার সকাল সকাল স্ত্রীকে দেখতে চলে গেলো। ১০ টার দিকে তিরা গেল আরশির কাছে। আরশি ফ্রিজ থেকে কাঁচা মাছ তরকারি বের করছিল। তিরা অবাক হওয়ার ভান করে বললো,
"আরু.. একী করছিস?"
"রান্নার আয়োজন করছি।"
"একটু পরে কর না, আমি তোকে সাহায্য করব।"
"কেন? দুপুরবেলা রান্নাঘরে গরম লাগে, সকাল সকাল রান্নাটা সেড়ে ফেললেই ভাল।"


"আচ্ছা যা পুরো রান্নাটাই আজ আমি করব।"
"ঘটনা কী? যাকে দিয়ে ভুতেও একটা কাজ করাতে পারে না সে আজ রান্না করতে চাইছে!"
"এখন কাব্যর বাসায় যাব সেজন্য। অন্যদিন থাকে না আজ নিশ্চয়ই থাকবে।"

"ও এই ব্যাপার! তো যা না। তাতে আমার রান্না আটকাবে কেন?"
"আরে বাবা একা যাব নাকি ওরকম একটা জোয়ান ছেলের কাছে? দুজন মিলে গেলে চিন্তা নেই। তোর ছোটো বোনের সেফটির দায়িত্ব তো তোরই তাই না?"
আরশি হেসে বলল,
"যাতে মাতাল তালে ঠিক। আচ্ছা চল।"
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে তিরা জিজ্ঞেস করলো,
"আচ্ছা আরু.. তুই কাব্যকে এর আগে কখনো দেখেছিস?"
"না।"

"ও হ্যাঁ এজন্যই তো সেদিন কাব্য জিজ্ঞেস করছিল তুই কে। পরিচয় থাকলে তো আর করতো না।"
"তবে অনন্ত ভাইয়াকে দেখেছি। যখন সে ঢাকায় সাহিল ভাইয়ার সাথে একসাথে পড়াশোনা করতো তখন অনেকবার আমাদের বাসায় এসেছিল। অনেক আগের কথা অবশ্য।"
"ওহ। দেখ কাব্য আজ বাসায়।"
খুশিতে তিরার দাঁতগুলো সব বের হয়ে গেল। সামনে তিরা, পেছনে আরশি। দরজায় টোকা দেয়ার পরপরই কাব্য দরজা খুললো।
"একী আপনারা! আসুন আসুন, কি সৌভাগ্য।"
তিরা আরশি ভেতরে ঢুকলো। কাব্য তাদেরকে ড্রয়িং রুমে বসালো। তিরা বলল,

"আপনি কি সারাদিন বাইরেই থাকেন? এর আগেও এসেছিলাম আপনাকে পাইনি।"
কাব্য একবার আরশির দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে তিরার দিকে তাকিয়ে বলল,
"না না আমি এই দুদিন আসলে একটু ব্যস্ত ছিলাম। এমনিতে বেশিরভাগ সময় বাসাতেই থাকি। আমি একটু ঘরকুনো স্বভাবের লোক।"
আরশি কোনো কথা বলছে না। এদিক ওদিক দেখছে। কাব্যর চোখ বারবার তিরাকে পার করে চলে যাচ্ছে আরশির দিকে। সে খুব সাবধানে সেই চোখ আবার তিরার দিকে নিয়ে আসছে। কারণ কথা তিরার সাথে হচ্ছে। তিরা অবশ্য ব্যাপারটা ধরতে পারলো না। বলল,
"আপনি কী করেন?"
"আমি ফাইনাল ইয়ারে পড়ছি। পাশাপাশি ছোটোখাটো একটা জবও করছি।"
"কি জব করেন?"


"রেডিওতে।"
"আপনি আরজে?"
কাব্য হেসে বলল,
"আপনার কি ধারণা রেডিওতে আরজে ছাড়া আর কেউ কাজ করে না?"
"না তা নয়।"
আরশি এবার উঠে গিয়ে কাব্যর বিশাল এক বুক শেল্ফের সামনে দাঁড়ালো। খুব মনোযোগ সহকারে বইগুলো দেখছিল। কাব্য আরশিকে একনজর দেখে আবার চোখ ফিরিয়ে নিলো। তিরাকে বলল,

"আমি সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারের কাজ করি।"
"ওহ আচ্ছা।"
"আপনারা কী পড়ছেন?"
"আমরা দুবোন এবার ভার্সিটিতে এডমিশন নেব।"
"দুজন একসাথেই পড়েন?"
"হ্যাঁ আমাদের সবকিছুই একসাথে।"
"দুজন সমবয়সী?"
"হ্যাঁ।"


"কে বড়?"
"আরশি আমার থেকে এক মাসের বড়।"
"আচ্ছা তিরা একটু অপেক্ষা করুন। আমি চা করে আনি।"
"আপনি চা করবেন কেন? আমাদের চায়ের রানী চা করবে। আরশি যেখানে যায় সেখানে কেউ চা করার দুঃসাহস করে না।"
আরশি ছোটো করে একটা ধমক দিল,
"তিরা!"
কাব্য বলল,
"আমি তাহলে দুঃসাহস টা করেই ফেলি। গেস্টদের দিয়ে কাজ করাই না আমি।"
"সর্বনাশ। আপনি যদি ওর হাতের চা না খান তাহলে জীবনের সবচেয়ে বড় মিস টা কিন্তু করে ফেলবেন।"
"আপনাদের বাসায় গিয়ে ওনার হাতের চা খাব। আপাতত আপনারা আমার বাসায় গেস্ট, আমার হাতের টাই খাবেন।"
"ওকে।"
কাব্য চা করতে রান্না ঘরে যেতেই আরশি তিরার মাথার চুল টান মেরে বলল,
"আমার কথা বলছিস কেন? নিজের কথা বল।"
"আরু দেখ তোর দুলাভাই কত গোছানো! ব্যাচেলর বাসা এত সুন্দর হয় আগে জানতাম না।"
আরশি মুখে বিরক্তি এনে আবার বই দেখতে লাগলো। তিরাও ঘুরে ঘুরে বাসাটা দেখে ফেললো। একফাঁকে বেডরুমও ঘুরে এলো। এরপর আবার ভদ্র মেয়ে সেজে সোফায় বসে রইলো।
কাব্য চা নিয়ে এসে প্রথমে তিরার হাতে চা তুলে দিলো। এরপির আরেকটা কাপ নিয়ে আরশির কাছে গেল। চায়ের কাপ এগিয়ে 


দিতেই আরশি কাপটা নিয়ে বলল,
"থ্যাংক ইউ।"
কাব্য মাথা নেড়ে বলল,
"ওয়েলকাম।"


এরপর আবার ফিরে এলো তিরার কাছে। তিরা চায়ে চুমুক দিয়েই বলল,
"চা তো অসাধারণ হয়েছে। এত ভাল চা আমিও বানাতে পারি না।"
কাব্য হেসে বলল,
"থ্যাংকস।"
আরশি বুকসেল্ফের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই চা খেল। ওদের আড্ডায় একবারের জন্যও এলো না। এদিকে তিরার আগ্রহের শেষ নেই, একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছে।
"আপনার বাড়ি কোথায়?"
"কক্সবাজার।"


"আপনি কত ভাগ্যবান চাইলেই সমুদ্র দেখতে পাবেন!"
"আমার সমুদ্র ভালো লাগে না। হয়তো ছোটোবেলা থেকেই জিনিসটা এভেইলেবল ছিল সেজন্য। তবে আমার পাহাড় পছন্দ।"
"আমার সমুদ্র বেশি পছন্দ। আচ্ছা আপনার ফ্যামিলি কি কক্সবাজারেই থাকে? না এখানে একা থাকেন তাই জিজ্ঞেস করছি।"
"হ্যাঁ আমার ফ্যামিলির সবাই ওখানেই থাকে।"
"আপনার ফ্যামিলিতে কে কে আছে?"
"বাবা, মা, দাদু, চাচ্চু, বড় ভাই, ছোটো ভাই, ভাবি।"
"জয়েন ফ্যামিলি?"
"হ্যাঁ বলতে পারেন। আপনাদের ফ্যামিলি?"
"আমার বাবা-মা আর ছোটো ভাই খুলনা থাকে। বড় আপুর বিয়ে হয়ে গেছে সে অষ্ট্রেলিয়া থাকে। এখানে সাহিল ভাইয়া, ভাবি, আরশি আর আমি থাকি। মামা মামী তো নেই বেশ কয়েকবছর আগে মারা গেছেন।"


আরশি কড়া চোখে তাকালো তিরার দিকে। তিরা অস্বস্তিবোধ করছে, এভাবে কথাটা বোধহয় বলা উচিত হয়নি। আরশি যে এখানে আছে সেকথা খেয়ালই ছিল না তার। কাব্য বলল,
"সরি।"
আরশি বুকসেল্ফের সামনে দাঁড়িয়েই কাব্যর দিকে ঘুরে বলল,
"আমি কি 'ফ্রিডম এট মিডনাইট' বইটি ধার নিতে পারি?"
"শিওর। কেন নয়?"
"বইটি অনেকদিন ধরে খুঁজছি। নীলক্ষেতের কোনো দোকানেই নেই।"
"এটা খুব সম্ভাবত এখানে কোথাও পাবেন না। আমি কলকাতা থেকে এনেছিলাম।"
"ওহ আচ্ছা।"
আরশি বইটি নামাতে চেষ্টা করছিল কিন্তু অনেক উঁচুতে থাকার কারনে সে নাগাল পাচ্ছিল না। কাব্য গিয়ে বইটি নামিয়ে দিয়ে বলল,
"এখানে এরকম আরো অনেক এক্সক্লুসিভ সব বই পাবেন।"
"হ্যাঁ তাই দেখলাম।"
"আপনার যখন ইচ্ছে নিয়ে পড়বেন।"
"থ্যাংক ইউ।"




তিরা দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল,
"এত বই কীভাবে পড়েন আপনারা?"
কাব্য বলল,
"কেন আপনি বই পড়েন না?"
"নাহ এত বোরিং জিনিসের সাথে সময় কাটানোর ধৈর্য আমার নেই।"
কাব্য অবাক হয়ে বলল,
"সিরিয়াসলি!"
"হ্যাঁ।"
আরশি বলল,
"তিরা এবার চল আমরা উঠি।"
"এখনই চলে যাব মাত্রই না এলাম?"
"তাহলে তুই থাক আমি যাই, রান্না করতে হবে। বুয়া আসার আগে রান্না শেষ না করতে পারলে ওকে দিয়ে আর রান্নাঘর পরিস্কার করানো যাবে না। পরে শেষে আমাকে করতে হবে।"
"আচ্ছা ঠিকাছে চল যাই।"
সিঁড়ির কাছে গিয়ে তিরা বলল,
"আপনার ফেসবুক আইডিটা দেয়া যাবে?"
কাব্য হেসে বলল,
"আফনান কাব্য।"
তিরা হেসে বলল,
"তিরা মেহজাবিন।"
কিন্তু ততক্ষণে আরশি দোতলার সিঁড়িতে উঠে গেছে। তার আইডি নামটা আর জানা হলো না কাব্যর।



ছোট চটি গল্প ২০২০ 


বাংলা


দোতলায় গিয়েই তিরা ওদের শোবার ঘরে চলে যাচ্ছিল। আরশি বলল,
"একদম ঘরে যাবিনা। তোর জন্য এতক্ষণ সময় নষ্ট করেছি এবার কাজ করবি আমার সাথে।"
তিরা মুখ কাচুমাচু করে বলল,
"করতেই হবে?"
"হ্যাঁ করতেই হবে। আমি জানতাম তুই এসে পল্টি নিবি এজন্যই যেতে চাইনি।"


"আচ্ছা সরি বাবা! বল কি করতে হবে।"
"চাল ডাল ধুয়ে চুলায় বসিয়ে দে। আমি বাকীসব রেডি করি।"
তিরা চাল ধুতে ধুতে বলল,
"আচ্ছা আরশি তুই কি অবজার্ভ করলি?"
"তুই কি আমাকে অবজার্ভ করার জন্য নিয়ে গিয়েছিলি?"
"না কিন্তু এটাও একটা কারণ। কোথাও গেলে তুই সবকিছু যেভাবে অবজার্ভ করিস, এতকিছু তো আমার চোখে পড়ে না। এবার ঝটপট বলে ফেল তো কাব্যকে কেমন মনে হলো।"
আরশি পেঁয়াজ কাটতে কাটতে বলল,
"এটা তোর সবচেয়ে জঘন্যতম চয়েজ।"
তিরা আহত চোখে তাকিয়ে বলল,
"কী বলছিস? এমন কেন মনে হলো? তোর দলের লোক তো, অনেক বই পড়ে।"



"বই পড়লেই সে ভালো হয়ে গেল? ড্রয়িং রুমের সেন্টার টেবিলের উপর দেখেছিস অ্যাসট্রে ভর্তি সিগারেটের ফিল্টার? আর বুকসেল্ফের পাশের সোফাটা দেখেছিস একপাশে দেবে গেছে? তার মানে ওই সোফাটায় শুয়ে শুয়ে বই পড়ে আর সিগারেট খায়।"
"সিগারেট তো অনেক ছেলেই খায়, এটা কি কোনো দোষ হতে পারে?"



"সবার খাওয়া আর এই ব্যাটার খাওয়া এক না। সে প্রচুর সিগারেট খায়। যে মানুষ পুরো ঘর এত পরিস্কার করে রেখেছে সে অনেকদিনের ফিল্টার অ্যাসট্রেতে জমিয়ে রাখবে না। তাই যতগুলো ফিল্টার ওখানে ছিল সবগুলো আজকের।"
"এত সিগারেট খেলে তো ও ক্যান্সার হয়ে মারা যাবে, আমি অল্প বয়সে বিধবা হব।"



আরশি অবাক চোখে তাকিয়ে বলল,
"তুই তো রকেটের গতিতে ছুটছিস!"
তিরা চোখমুখ উজ্জ্বল করে বলল,
"শোন আমি ওর সিগারেট খাওয়া ছাড়িয়ে ফেলব দেখিস তাহলেই তো হয়।"


"তুই ভাতটা বসাবি প্লিজ?"
তিরা ভাত ও ডাল বসিয়ে দিয়ে আরশির সামনে এসে দাঁড়িয়ে মিনমিন করে বলল,
"আমার কেন যেন ওকে খুব ভাল লেগে গেছে।"
"কারণ ওর গালে একটা কাটা দাগ আছে। এই জিনিসের প্রতি তোর অনেক দূর্বলতা। আজ পর্যন্ত যত গাল কাটা, কপাল কাটা ছেলে দেখেছিস সবার উপরেই তো ক্রাশ খেয়েছিস!"
তিরার চোখ নাচিয়ে বলল,
"সিরিয়াসলি কাব্যর গালে কাটা দাগ আছে?"
"এতক্ষণ তাকিয়ে থেকে কী দেখলি? আমি তো বই চাওয়ার সময় একবার তাকাতেই দেখলাম!"
"দাঁড়া ফেসবুক থেকে ছবি দেখি।"
"একদম না। রান্না শেষ হওয়ার আগে একদম উঠবি না। সাহায্য করবি বলেই তোর সাথে নিচে গিয়েছি।"
অগত্যা তিরা মুখ কালো করে বসে রইলো।




কাব্য ক্লাস থেকে ফিরে মূল ফটকের তালা খুলছিল।
 ঠিক তখন চোখ পড়লো ছাদে।
 সূর্য ডুবে গেছে কিন্তু প্রকৃতিতে তার রেশ এখনো রেখে গেছে। 

ছাদের কার্ণিশে দুহাতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরশি।
 শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। 
বাতাসে তার সাদা ওড়না উড়ছে
 কাব্য অনেকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে আরশিকে দেখলো।
 আরশিও নড়ছে না, কাব্যও নড়ছে না। 
হঠাৎ কোত্থেকে তিরা দৌড়ে এলো আরশির কাছে।
 মোবাইলে কিছু দেখাতে দেখাতে খিলখিল করে হেসে উঠলো। আরশি একবার তাকিয়ে দেখলো।
 হাসি হাসি মুখ করে তিরার চুলগুলো এলোমেলো করে দিল। এরপর হটাৎই তিরা আরশিকে টেনে ছাদ থেকে নিয়ে গেল। মেয়েটির নীরবতাই প্রতিনিয়ত মেয়েটির প্রতি আগ্রহী করে তুলছে কাব্যকে। 

যতবারই আগ্রহ নিয়ে তাকাচ্ছে ততই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। 
তার চোখদুটি যেন কাকচক্ষু জলের দিঘি। 
এত গভীরতা কেন ওই দু'চোখে? কীসের এত বিষন্নতা?
 একটা কারণ সেদিন অবশ্য জানা গেছে৷ মেয়েটির বাবা মা নেই। সেজন্যই কি এত বিষন্ন দুঃখ ভারাক্রান্ত ওই চোখ নাকি অন্যকিছু?


সেদিন দুপুরেই তিরা কাব্যকে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল। কাব্য দেখেও ফেলে রেখেছিল। আজ এক্সেপ্ট করলো। তারপর সোজা চলে গেল ফ্রেন্ডলিস্টে।
 কিন্তু ফেন্ডলিস্ট হাইড করা। এ
রপর ছবিতে ঢুকতেই দুই বোনের একসাথে অনেক ছবি পেয়ে গেল। সব ছবিতেই তিরার ঠোঁটে লম্বা লম্বা হাসি ঝোলানো। কিন্তু আরশির মুখ স্বাভাবিক। বড়জোর হাসি হাসি মুখ। মেয়েটির মুখে হাসি নেই কেন? 
ছবিগুলোয় ট্যাগ করা আরশির আইডিও পেয়ে গেলো, 
আরশি মেহনাজ। আইডিতে ঢুকলো কাব্য। 
এখানেও কোনো হাসিমুখের ছবি নেই। ওই বিষন্ন ছবিগুলোই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল কাব্য। ওই বিষন্ন চোখের অনেক না বলা কথা শুনতে ইচ্ছে করছে কাব্যর। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে গিয়েও নিজেকে থামালো কাব্য। তার মত ছেলের এত অল্পতেই কারো প্রতি এতটা আগ্রহী হওয়া উচিৎ না।




১-হাসির ছোট গল্প
 ২-শিক্ষনীয় ছোট গল্প 
৩-ছোট গল্প ছবি
 ৪-ছোট গল্প status
 ৫-কিশোর ছোট গল্প 
৬-ছোট গল্প পিক 
৭-ছোট গল্প facebook 
৮-মজার হাসির ছোট গল্প




হাসির ছোট গল্প কনফিউশন পর্ব ৪


লেখকঃ মৌরি মরিয়ম
এডমিশন কোচিং এ আজ পরীক্ষা। তিরা ও আরশি দুইবোন রাতজেগে পড়েছে তাই বেলা করে ঘুমুচ্ছিলো। কাজের বুয়া আসায় আবার উঠতে হলো আরশিকে। সব কাজ একে বলে বলে করাতে হয়। নাহলে দেখা যায় ঠিকভাবে করেনি। তিরা এখনো ঘুমে। আরশিরও ঘুম ঘুম লাগছে। ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে সোফায় গা এলিয়ে দিল। এমন সময় কলিং বেল বাজলো। আরশি বারান্দায় গিয়ে কাউকে গেটের সামনে দেখতে পেলো না। ভেতরে এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,
"কে?"
"আমি কাব্য।"
"একটু দাঁড়ান।"
আরশি ঘরে গিয়ে তিরাকে ডাকলো,
"তিরা এই তিরা তাড়াতাড়ি ওঠ। তোর কালা চণ্ডীদাস এসেছে।"
তিরা ঘুমে ভরা চোখ মেলে বলল,
"কে এসেছে?"



"তোর কাব্য। তাড়াতাড়ি ওঠ।"
তিরা লাফিয়ে উঠলো।
"এই অবস্থায় ওর সামনে যাব কী করে! হায় খোদা!"
"তুই তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আয়। আমি দরজা খুলি।"
"বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিস? তাড়াতাড়ি যা দরজা খুলে ওকে বসা।"


তিরা উঠে যতদ্রুত সম্ভব মুখ ধুয়ে, কাপড় পালটে কাজল ও লিপস্টিকে হালকা সাজগোজ করতে লাগলো।
ততক্ষণে আরশি গিয়ে দরজা খুলেছে। 

আরশির এলোমেলো চুল হাত খোঁপায় বাঁধা। কোঁচকানো জামা পড়া। ওড়নার কোণা মেঝে অবধি ঝুলছে। সদ্য ঘুম থেকে ওঠা তেলতেলে ফরসা মুখের বিষন্ন চোখ দুটো ঘুমে জড়িয়ে আছে। এই সবকিছু আচমকাই কাব্যর চোখে স্থিরচিত্র হয়ে আটকে গেলো। 

আরশি যেন নিজ ঘরের কেউ যাকে ঘুম থেকে উঠে দেখলেই প্রশান্তিতে ভরে যায় বুক। আরশির কথায় মোহভঙ্গ হলো কাব্যর,
"ভেতরে আসুন।"
ভেতরে গেলেই হয়তো তিরার সামনে পড়তে হবে তাই কাব্য বলল,
"না না আমি এখানেই ঠিক আছি। আমি আসলে একটা দরকারে এসেছিলাম।"



"দরকারের কথা কি ভেতরে এসে বলা যায় না?"
কাব্য কিছু বলার আগেই আরশির পেছনে এসে হাজির হলো তিরা। বললো,
"হাই কাব্য ভেতরে এসো না। বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলতে হবে কেন?"
প্রতিদিন কথা না হলেও তিরা এতদিনে ফেসবুক চ্যাটিং এ কাব্যর থেকে তুমি বলা আদায় করে নিয়েছে। কাব্য খুব সাবধানে একটা দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে ভেতরে ঢুকলো। কাব্য ও তিরা ড্রয়িং রুমে বসলো, আরশি ভেতরে চলে গেলো। তিরা বললো,
"বলো না কী বলবে।"
"আসলে আমার কাজের লোক দরকার ছিল। ঘর পরিস্কার রাখাটা বড়ই ভেজালের কাজ। তোমাদের বুয়া কি আমার কিছু কাজ করে দেবে? আর করলে কত করে দিতে হবে এইসব জানতে এসেছিলাম।"
"ওহ বাট আই হ্যাভ নো আইডিয়া। আসলে এসব তো ভাবীর ডিপার্টমেন্ট। যেহেতু ভাবী এখন নেই সবকিছু আরশি সামলায়। দাঁড়াও ওকে ডাকি।"
তিরা আরশিকে ডাকতে রান্নাঘরে আসতেই আরশি বললো,
"তিরা ওনার চা নাস্তাটা নিয়ে যা। প্রথমবার আমাদের বাসায় এলো একদম খালি মুখে গেলে কেমন দেখায়।"
"তুই যখন যাচ্ছিস তুই নিয়ে যা না প্লিজ।"
"আমি কেন যাব? পুরো ড্রয়িংরুম সিগারেটের গন্ধে ভরে গেছে। তুই নিয়ে যা।"
তিরা হেসে বললো,
"কিন্তু তোকে যে যেতে হবে। কাব্য সাহায্য চাইতে এসেছে, যে সাহায্য আমার পক্ষে করা সম্ভব না।"
আরশি বিরক্ত মুখে চা নাস্তা নিয়ে ড্রয়িং রুমে গেলো। কাব্য বলল,
"আরে এসব কেন? আমি জাস্ট একটা দরকারে এসেছিলাম।"
আরশি কিছু বললো না। তিরা বললো,
"আরে এটা কি চা? এটা অমৃত! আরশির হাতের চা, খাও খাও নাহয় জীবনের সবচেয়ে বড় মিসটা করে ফেলবে।"
একথা বলে তিরা নিজের কাপটা তুলে নিলো। আরশি চায়ের কাপ কাব্যর হাতে তুলে দিতে দিতে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
"আপনি কি যেন দরকারের কথা বলছিলেন?"
কাব্য আরেকবার আরশিকে কাছ দেখার সুযোগটা
মিস করলো না। আরশি কাব্যর দিকে তাকালো না বলে ব্যাপারটা খেয়াল করলো না। কাব্য বললো,
"আপনাদের কাজের বুয়া কি আমার কিছু কাজ করে দিতে পারবে? যদি পারে তাহলে তাকে কত করে দিতে হবে?"
"ও আচ্ছা। আমাদের এলাকায় ছুটা বুয়াদের এক কাজ ৬০০ টাকা করে। ওনাকে এরকমই দিতে হয়। তবে কাজ করতে পারবে কীনা তা তো জানিনা। উনি এখন এখানেই আছে। আমি জিজ্ঞেস করে আসছি।"
আরশি ভেতরে চলে গেল। কাব্য চায়ে চুমুক দিতেই কোথাও হারিয়ে গেলো। ঘন সুস্বাদু চা। এত সুন্দর চা পাতার ঘ্রাণ আজ অবধি কোথাও পায়নি সে। তিরা বললো,
"তোমার ক্লাস নেই আজ?"
"না আজ অফ ডে।"
"ও আচ্ছা। তুমি অনলাইনে এত ইরেগুলার কেন বলো তো?"
কাব্য হেসে বললো,
"অফলাইনেই অনেক কাজ থাকে। অনলাইনে আসার সময় পাইনা।"
"এত কী কাজ শুনি?"
কাব্য হেসে বলল,
"মুভি দেখা, বই পড়া, রান্না করা কত কাজ!"
"এত বই পড়ে কী হবে?"
"সেটা তো বই পড়লে বুঝতে। এই যেমন ধরো বই পড়লে আজ তুমি দুবছরের বাচ্চা থাকতে না। বয়সের সাথে সাথে বড়ও হতে।"
"ধ্যাত আমি তো বড়ই, পাঁচ ফিট দুই ইঞ্চি।"
"হুম বড় শুধু হাতে পায়ে।"
আরশি বুয়াকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে এসে বললো,
"কী কী কাজ করাবেন কথা বলে নিন। কাল থেকে শুরু করতে পারবে।"
কাব্য বুয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
"ঘর মুছতে হবে আর কাপড় ধুতে হবে। পারবেন?"
বুয়া বললো,
"হ পারমু তয় দুই কামে ২০০০ টেকা দেওন লাগবো।"
কাব্য অবাক হয়ে বললো,
"কেন? এক কাজ ৬০০ হলে দুই কাজ তো ১২০০ হওয়ার কথা।"
বুয়া বললো,
"হ তয় পোলা মাইনষেরা জনমের গিদর হয়। এগোর ঘরবাড়ি জামাকাপড় পরিস্কার করায় কষ্ট বেশি। সময়ও লাগে বেশি, এইল্লিগা টেকাও দেওন লাগবো বেশি।"
তিরা বললো,
"না না বুয়া ও অন্য ছেলেদের মতো না। ওর ঘরবাড়ি খুব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন।"



বুয়া বললো,
"তয় অন্য মানুষ দেখুক।"
আরশি জানে কাজের লোক পাওয়া কত মুশকিল তাই বললো,
"বুয়া আমার কথা শোনেন। সব ছেলেরা তো একরকম না। তাছাড়া উনি একদম একা থাকে। একা মানুষের আর কয়টা কাপড় হয়? আর নীচের ফ্ল্যাটটাও খুব ছোটো, পরিস্কার করতেও সময় কম লাগবে। আপনি বরং কাল ওনার বাসায় কাজ করেন। আপনার যদি মনে হয় কাজ বেশি তবে উনি বাড়িয়ে দেবে। আর যদি মনে হয় কাজ স্বাভাবিক তাহলে ১২০০ ই নেবেন। ঠিকাছে?"
"আইচ্ছা তয় আরশি আফার কথাই থাকলো। কাইলকা কাম কইরা ডিসিসন লমু করমু কিনা। না করলে কাইলকার কামের টেকা কাইলকা দিয়া দিবেন।"
কাব্য কিছু বলার আগেই আরশি বললো,
"আচ্ছা ঠিকাছে।"
বুয়া চলে গেল তার নিজের কাজে। আরশি কাব্যর দিকে তাকিয়ে বললো,
"মেনে নিন। সহজে কাজের লোক পাওয়া যায় না। তবে একদিন কাজ করলে সে আর বাড়তি চাইবে না।"
কাব্য জানতে চাইলো,
"কীভাবে বুঝলেন?"
"আপনার বাসায় তো আর এত কাজ নেই। সে তো ভেবেছে ব্যাচেলর বাসা অনেকজন মিলে থাকেন। বুঝতেই পারছেন।"
"ওহ আচ্ছা।"
আরশি ভেতরে চলে যাচ্ছিলো। কাব্য ডাকলো,
"শুনুন.."
আরশি ঘুরে তাকালো। কাব্য বললো,
"আপনি সত্যি খুব ভালো চা বানান।"
"থ্যাংকস।"
"এটা কি সিলেট থেকে আনা কোনো বিশেষ পাতা দিয়ে বানানো?"
"না এটা মুদি দোকান থেকে কিনে আনা সাধারন কোনো ব্রান্ডের পাতা। কোন ব্রান্ড সেটা এখন মনে নেই।"
"তাহলে চা পাতার এই ঘ্রাণ টা? আমিও ঘন করে চা বানাই কিন্তু এই ঘ্রাণ টা তো থাকে না। যদি কিছু মনে না করেন আমাকে শেখানো যাবে?"
তিরা বললো,
"আরু কাব্যকে চা বানানোটা এবার শিখিয়ে দে। জানো কাব্য ও আমাকে অনেকবার চা বানানো শেখাতে চেয়েছে৷ আমি শিখিনি। শিখলেই তো সবাইকে বানিয়ে খাওয়াতে হবে। কী বিপদ হবে বুঝতে পারছো?"
তিরা কথাটা বলে খিলখিলিয়ে হাসলো। কাব্যও মৃদু হাসলো। আরশি বলল,
"এক কাপ চা বানালে দেড় কাপ পানি বসাবেন। পানি ফুটলে দুই চা চামচ পাতা দেবেন। চুলা কমাবেন না। সর্বোচ্চ আঁচে অল্প সময় জ্বাল দেবেন। দেড় কাপ থেকে আধা কাপ পানি শুকিয়ে এক কাপ হলে নামিয়ে নেবেন। এক কাপ চায়ে দুই চা চামচ গুঁড়ো দুধ আর চিনি নিজের স্বাদমতো দেবেন। চা বেশিক্ষণ জ্বাল দিলে পাতার ঘ্রাণ টা নষ্ট হয়ে যায়। আর অল্পক্ষণ জ্বাল দিলে কাচা পাতার গন্ধ থেকে যায়। তাই জ্বাল দেয়ার সময়ের পারফেকশন টা জরুরি।
"থ্যাংকস। এবার বুঝেছি।"
"ওয়েলকাম। আর আমি আপনার বইটা এখনই ফেরত দিতে পারছি না। সামনে এডমিশন টেস্ট তো তাই অল্প অল্প পড়ছি। ফেরত দিতে দেরী হবে।"
"কোনো সমস্যা নেই। ওটা আমার পড়া বই, এখন আবার পড়ার সম্ভাবনা নেই।"
"ঠিকাছে।"
আরশি ভেতরে চলে গেল। তিরা এবার নানান ধরনের গল্প শুরু করলো। কাব্য কী বলে উঠবে বুঝতে পারছিল না। কাব্য আরশির যত কাছে আসতে চায় আরশি যেন তারচেয়ে বেশি দূরে চলে যায়। তাই আরশির সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য তিরার বন্ধুত্ব দরকার। কিন্তু দিনদিন তিরা যেমন বিপজ্জনক ভাবে আগাচ্ছে তার দিকে তাতে সেফ জোনে থাকাটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। অবশেষে কাব্য সরাসরিই বললো,
"আচ্ছা তিরা আজ তাহলে আমি উঠি। আবার আরেকদিন কথা হবে।"
"এক্ষুণি চলে যাবে মাত্রই তো এলে।"
"বাসায় অনেক কাজ ফেলে এসেছি। একা কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়েই বুয়া খুঁজতে আসলাম। আমার রান্নাবান্না সব বাকী। জানোই তো আমি একদিন রান্না করি তিনদিন খাই। কাল তো ক্লাস আছে রান্নার সময় পাব না। তাই এনিহাও আজকেই করতে হবে।"
"আচ্ছা কাব্য এক কাজ করলে কেমন হয়?"
"কী কাজ?"
"চলো আমি তোমাকে রান্না করে দেই। তোমারও কষ্ট করতে হলো না আর রান্না করতে করতে আমাদেরও গল্প করা হলো।"
"পাগল নাকি তুমি?"
একথা বলে কাব্য উঠে দরজা খুললো। তিরা বললো,
"কেন পাগল কেন হবো?"
কাব্য জোরে হেসে উঠে যেতে যেতে বললো,
"হায়রে মেয়ে! গ্রো আপ দুবছরের বাচ্চা।"
কাব্য সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলো। তিরা দরজায় দাঁড়িয়ে রইলো। সে কাব্যর কথাটা শুনলো কিনা বোঝা গেল না কারণ কাব্যর হাসি দেখলেই সে দিন দুনিয়া ভুলে যায়। একটাই কথা শুধু ভাবতে থাকে, এত সুন্দর করে কেউ কীভাবে হাসে!

Bangla Romantic Story New Confusion Episode - 5


রাতে ঘুমানোর সময় তিরা বললো,
"আরু সাহিল ভাইয়া আমাদের সাথে এমন করছে কেন বল তো।"
"কেমন করছে?"
"এইযে প্রতি উইকেন্ডে বৌয়ের কাছে চলে যাচ্ছে। এতবড় বাড়িতে আমাদের দুই বোনের একা বুঝি ভয় করে না?"
"দুজন মানুষ একা কীভাবে হয়? ওর বৌ প্রেগন্যান্ট। তার কাছে ও যাবে না? বাচ্চার প্রতি সব দায়িত্ব কি শুধুই মায়ের?"
"তাহলে ভাবী গেলো কেন?"
"ভাবীর দেখাশোনা করার কেউ এবাড়িতে নেই বলেই ভাবী ওবাড়িতে গেছে। আমাদের পক্ষে কি সম্ভব সবসময় ভাবীর খেয়াল রাখা?"
"আমাদের বুঝি ভয় করেনা?"
"আমার করেনা।"
"আমার করে।"
আরশি মুখ টিপে হেসে বললো,
"তোর ভয় কী? তোর কালা চণ্ডীদাস তো আছেই।"
তিরা এবার ক্ষেপে গিয়ে বললো,
"তুই কী রেসিস্ট রে আরশি! এভাবে একটা মানুষকে কালো বলে অপমান করছিস!"
"অপমান কেন করব? কালোকে কালো বললে বুঝি অপমান হয়ে যায়?"
"হুহ। ওর চোখ দেখেছিস? আর ওর ঠোঁট? আর ওর হাসি?"
"ওমা পরপুরুষের এতদিকে তাকাবো কেন? আমি ছেলেদের চোখের দিকে তাকাই না। শুধু চোখ কেন ছেলেদের স্পেসিফিক কিছুই আমি দেখিনা তোর মত।"
"জানি জানি দেখলে তো এতদিনে একটা জুটে যেত।"
"আমি জোটাতে চাইনা।"
"হুহ পান্তাভাত একটা। শোন কাব্যর সবকিছু রাজপুত্রের মত। শুধু রঙটাই একটু কালো।"
আরশি হেসে শুয়ে পড়লো। তিরা অনলাইনে ঢুকলো। কাব্যকে যদি একটু পাওয়া যায়। যেভাবেই হোক ফোন নাম্বার নিয়ে নিতে হবে। ছেলেটা অনলাইনে একদম আসেনা।
কাব্য অন্ধকারে বাগানে হাঁটছিলো, অন্ধকার কেন যেন ওর খুব ভালো লাগে। অন্ধকারের একটা নিজস্ব ভাষা আছে, সেই ভাষাটা পড়তে ইচ্ছে করে। আচমকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ভেতরে যেতে যেতে ভিজেই যাবে মনে হচ্ছে হঠাৎ উপর থেকে আসা শব্দ শুনে তাকালো কাব্য। আরশি জানালা লাগাচ্ছে। আরশিকে দেখলেই কেন ভেতরটা ওলট পালট লাগে? কাব্য অন্ধকারে তাই কাব্যকে দেখতে পেলো না আরশি। কিন্তু কাব্য আরশিকে দেখলো। মন ভরে দেখলো। এই মনই পুরোপুরি তাকে আরশির দিকে ঠেলছে। কিন্তু কাব্যর মস্তিষ্কের সাহস হচ্ছেনা সেদিকে আগাতে। কাব্যর কি এই বাসাটা ছেড়ে দেয়া উচিৎ?
বৃষ্টির ছাটা এসে ঘর ভিজিয়ে দিয়েছে। জানালা লাগিয়ে আরশি ঘরের পানিটুকু মুছে ফেললো। নাহয় কখন দেখা যাবে তিরা এই পানির মধ্যে পা পিছলে পড়ে যাবে। আরশি হাত ধুয়ে যখন ঘরে ঢুকলো তিরা আচমকা হাসতে হাসতে বিছানা থেকে মেঝেতে পড়ে গেলো। আরশি দৌড়ে এসে তিরাকে ওঠাতে ওঠাতে বললো,
"আরে কীভাবে পড়ে গেলি তিরা? ব্যাথা পেয়েছিস কোথাও?"
তিরা হাসছে তো হাসছেই কোনো কথা বলতে পারছে না। আরশি এটুকু বুঝতে পারলো যে ব্যাথা পায়নি। ব্যাথা পেলে এভাবে হাসতো না। তিরাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বললো,
"ধুর পাগলের মতো শুধু হাসছেই। তুই হাসতে থাক, আমি ঘুমোলাম।"
তিরা এবার বহুকষ্টে হাসি থামিয়ে বললো,
"এই না না। দেখ কাব্য ফেসবুকে কী স্ট্যাটাস দিয়েছে। ওর স্ট্যাটাস দেখে হাসতে হাসতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিলো।"
আরশি ওড়নায় হাত মুছে মোবাইলটা নিয়ে দেখলো কাব্য স্ট্যাটাস দিয়েছে,
"আপনারা সবাই স্ত্রীগমন করুন, আবহাওয়া ভালো আছে।
শুভ বৃহস্পতিবার!"
আরশি স্ট্যাটাস টা দেখে মোবাইলটা বিছানার উপর ফেলে বললো,
"ছি! অসভ্য! একটা মানুষ কীভাবে পাবলিক প্লেসে এসব কথা বলে? কে কী করবে না করবে সেটা কি ওনাকে জিজ্ঞেস করে করতে হবে?"
"ধুর আরু তুই শুধু শুধু নেগেটিভলি নিচ্ছিস৷ কাব্য তো ফান করে এই পোস্ট টা দিয়েছে।"
"কচুর ফান। শোন তুই আগেরটাকে রিজেক্ট করেছিলি না এক মাস প্রেমের মাথায় রুমডেটে ডেকেছিল বলে? এই অসভ্য ছেলে প্রেমের এক সপ্তাহের মধ্যে রুমে ডাকবে। মিলিয়ে নিস।"
"ধ্যাত কী বলছিস এসব!"
"চুপ থাকবি প্লিজ আম্মা? আমি এখন ঘুমুবো। তোর এই কাব্যগান বন্ধ কর।"
বিছানায় শুয়ে এদিক ওদিক করেও ঘুম আসছিল না আরশির। প্রচন্ড বিরক্ত লাগছিল। একটা মানুষ এতটা অসভ্য হয় কী করে?"



Bangla New Romantic Story 

পর্ব ৬
কাব্য ইচ্ছে করেই চালাকিটা করলো। বাসা ভাড়া দিতে গেলো সাহিল বেরিয়ে যাওয়ার পর। বারান্দা দিয়ে নজর রাখছিল সাহিল কখন বের হয়। যাতে এক উসিলায় দুবার দোতলায় যাওয়া যায়। সাহিল না থাকতে গেলে তিরা বকবক করে আটকাবে, চায়ের উসিলায় আরশিকে দেখা যাবে। আবার ভাড়া দিতে আরেকদিন যেতে পারবে। কিন্তু ভাগ্য খারাপ হলে যা হয় দরজা খুললো তিরা। এতক্ষণ ধরে বকবক করছে আরশির আসার নাম নেই। তিরাও চায়ের কথা তুলছে না। কাব্য বললো,
"আচ্ছা সাহিল ভাইয়া যখন নেই আমি পরে আসব।"
তিরা বললো,
"না না প্লিজ এসেছো যখন একটু থাকো। একা একা একদম ভালো লাগছে না।"
সুযোগ পেয়ে কাব্য জিজ্ঞেস করে ফেললো,
"একা কেন? আরশি কোথায়?"
"আরশি তো বাজারে গেছে। সাহিল ভাইয়া উইকেন্ডে ভাবীর কাছে গিয়েছিলো তো বাজার করতে পারেনি।"
"আরশি একা গেছে? তুমি গেলে না যে সাথে?"
"বুয়া আসবে যে তাই আমি বাসায় রয়েছি। একজনকে তো থাকতে হবে। আমি তো একা গেলে কিছুই কিনতে পারবো না। তাই আরশি গেছে। আরশি একা সব পারে।"
কাব্যর কেমন একটা মায়া হলো। এতো ছোটো বয়সে মেয়েটা সংসারের এতোকিছু শিখে গেছে! পরক্ষণেই খেয়াল হলো বাসায় কাব্য ও তিরা একা। কাব্য কিছুটা বিচলিতবোধ করলো। তিরা একটু পাগলাটে মেয়ে। ওর সাথে একা বাসায় থাকা মানে বিপদ, ভয়াবহ বিপদ। কাব্য বললো,
"তিরা আমার না ক্লাস আছে আজকে। আমাকে যেতে হবে। আরেকদিন কথা হবে।"
একথা বলে তিরাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কাব্য উঠে দরজা খুললো। তিরা বললো,
"তুমি সবসময় এত তাড়া নিয়ে আসো কেন? সময় নিয়ে আসতে পারো না?"
"একদিন সময় নিয়ে আসবো।"
কাব্য তড়তড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলো।
সিগারেটের ধোয়া ওড়াতে ওড়াতে বই পড়ছিলো কাব্য। যেটা ওর সবচেয়ে প্রিয় কাজ। এমন সময় দোতলার কলিং বেলের আওয়াজ পেয়ে কাব্যর মনে হলো আরশি কি এসেছে? বারান্দা দিয়ে উঁকি মারতেই দেখলো আরশি অনেক বাজার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উপরে তাকানো, সম্ভাবত তিরার বারান্দায় আসার অপেক্ষা করছে। আরশি আকাশী রঙের একটা সুতির সালোয়ার কামিজ পরা। কপালে ও নাকে বিন্দুবিন্দু ঘাম জমে আছে, কয়েক ফোঁটা কপাল বেয়ে গড়িয়েও পড়লো। যথারীতি তার চুলগুলো একটা খোঁপা করা। সামনের চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে, সেগুলো কানের পিছনে গুঁজে দিলো।
কাব্য অপলক চোখে আরশিকে দেখছিলো। কারো ঘর্মাক্ত, রোদে পোড়া, পরিশ্রান্ত মুখটাও এত সুন্দর হয়? কাব্যর হাতে সিগারেট ছিলো। অসাবধানে কখন আঙুলে সিগারেটের আগুন লেগে পুড়ে গেলো। ওদিকে আরশি উপরের দিকে তাকিয়ে বললো,
"তিরা নীচে আয় এত বাজার আমি একা উপরে তুলতে পারবো না।"
তিরা উপর থেকে বললো,
"রিক্সাওয়ালাকে বলনা একটু উঠিয়ে দিতে। এক্সট্রা টাকা দিয়ে দিস।"
কাব্য ঝটপট সিগারেটে আরেকটা টান দিয়ে নিভিয়ে ফেললো। এরপর দরজা লক করে বের হলো। আরশিকে পাশ কাটিয়ে গেটের দিকে চলে গিয়ে বাইরে যাবার ভান করলো। আরশি অবশ্য কাব্যর দিকে তাকালোও না। তিরাকে বললো,
"রিক্সাওয়ালা কি আমার জামাই লাগে রে যে আমি বললেই উঠিয়ে দেবে? রাজী হয়নি বলেই তো তোকে ডাকছি। চারটা ব্যাগ আমি কয়বারে তুলবো?।"
তিরা বললো,
"উফ কি যে করিস না তুই আরশি। একসাথে এতোকিছু আনার কি দরকার ছিলো? আমার সুন্দর হাতগুলোয় দাগ পড়ে যাবে না এত ভারী ভারী ব্যাগ তুললে?"
আরশি কিছু বলার আগেই কাব্য গেটের কাছ থেকে ডাকলো,
"আরশি.."
আরশি পেছনে ফিরতেই কাব্য বললো,
"আমি বাজারগুলো উপরে তুলে দেই?"
কাব্য কথা বলতেই চারপাশে সিগারেটের গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো। আরশি অপ্রস্তুত হয়ে বললো,
"না না আমরা দুজনে মিলে তুলে ফেলতে পারবো।"
"কিন্তু তিরা তো আসতে চাচ্ছে না এমনটা শুনলাম। আমি তুলে দেই। গত মাসে তো সাহিল ভাইয়ার সাথেও বাজার তুলেছি উপরে। আমরা তো প্রতিবেশী। বিপদে আপদে একে অপরকে সাহায্য করব এটাই তো স্বাভাবিক।"
আরশির মনে হলো তিরার কষ্ট কমিয়ে দিতে চাইছে কাব্য। বললো,
"ঠিকাছে আপনি যদি পারেন।"
আরশি একটা ব্যাগ নিতে যাচ্ছিল তার আগেই কাব্য সবগুলো ব্যাগ দুহাতে তুলে হাঁটা শুরু করলো। আরশি বললো,
"আরে কী করছেন আপনি দুটো নিন, আমি দুটো নিই।"
"এটুকু ওজন আবার দুভাগ করতে হবে? আসুন তো আপনি।"
কাব্য তড়তড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো। আরশি গেলো পেছন পেছন। ততক্ষণে তিরা নামতে যাচ্ছিলো। কাব্যকে বাজার নিয়ে উঠতে দেখে বললো,
"হাও সুইট!"
কাব্য তিরার কথায় হেসে দিলো। বাজারগুলো নামিয়ে রেখে দ্রুত বেরিয়ে আসছিলো, আবার তিরার বকবকানির চাপে পড়ার ভয়ে। হঠাৎ আরশি বললো,
"চা খেয়ে যান?"
কাব্য একথা শুনে খুব অবাক হলো। আরশি নিজ থেকে ওকে ডাকছে? এটাও কি সম্ভব? আজ অবধি একবার তো তাকালোও না! তিরা বলে উঠলো,
"হ্যাঁ হ্যাঁ প্লিজ চা খেয়ে যাও।"
কাব্য পেছনে ফিরে বললো,
"চা সিগারেটে কখনো না করতে পারিনা!"
আরশি বললো,
"ভেতরে আসুন।"
একথা বলে নিজে ভেতরে চলে গেলো চা বানাতে। কাব্য ভেতরে ঢুকে ড্রয়িং রুমে বসলো। তিরা টিভি দেখছিলো, টিভিতে বিজ্ঞাপন হচ্ছে। কাব্য জিজ্ঞেস করলো,
"কি দেখছো?"
"নাথিং একা বোর লাগছিল তাই বিজ্ঞাপন দেখছিলাম। আমার আবার বিজ্ঞাপন দেখতে খুব ভালো লাগে।"
"ওহ আচ্ছা।"
"আচ্ছা কাব্য আমাকে কিছু ছবি তুলে দাওনা। সেদিন ফেসবুকে তোমার ফটোগ্রাফি দেখলাম।"
"আমি তো মানুষের ছবি তুলিনা। প্রকৃতির ছবি তুলি।"
"এবার তুলবে। আউটডোর ফটোশ্যুট করবো। আমাদের দুই বোনের ছবি তুললে তোমার জাত যাবে না। আমরা প্রকৃতির মতই সুন্দর।"
কাব্য খানিক অবাক হলো তিরা আরশিকে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে? আর আরশিও কি সত্যিই যাবে? বললো,
"কোথায় ফটোশ্যুট করতে চাও?"
"প্লেস তুমি ঠিক করো। সকালে গিয়ে সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে আসা যায় এমন কোথাও। আমাদের সব এডমিশন টেস্ট মাত্রই শেষ হলো। এখন যেখানেই যাই সাহিল ভাইয়া কিছু বলবে না।"
"বাসা ফাঁকা রেখে সবাই মিলে গেলে কীভাবে হবে?"
"আরে না আমরা সবাই মিলে যখন কোথাও যাই তখন ছোটো মামার বাসা থেকে কেউ এসে থাকে। বাম পাশের বাসাটা আমার ছোটো মামার।"
"ওহ আচ্ছা। ঠিকাছে কবে যেতে চাও জানাও যদি টাইমিং মিলে যায় তাহলে যাবো।"
কাব্য এভাবে বললো কারণ শেষে যদি আরশি না যায় তবে ও যাবে না। আর আরশি যদি যায় তাহলে তো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি!
টিভিতে তখন একটা সিনেমা শুরু হতে যাচ্ছিলো। তার আগে সিগারেট বিরোধী একটা শর্টফিল্ম দেখালো যেখানে বলা হচ্ছে, সিগারেট যৌন ক্ষমতা কমায়। তিরা কাব্যকে বললো,
"দেখেছো কতবড় ক্ষতি করছো নিজের। এবার সিগারেট টা ছেড়ে দাও।"
আরশি চা নিয়ে আসছিলো। ওদের কথার বিষয়বস্তু শুনে লজ্জা পেয়ে ফিরে এসে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়ালো। ওদের এই বিষয়ে কথা বলা শেষ হলে যাবে বলে। কাব্য তখন পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করলো। প্যাকেটের গায়ে লেখা, 'ধুমপান হৃদরোগের কারণ'। কাব্য তিরাকে প্যাকেট দেখিয়ে হেসে বললো,
"আমি যে সিগারেট খাই সেটা খেলে হৃদরোগ হয়। সুতরাং আমার চিন্তা নেই। যৌন ক্ষমতা কমার চেয়ে হৃদরোগ হওয়া ভাল।"
তিরা কাব্যর এই রসিকতায় খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। এদিকে আরশিরও হাসি পেয়ে গেলো। লোকটা কতবড় অসভ্য!





কনফিউশন লেখকঃ মৌরি মরিয়ম পর্ব ৭

আরশি খানিক জিরিয়ে নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকছিলো। তিরা বাধা দিয়ে বললো,
"একী তুই এখন রান্নাঘরে কেন যাচ্ছিস?"
"রান্না করতে যাচ্ছি।"
তিরা হাসি হাসি মুখ করে বললো,
"তুই বাজার থেকে এতো কষ্ট করে এলি। তুই রেস্ট নে। আজকের রান্না আমি করবো।"
আরশি অবাক হয়ে বললো,
"কে করবে?"
"কেন আমি।"
"আজ সূর্য কোন দিকে উঠেছে?"
"ধ্যাত! আমি কি একটা দিন আমার ভাইবোনকে রান্না করে খাওয়াতে পারি না?"
"পারিস কিন্তু ইতিপূর্বে এই ঘটনা কখনো ঘটেনি তো তাই হজম করতে কষ্ট হচ্ছে!
" তুই চুপচাপ বসে থাক। আজ রান্না আমি করবো।"
তিরা চলে গেলো রান্না করতে। আরশির হাতে কোনো কাজ ছিলো না তাই 'ফ্রিডম এট মিডনাইট' বইটি পড়তে বসলো। পরীক্ষা ছিলো বলে বইটি এর আগে দু এক পাতা করে পড়েছে। এখন থেকে একদম মন ভরে পড়তে পারবে।
কাব্য মোটামুটি চিন্তায় পড়ে গেছে। এতদিন তার আরশিকে দেখতে ভালো লাগতো তাই দেখতো। কিন্তু আজ তাকে দেখার পর থেকে মনে হচ্ছে এটা শুধুই ভালোলাগা না। সে বাঁধা পড়ে যাচ্ছে আরশিতে। সারাদিন শুধু আরশির ভাবনাই ঘুরে ফিরে আসছে। আরশি কি তাহলে ভালো লাগার চেয়েও বেশিকিছু? কিন্তু আরশির তো তার প্রতি কোনো আগ্রহই নেই। অবশ্য থাকার কথাও না যেহেতু আরশি জানে তার বোন কাব্যর ব্যাপারে বিশেষভাবে আগ্রহী। বোন যাকে পছন্দ করে আরশির মতো মেয়ে তার দিকে ফিরেও তাকাবে না এটাই তো স্বাভাবিক। তাই তার প্রতি তিরার আগ্রহটা কমাতে হবে। তিরাকে যেভাবেই হোক বুঝিয়ে দিতে হবে কাব্য তার ব্যাপারে আগ্রহী নয়।
দুপুরে খেতে বসে আরশি তিরাকে বললো,
"কোত্থেকে শিখলি এতো ভালো রান্না?"
তিরা খুশি হয়ে বললো,
"সত্যি ভালো হয়েছে?"
"হ্যাঁ।"
"নাকি আমাকে খুশি করার জন্য বলছিস?"
"আরে না। সত্যি ভালো হয়েছে। এর আগে কখনো ভালো হয়েছে বলেছি?"
তিরা হেসে বললো,
"না।"
"আমি শুধু শুধু মিথ্যে বলিনা।"
"তা অবশ্য আমি জানি।"
"আচ্ছা তিরা এক কাজ করলে কেমন হয়?"
"কী কাজ?"
"চল আমরা ভাবীকে একবার দেখে আসি৷ গতমাসে তো পড়া পড়া করে একবারও যেতে পারলাম না।"
"চল কবে যাবি?"
"কাল সকাল সকাল চলে যাব। সারাদিন ভাবীর কাছে থেকে রাতে ফিরে আসবো।"
"আচ্ছা।"
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। একসময় তিরা বললো,
"আরু আমার একটা আবদার আছে। তোকে পূরণ করতেই হবে। মানে কোনোভাবে না করা যাবে না।"
"ও আচ্ছা! আজকের এই রান্নাবান্না তাহলে ঘুষ ছিলো?"
"হ্যাঁ।"
আরশি হেসে বললো,
"আচ্ছা বল কি কথা। সাধ্যের মধ্যে হলে আমার ছোট্ট বোনের আবদার অবশ্যই পূরণ করবো।"
"তোর সাধ্যের মধ্যেই।"
"আচ্ছা তো বল।"
"আমি আর তুই একটা ফটোশ্যুটে যাবো।"
"ধুর এইসব ছবি টবি তুলতে আমার একদম ভালো লাগেনা তিরা।"
"যাবিনা?"
"সাথে যেতে পারি তবে আমাকে ছবি তোলার জন্য জ্বালাবি না। তুই তুলিস।"
"থ্যাংকস আরু আমি জানতাম তুই আমার কথা ফেলতে পারবি না।"
"কোথায় যাবি ছবি তুলতে?"
"সেটা কাব্য ঠিক করবে।"
"ফটোগ্রাফার কি তোর কালা চণ্ডীদাস?"
"হ্যাঁ। দারুন ছবি তোলে কাব্য।"
"আমি যাবো না।"
তিরা অবাক হয়ে বললো,
"মাত্র না বললি যাবি?"
"তুই তো আগে বলিসনি যে ওই লোকিটার সাথে ছবি তুলতে যাবি।"
"তুই বারবার লোকটা লোকটা বলিস কেন? ওকে তো দেখতে আমাদের বয়সীই লাগে। বয়স তো জানিনা কিন্তু পড়াশুনার হিসেবে ও আমাদের থেকে ৩ বছরের বড় মাত্র।"
"সাড়ে তিন বছর হবে।"
"হোক। তুই ওকে আর একবারও লোকটা বলবি না খবরদার বলে দিচ্ছি।"
"আচ্ছা। আমি জানতাম না ওনার সাথে যাচ্ছিস তাই রাজী হয়েছিলাম। ওনার সাথে আমি কোথাও যাবো না।"
"কেন? ও কি তোকে খেয়ে ফেলবে?"
"না আমি যাব না কারণ ওনাকে আমি অপছন্দ করি।"
"অপছন্দ করার কারণ?"
"প্রথমত, সিগারেটের গন্ধ আমি সহ্য করতে পারি না। বেশিক্ষণ এই গন্ধের মধ্যে থাকলে আমার মাথাব্যথা হবে। তুই ভালো করেই জানিস আমার মাইগ্রেন আছে।"
"এর সমাধান আছে তুই দূরে দূরে থাকবি। আর কোনো কারণ আছে?"
"আছে। দ্বিতীয়ত, উনি প্রচন্ড অসভ্য। এতো অসভ্যতা তুই তো হেসে উড়িয়ে দিস কিন্তু আমি হজম করতে পারিনা।"
"ছেলেরা তো একটু অসভ্য হবেই। নাহলে সে ছেলে বোরিং।"
"এজন্যই আমি ছেলেদের সাথে মিশি না।"
"আচ্ছা ধর তোর এরেঞ্জ ম্যারেজ হলো। তোর স্বামী কাব্যর চেয়ে বেশি সিগারেট খায়। কাব্যর চেয়েও বেশি অসভ্য, তখন তুই কী করবি?"
"এরকমটা হওয়ার চান্স নেই কারণ আমি সব জেনেশুনেই বিয়ে করবো।"
"হাহ। এতো কথা আমি জানিনা। আমার সাথে যেতে হবে ব্যাস। আমি একা যেতে পারবো না ওর সাথে।"
"একা যেতে পারবি না কেন? তুই কি বাসরঘরেও ওর সাথে আমাকে নিয়ে যাবি?"
"ধুর কয়দিন টেকে তার নাই ঠিক আর তুই আছিস বাসরঘর নিয়ে!"
"তুই সেদিন বিধবা হওয়ার কথা চিন্তা করলি যখন আমি তোর বাসরঘরের কথা চিন্তা করলে সেটা খুব একটা বেশিকিছু না।"
"এত কথা শুনতে চাইনা আরশি। আমি ছবি তুলতে যাবো তোর আমার সাথে যেতে হবে।"
"আমি যাবো না।"
"তুই যাবি।"
"আমি যাবো না। তুই ভালো করেই জানিস আমি এক কথা একবার না বলে দিলে তা আর হ্যাঁ হয়না।"
তিরা হতাশ হয়ে তাকিয়ে রইলো। আরশি চুপচাপ খেতে লাগলো।
তিরা ও আরশিকে দেখে খুশিতে লাফিয়ে উঠলো রশ্নি। দুজনকে একসাথে জড়িয়ে ধরে বললো,
"তোরা আসবি বললি না যে?"
তিরা বললো,
"সারপ্রাইজ!"
আরশি বললো,
"কেমন আছো ভাবী আম্মু?"
"ভালো। তোদেরকে খুব মিস করছি। অনেক কষ্ট হচ্ছে না তোদের?"
তিরা বললো,
"কষ্ট কোত্থেকে হবে? তোমার মত আরেকজনকে যে রেখে এসেছো। আরশি ঠিক তোমার মতো করেই সংসারটা সামলায় জানো?"
রশ্নি আরশির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো
"তাতো হবেই। বাচ্চাটা কত লক্ষী।"
আরশি হাসলো। তিরা বললো,
"ওকে আর বাচ্চা বলোনা৷ এই বয়সেই সে বুড়ো হয়ে গেছে। একটা ফটোশ্যুটে যেতে বললাম। তার সেকী ভাব সে যাবেই না।"
"ওমা কেন আরশি যাবিনা কেন?"
"ওর কালা চণ্ডীদাসের সাথে ও যাক। আমি কেন যাবো?"
ভাবী অবাক হয়ে বললো,
"কালা চণ্ডীদাস টা কে আবার? তিরার বয়ফ্রেন্ড না কতো ফরসা।"
আরশি হেসে বললো,
"ওটা কবেই বাদ!"
রশ্নি হেসে বললো,
"এ আবার কে?"
তিরা বললো,
"ভাবী তুমি আরশির কথায় নাচছো? কাজটা কি ঠিক হচ্ছে?"
"আচ্ছা সরি সরি ছেলেটা কে?"
"তুমি চেনো তাকে।"
"আমি চিনি! কে?"
"আমাদের নীচতলায় যে ভাড়াটে এসেছে সে।"
"ওমা কাব্য!"
"হ্যাঁ।"
"ছি ছি আরশি কাব্যকে তুই এভাবে পছাচ্ছিস? কতো সুইট একটা ছেলে!"
আরশি বললো,
"কীভাবে সুইট বলো এতো সিগারেট খায় যে আমার ওনাকে দেখলে ঘেন্না লাগে।"
রশ্নি হেসে বললো,
"হ্যাঁ তা একটু সিগারেট বেশি খায়। তবে ছেলেটা সত্যি ভালো। মনে নেই তোর ভাইয়া আর আমি যে সেইন্ট মার্টিনস আইল্যান্ড গেলাম? তখন কক্সবাজারে যতদিন ছিলাম ওদের বাসায়ই তো থাকতে হলো। তখনই কাব্যর সাথে পরিচয়।"
তিরা বললো,
"দেখেছিস ভাবী ঠিক চিনেছে ওকে। আর তুই হুদাই ওকে খারাপ প্রমাণ করার চেষ্টা করিস সবসময়।"
"খারাপ প্রমাণ করার চেষ্টা করবো কেন ও কি আমার শত্রু? আমার যা মনে হয় আমি শুধু তাই বলি।"
রশ্নি বললো,
"তবে তিরা ছেলে সিগারেট কিন্তু সত্যিই বেশি খায়। এক সন্ধ্যার এক্সাম্পল দেই শোন। আমরা বীচে যাব। আমি, সাহিল, অনন্ত, অনন্তর বৌ, কাব্য আর কাব্যর ছোটো ভাই অর্নব এই কয়জন বেরিয়েছি। অনন্ত গাড়ি বের করছে। গাড়িতে ওঠার আগে কাব্য বলে কি তোমরা ওঠো আমি একটা সিগারেট খেয়ে নিই, গাড়িতে উঠলে তো আর খেতে পারবো না। এরপর সিগারেট খেয়ে উঠলো। বীচে যেতে জাস্ট ১৫ মিনিট লেগেছে, গাড়ি থেকে নেমে আবার সিগারেট খেলো। আমরা এক ঘন্টা ডেক চেয়ারে বসে কাটালাম। আমি গুনেছি সে ওই এক ঘন্টায় ৫ টা সিগারেট খেয়েছে। এরপর গেছি কাঁকড়া খেতে। কাব্য বলে, তোমরা বসো অর্ডার দাও আমি একটা সিগারেট খেয়ে আসি। এরপর সিগারেট খেয়ে এসে কাঁকড়া খেলো। কাঁকড়া খেয়ে বেরিয়ে আবার সিগারেট খেলো। এরপর আমরা বার্মিজ মার্কেট ঘুরলাম, কেনাকাটা করলাম ততক্ষণে আরো দুটো খেলো। এরপর হেঁটে গাড়ি পর্যন্ত গেলাম তখন আবার বলে, তোমরা ওঠো আমি একটা সিগারেট খেয়ে নিই। বুঝতে পারছিস এক সন্ধ্যায় সে কতগুলো সিগারেট খেয়েছে?"
তিরা চোখ বড় বড় করে বললো,
"ও ভাবী তাহলে তো সত্যিই বিপদ!"
"কীসের বিপদ? কচুর বিপদ। কাব্য কত দারুণ একটা ছেলে জানিস? আর ওর ফ্যামিলির মতো ফ্যামিলি সব মেয়ের স্বপ্ন। কাব্যর মা যে কতো অসাধারণ তুই কল্পনাও করতে পারবি না। এমন শাশুড়ী পেলে জীবন ধন্য হয়ে যাবে যেকোনো মেয়ের। দুদিন থেকে আমি মায়ায় পড়ে গেছি। ওই সিগারেট একটা সমস্যা হলো? ছাড়িয়ে ফেলবি। সিগারেট খেলে চুমু খেতে দিবিনা। ব্যাস সিগারেট ও ছাড়বে ওর বাপ ছাড়বে।"
আরশি হেসে ফেললো। তিরার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। বললো,
"ভাবী এইজন্যই আমি তোমাকে এতো ভালোবাসি। এইসব বুদ্ধি আমার মাথায় জীবনেও আসবে না।"
এরপর আরশিকে দেখিয়ে তিরা আবার বললো,
"আর তোমার এই বুড়ী বোরিং ননদের মাথায় তো আরো এসব বুদ্ধি আসবে না। ও এতদিন আমাকে শুধু ভয় দেখিয়েছে কাব্যর সিগারেট খাওয়া নিয়ে। ভালোবাসার কিচ্ছু বোঝেনা ও।"
রশ্নি আরশিকে টেনে বুকে নিয়ে তিরার দিকে তাকিয়ে বললো,
"এই এই খবরদার আমার ননদকে বুড়ী বোরিং বলবিনা। আমার ননদ যেমন আছে তেমনই খুব ভালো আছে। একদিন এক রাজপুত্র এসে ওকে ভালোবাসা বোঝাবে। তখন ও সব বুঝবে।"
তিরা গাল ফুলিয়ে বললো,
"ও এখন আমি পর হয় গেলাম।"
রশ্নি বুকের আরেক পাশে তিরাকে টেনে নিয়ে বললো,
"না তো। তুইও তো আমার ননদ। আমার তিরিং বিরিং ননদ।"



বাংলা ভালবাসার গল্প, দুঃখের গল্প পর্ব ৮


রাতের বেলা আরশি ও তিরা বাড়ি ফিরলো। গেটের সামনে নামতেই দেখতে পেলো কাব্য গেটের ভেতরে, গেটে তালা দিচ্ছে। তিরা বললো,
"কাব্য তালা দিও না।"
কাব্য তাকাতেই দুই বোনকে দেখতে পেলো। আরশি ভাড়া দিচ্ছিলো। তিরা গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কাব্য ওদেরকে দেখে আবার তালাটা খুলে দিলো। কাব্য জিজ্ঞেস করলো,
"কোত্থেকে এলে?"
তিরা বললো,
"ভাবীকে দেখতে গিয়েছিলাম। তুমি কোত্থেকে এলে?"
"অফিস থেকে। রশ্নি ভাবী কেমন আছে?"
"খুব ভালো আছে।"
"ভাবীর তো বোধহয় ডেলিভারির সময় হয়ে এসেছে তাই না?"
"আর দুমাস বাকী।"
কাব্য ও তিরা গেটের সামনে দাঁড়িয়েই কথা বলছিলো। আরশি ঢুকে যখন তালা দিচ্ছিলো, কাব্য অবাক হয়ে দেখতে লাগলো আরশিকে। ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ী বেড়াতে গেলেও কেউ এভাবে যায়? ভাল জামা পড়েছে ঠিকাছে কিন্তু কোনো সাজগোজ নেই? এইতো তিরা কত সুন্দর সেজেগুজে আছে। সাজলে তো মেয়েদের সুন্দর লাগে তাহলে আরশির কেন নিজেকে সুন্দর করার কোনো চেষ্টা নেই? তাও ভাগ্য ভালো চুলটা খোঁপা থেকে ঝুটিতে নেমেছে। কিন্তু বাকীসব এমন কেন? এত সুন্দর ঠোঁটে একটু লিপস্টিক অন্তত দিতে পারতো? লিপস্টিকেরা ধন্য হয়ে যেতো! ওই কাকচক্ষু জ্বলের দিঘির মত চোখে একটু কাজলের ছোঁয়া তো লাগাতে পারতো। কাজলেরা ধন্য হয়ে যেতো! পরক্ষণেই কাব্য ভাবলো ভালো হয়েছে আরশি সাজেনা। সাজলে তো আর নিজেকে রক্ষা করা যেতো না। এমনিতেই প্রতিবার দেখায় কেমন অস্থির অস্থির লাগে!
আরশি তালা লাগিয়ে আর অপেক্ষা করলো না। জানে তিরা এখন কাব্যর সাথে কথা বলবে তাই একাই উপরে চলে গেলো। কাব্য নিরাশ হলো। দাঁড়িয়েছিল কার জন্য আর হলো কী! কাব্য নিজের ফ্ল্যাটের দিকে যেতে যেতে বললো,
"কী ব্যাপার দাঁড়িয়ে আছো যে? উপরে যাবে না?"
কাব্যর ফ্ল্যাটের সামনে থেকেই দোতলায় যাওয়ার সিঁড়ি শুরু হয়েছে। তিরাও কাব্যর সাথে সিঁড়ি পর্যন্ত গেলো। তারপর বললো,
"খুব খারাপ একটা খবর আছে কাব্য।"
"কী খবর?"
"আমাদের ফটোশ্যুটে যাওয়া হচ্ছে না।"
"কেন?"
"আরশি যেতে চাচ্ছে না।"
নীরবে স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লো কাব্য। আরশি যাবে না সেটা খারাপ খবর বটে। তবে তারচেয়ে ভালো খবর হচ্ছে আরশি যাবে না বলে যাওয়াটাই ক্যান্সেল হলো। তিরার সাথে একা না যাওয়ার জন্য এখন অজুহাত তৈরি করতে হবে না। কাব্য জিজ্ঞেস করলো,
"আরশি যাবে না কেন?"
"বোরিং মেয়েটা কোথাও যায় নাকি? আজকাল এমন মেয়ে দুনিয়াতে আছে বলো যার কিনা ছবি তুলতে ভালো লাগে না? আর কেউ না থাকলেও আমাদের আরশি আছে। ওর ছবি তুলতে ভালো লাগে না। বললাম যে ঠিকাছে তোর তুলতে হবে না তুই আমার সাথে চল শুধু তাও যাবেনা, যত্তসব! আরে বাবা সিগারেট কি দুনিয়াতে তুমি একা খাও? কত মানুষই তো খাচ্ছে। আরশি প্রতিদিন যে বাতাস গ্রহণ করছে সেই বাতাস কি সিগারেটের ধোয়ামুক্ত নাকি?"
কাব্য কিছুটা ভয় পেয়ে বললো,
"কেন আরশির কি সিগারেটে কোনো সমস্যা আছে?"
"হ্যাঁ ওতো সিগারেটের গন্ধ সহ্যই করতে পারে না। বেশিক্ষণ এই গন্ধের মধ্যে থাকলে বা ওর পাশে বসে কেউ সিগারেট খেলে ওর মাথাব্যথা হয়, মাইগ্রেনের ব্যথা। মাইগ্রেনের ব্যথা মাঝেমাঝে এমন প্রকট হয় যে আরু বমি করে দেয়।"
কাব্যর নিজেকে সাঁতার না জানা জলে পড়া কোনো প্রাণীর মত মনে হলো। প্রচন্ড হতাশ হলো। বললো,
"ও আচ্ছা। ঠিকাছে তুমি উপরে যাও তিরা। সারাদিন অফিস করে এসেছি তো, প্রচন্ড টায়ার্ড এখন আমি। ভেতরে গিয়ে রেস্ট নিই।"
"আচ্ছা কিন্তু বলো রাতে ফোন করলে বিরক্ত হবে না তো?"
কাব্য কাচুমাচু হয়ে বললো,
"আজ না তিরা। আমি প্রচন্ড টায়ার্ড। কাল কথা হবে।"
তিরা মন খারাপ করে বললো,
"ওকে।"
পরক্ষণেই তিরা দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে বললো,
"এই কাব্য চিকেন খাবে? আমি নিজ হাতে রান্না করেছি।"
"নাহ আমি ডিনার করে এসেছি। আরেকদিন খাবো।"
"ওকে।"
তিরা উপরে চলে গেলে কাব্য ভেতরে ঢুকলো। লাইট ফ্যান চালিয়ে ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেললো। মোবাইল, সিগারেটের প্যাকেট ও লাইটার সেন্টার টেবিলের উপর রেখে ধুপ করে বসে পড়লো সোফায়। শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে ভাবতে লাগলো, তার মানে আরশি ও তার মাঝে বিশাল এক বাধা হয়ে দাঁড়াবে তার প্রাণের সিগারেট! ওকে পেতে হলে সিগারেট ছাড়তে হবে? সাথে সাথেই কাব্য ব্যথাতুর চোখে তাকালো সিগারেটের প্যাকেটের দিকে। প্যাকেট টি যেন কথা বলে উঠলো,
"ছি কাব্য এতো বছর ধরে আমি তোর সঙ্গী। তোর স্কুলের টিচারের বেতের বারি, বাবার বেল্টের বারি, মায়ের ডালঘুটনির বারি, দাদীর ঝাটার বারি, কোনোকিছুই আমাকে তোর থেকে আলাদা করতে পারলো না। আর আজ সামান্য একটা মেয়ের জন্য তুই আমাকে ছাড়ার কথাও ভেবে ফেলেছিস? এত পাষান তুই?"

বাংলা ছোট চটি গল্প 


কাব্যর বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠলো। প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালো। মাথাটা খানিক ঠান্ডা হলো। এবার মাথাটা কাজ করতে লাগলো। আরশি অনেক ভালো অনেক লক্ষী একটা মেয়ে। ওর মতো হারামী আরশির যোগ্য না। তাছাড়া এমনও হতে পারে আরশি ওর সাময়িক মোহ। সুতরাং এতো বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। কাব্য এখন থেকে দোয়া করবে আরশি যেন আরশির মতোই একটা লক্ষী ছেলে পেয়ে যায়। প্রয়োজনে সাহিল ভাইয়ার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সে নিজে ছেলে খুঁজবে আরশির জন্য। তবে হ্যাঁ আরশির বিষন্নতার কারণ তো তাকে জানতেই হবে। বন্ধু হিসেবে নাহয় জেনে নেয়া যাবে কোনো একদিন। কিন্তু আরশি তো ওর বন্ধুও হবে না। এক কাপ চা হাতে ধরিয়ে সবসময় ভেতরে চলে গেছে। একসাথে বসে এক কাপ চাও কোনোদিন খায়নি। কারণটা এতদিন না বুঝলেও আজ বুঝতে পারছে। আচ্ছা তাহলে নাহয় বড় ভাই হিসেবে.. নাউজুবিল্লাহ সে আর যাই হোক আরশির বড় ভাই হতে পারবে না। এটা ভাবনাতেও অসম্ভব। সে নাহয় ভাইয়ের বন্ধুর ছোটোভাই বা প্রতিবেশী হিসেবেই একদিন জেনে নেবে ওই স্নিগ্ধ মুখের বিষন্নতার কারণ। ওটা তাকে জানতেই হবে! ফ্রেশ হয়ে রান্না বসাতে গেলো কাব্য। নাহয় খিদেয় পেট লেগে যাবে পিঠের সাথে।
রাত বেশি হয়নি কিন্তু ক্লান্ত থাকায় তিরা ঘুমিয়ে পড়েছে। আরশি তখনো 'ফ্রিডম এট মিডনাইট' বইটি পড়ছিলো। পৃষ্ঠা ওলটাতেই একটা কাগজের বুকমার্ক পেলো। বুকমার্কটি হাতে বানানো। মজার ব্যাপার হচ্ছে বুকমার্কটিতে কিছু লেখা রয়েছে। আরশি আগ্রহ নিয়ে লেখাগুলো পড়লো। বইয়ের ওই পাতায় যে অংশটুকু আছে তা পড়ে কাব্য নিজের অনুভূতিগুলো বুকমার্কের উপরে লিখেছে। কাব্যর অনুভূতিগুলো আরশিকে অন্যভাবে ভাবতে শেখালো। দারুণ লাগলো ব্যাপারটা। আরশি তো এভাবে ভাবেনি। ধীরে ধীরে আরশি পরবর্তী পাতাগুলো চেক করলো। মাঝেমাঝেই এরকম বুকমার্ক দেয়া। সবগুলোতেই কিছু না কিছু লেখা। আরশি অন্য বুকমার্কগুলো আগেই পড়লো না। কাহিনীর সাথে না পড়লে মজা পাওয়া যাবে না। তাই তুমুল আগ্রহ নিয়ে বইটি পড়তে লাগলো পরবর্তী বুকমার্কের অপেক্ষায়, সেটাতে কি লেখা আছে তা পড়ার জন্য।
আরশির যখন বইটি পড়া শেষ হলো তখন সকাল ৭ টা বাজে। তিরা তখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। রশ্নি বাবার বাড়িতে যাওয়ার পর থেকে সাহিল সাধারণত বাইরে নাস্তা করে। কিন্তু আরশি ভাবলো জেগে যখন আছে আজ সাহিলের জন্য নাস্তা বানাবে। আরশি উঠে নাস্তা বানিয়ে টেবিলে দিয়ে সাহিলকে ডাকলো খেতে আসতে। সাহিল অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছিলো। আরশি নাস্তা বানিয়েছে শুনে বললো,
"তুই কষ্ট করে নাস্তা বানাতে গেলি কেন? অফিসের ক্যান্টিন থেকে তো প্রতিদিন খেয়ে নিই।"
"আজ জেগে ছিলাম ভাইয়া। তাই ভাবলাম বানিয়ে ফেলি।"
"আচ্ছা কষ্ট করে বানিয়েছিস যখন তখন খেয়েই ফেলি চল।"
খেতে বসে সাহিল জিজ্ঞেস করলো,
"ভাবীকে কেমন দেখলি?"
"ভালোই তবে মনে হচ্ছে ভাবী আমাদের নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা করে। আমি বুঝিয়ে বলেছি যে আমরা ভালো আছি। কতটুকু বুঝেছে তা অবশ্য জানিনা। তুমিও একটু বুঝিয়ে বলো।"
সাহিল খেতে খেতে বললো,
"বলেছি কাজ হয়না। যতদিন না সে নিজে আসছে ততদিন নিশ্চিন্ত হবে না। বাদ দে। পরীক্ষা তো শেষ এখন তিরার সাথে যাবি নাকি খুলনা?"
"কেন?"
"ঘুরতে।"
"না।"
"কেন? ফুপী বারবার বলছিল তোকে যাতে তিরার সাথে পাঠিয়ে দেই।"
আরশি নিজের প্লেটে খাবার নিতে নিতে বললো,
"ফুপী আমাকেও বলেছে তবে ভাইয়া আমার কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। আমি এ বাড়িতেই বেশ আছি। এখানেই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে। আমি কোথাও যাবো না।"
আরশি খেতে শুরু করলো। সাহিল কিছুক্ষণ অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো বোনের দিকে। কি করলে যে আরশি একটু খুশি হবে তা বুঝে উঠতে পারে না সে। কোনো কিছুতেই আরশি পুলকিত হয়না, বিচলিতবোধ করে না। কোনো কিছুই যেন ওকে ছুঁতে পারে না। আরশি কি আর কখনোই স্বাভাবিক হবে না?
সাহিল চলে গেলে আরশি তিরাকে ডাকলো। কিন্তু তিরার ওঠার নাম নেই। আরশি বিছানার উপর পড়ে থাকা বইটা খুলে বুকমার্কগুলো আবার পড়লো। ব্যাপারটা দারুণ ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে তার কাছে। বুকমার্কগুলো যখন আবার গুছিয়ে রাখছিলো তখন একটি বুকমার্ক সে খুঁজে পেলো না যেটা তার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছিলো। হন্যে হয়ে বিছানা, বালিশ, খাটের নীচ সব জায়গায় খুঁজে ফেললো কিন্তু কোথাও পেলো না। এটা কোনো কাজ হলো? কারো এত সুন্দর সৃষ্টি এভাবে হারিয়ে ফেললো সে? এত দায়িত্বজ্ঞানহীন তো সে নয় তবে কীভাবে জিনিসটা হারিয়ে ফেললো! বইটা আজ ফেরত দিয়ে দেবে আর আজই এমন একটা ঘটনা ঘটলো! এরপর আর বই ধার আনার মত মুখ থাকবে না তার।
নিচে ঘুটঘুট শব্দ শুনে আরশি বুঝতে পারলো কাব্য জেগেছে। ঘড়িতে বাজে ৯ টা। খুব বেশি সকাল নয়। এখন একজন মানুষকে ফোন দেয়াই যায়। ফোন দিয়ে মাফ চেয়ে নেয়া উচিৎ। নাহয় বই ফেরত দেয়ার সময় খুব লজ্জা লাগবে। আরশি তিরাকে ডাকলো। তিরার ওঠার নাম নেই। বাধ্য হয়ে নিজেই তিরার মোবাইল থেকে কাব্যকে কল করলো। কিন্তু তিরার মোবাইলে ব্যালেন্স না থাকায় কল গেলো না। এবার নিজের মোবাইলে নাম্বারটা তুলে ডায়াল করলো। কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর ফোন ধরলো কাব্য,
"হ্যালো আসসালামু ওয়ালাইকুম। কে বলছেন?"
"ওয়ালাইকুম আসসালাম। আরশি বলছি।"
কাব্য বিশাল আকারের একটা ধাক্কা খেলো। যে মেয়ে দেখা হলেও প্রয়োজন ছাড়া ওর সাথে কথা বলে না সেই মেয়ে ওকে ফোন করেছে! তার উপর আরশির কাছে ওর নাম্বার থাকার কথা নয়। তিরার কাছ থেকে নিয়েছে হয়তো। বিস্ময় ও কৌতূহল লুকিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
"আরে আরশি! কি ব্যাপার কেমন আছেন?"
"ভালো আছি৷ তবে আমি একটা গন্ডগোল করে ফেলেছি।"
"কী হয়েছে?"
"মাফ করবেন আপনার 'ফ্রিডম এট মিডনাইট' বইটিতে যে বুকমার্কগুলো ছিলো সেখান থেকে একটি বুকমার্ক আমি হারিয়ে ফেলেছি।"
"এটা কোনো ব্যাপার না। ওগুলো শুধুমাত্র সাময়িক মনের ভাব প্রকাশের জন্য লেখা। নিজের হাতের লেখার প্রতি আমার আবার খুব মায়া তাই রেখে দিয়েছি।"
"আইডিয়া টা দারুন।"
"থ্যাংকস। এটা আমার একটা শখ বলতে পারেন।"
"আপনি সত্যি রাগ করেননি তো? আপনার শখের একটা জিনিস হারিয়ে ফেললাম!"
"একদম না। আমার শত শত বইয়ের সবগুলোতেই এরকম বুকমার্ক আছে। শত শত বুকমার্ক লিখেছি। কোথায় কী লিখেছি এখন নিজেরও মনে নেই। সেখান থেকে দু চারটি হারালে কিছুই যাবে আসবে না। নিশ্চয়ই বুকমার্কটি ভালো কিছুর জন্যই হারিয়েছে।"
"মানে?"
"জানেন না যা হয় ভালোর জন্যই হয়?"
"হুম। ঠিকাছে রাখি তাহলে। ভালো থাকবেন।"
"আচ্ছা, আপনিও ভালো থাকবেন।"
ফোন রাখতেই কাব্যর চোখ পড়লো সিগারেটের প্যাকেটের দিকে। ওর মনে হলো প্যাকেট টা বলছে,
"ওরে মুখপোড়া হারামজাদা! আবার যাচ্ছিস ওদিকে!"
কাব্য বিরক্ত হয়ে প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালো। সিগারেটে একটা টান দিয়ে নাম্বারটা সেভ করলো।

কনফিউশন
লেখকঃ মৌরি মরিয়ম
পর্ব ৯
তিরা বেশিরভাগ দিন সকাল ও দুপুরের খাবার একসাথে খায়। আজও হয়েছে তাই। দুপুরে খাওয়ার পর আরশি টেবিল গোছাচ্ছিলো। তিরা বসে বসে মুরগীর হাড্ডি চিবুচ্ছে। আরশি সব গুছিয়ে টেবিল মুছতে মুছতে বললো,
"তিরা আমি বলেছিলাম না তোর কালা চণ্ডীদাস তোর জঘন্যতম চয়েজ?"
"হ্যাঁ। তুই তো সবসময় ওর দোষ ধরার জন্য বসে থাকিস।"
"লোকটা ভয়ঙ্কর সিগারেটখোর, অসভ্যও বটে তবে আজ তার সম্পর্কে একটা অন্য ব্যাপার জানলাম।"
তিরা অতি উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
"কী সেটা?"
"এই লোকটা তোর ক্রাশলিস্টের একমাত্র ব্রিলিয়ান্ট লোক!"
"সত্যি?"
তিরা উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়াতেই হাতের ধাক্কা লেগে প্লেটটা ছিটকে সরে গেলো। হাড্ডিগুলো আরশির সদ্য পরিস্কার করা টেবিলের এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে পড়লো। আরশি চোখ গরম করতেই তিরা বললো,
"আমি সব পরিস্কার করে দেব সোনা। তুই বলনা
কীভাবে বুঝলি চণ্ডীদাস ব্রিলিয়ান্ট? বলনা বলনা।"
আরশি তিরার প্লেটটা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে টেবিলটা আবার মুছতে মুছতে বললো,
"ওইযে বইটা পড়তে এনেছিলাম না?"
"হ্যাঁ।"
"ওটাতে কিছু বুকমার্ক ছিল৷ যেসব পৃষ্ঠায় বুকমার্ক ছিল সেসব চ্যাপ্টার সম্পর্কে তার মতামত ওই বুকমার্ক গুলোতে লিখে রেখেছিলো। আমি ওগুলো দেখে অবাক হয়ে গেছি। অনেক নলেজ আছে তার। আজকালকার ছেলেদের এত উন্নত ভাবনা! এটাও কী সম্ভব?"
একথা বলে আরশি রান্নাঘরে গিয়ে প্লেট ধোয়া শুরু করলো। তিরা প্লেটটা আবার টেবিলে রেখে আরশির পেছন পেছন রান্নাঘরে ঢুকলো। খুশিতে বাকবাকুম করতে করতে বললো,
"তার মানে তুই ফটোশ্যুটে যেতে রাজী?"
আরশি বিরক্ত হয়ে বললো,
"একথা কখন বললাম?"
"বলতে হবে কেন? তুই তো এতদিন কাব্যকে খারাপ বলতি, আজ ভাল বলছিস তার মানে যেতে আপত্তি নেই এটা আমি বুঝে নিয়েছি।"
"আমি আগে তাকে খারাপ বলিনি। বলেছি তাকে আমার পছন্দ না। আর আজও ভালো বলিনি। তার একটা গুণ চোখে পড়েছে সেটাই বলেছি। ভালো মন্দ বিচারের আমি কে?"
"তার মানে যাবি না?"
"না যাবো না। এই বিষয়ে আর কোনো কথা শুনতে চাই না। তোর প্লেটটা আবার কোথায় রাখলি? ওটা নিয়ে আয় ধুয়ে ফেলি।"
তিরা মুখ কালো করে প্লেট আনতে গেলো।
সন্ধ্যাবেলা তিরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাব্যর সাথে ফোনে কথা বলছিলো। আরশি যাতে আর কাব্যকে লোকটা বলতে না পারে তাই কাব্যর আসল বয়সটা জানা দরকার। তাই সে জিজ্ঞেস করলো,
"আচ্ছা কাব্য তোমার বয়স কতো বলো তো?"
"হঠাৎ বয়স জানতে হবে কেন তোমার?"
"আমার লাগবে।"
কাব্যর মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। এতো দিন এমন একটা সুযোগই তো সে খুঁজছিলো। বললো,
"কত আর? আমি কি অত বুড়ো নাকি? এবার ৩৬ হবে মাত্র।"
"কী বলো এতো বয়স তোমার?"
"এ আর এতো কোথায়? পুরুষ মানুষের এই বয়স একটা বয়স হলো? সময়মতো বিয়ে দিলে তোমার বয়সী মেয়ে থাকতো আমার। তাই বলে নাতি নাতনি তো আর থাকতো না।"
"কি বলছো এসব তুমি!"
"কেন কি বললাম?"
তিরা আহত কন্ঠে বললো,
"আমি তোমার মেয়ের বয়সী?"
"হ্যাঁ আমার এক্স গার্লফ্রেন্ডকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিলো। সেই এক্স গার্লফ্রেন্ডের মেয়ের বয়স এখন ১৯ বছর। সেই মেয়েটা তো আমারও হতে পারতো। কিন্তু তখন বাবা রাজী হলো না তাই আর বিয়ে করা হলো না। তোমার বয়স কত?"
"আমার ১৮।"
"আরে তুমি তো আমার মেয়ের থেকেও ছোটো।"
তিরা চমকে উঠে বললো,
"তোমার মেয়ে মানে!"
"মানে এক্স গার্লফ্রেন্ডের মেয়ে।"
"ওহ। আচ্ছা কাব্য সত্যি কথা বলো তো। আমি তোমার বন্ধু নই?"
"হ্যাঁ অবশ্যই। আমি তো আমার মেয়ের সাথে বন্ধুর মতোই মিশি।"
"তোমার মেয়ে?"
"এক্স গার্লফ্রেন্ডের মেয়ের কথা বলছি। তুমিও আমার মেয়ের মতো। তুমিও আমার বন্ধু এজন্যই তো তোমাকে আমি তুমি করে বলার পারমিশন দিয়েছি। এজন্যই তো তোমাকে আমি দুবছরের বাচ্চা বলে ডাকি।"
তিরার মাথা ঘুরছে। সে জিজ্ঞেস করলো,
"তাহলে তুমি মাত্র অনার্সে কেন পড়ো?"
"ওইযে গার্লফ্রেন্ডের বিয়ে হয়ে গেলো? এজন্য দেবদাস হয়েছিলাম বহুবছর। এজন্য পড়াশোনায় গ্যাপ পড়ে গিয়েছিলো। এখন সার্টিফিকেট নেই বলে ভালো বিয়ে হচ্ছে না। এজন্য বাবা মা জোর করে আবার পড়াশোনা শুরু করিয়েছে।"
"ওহ! আচ্ছা এখন তাহলে রাখি। আরু ডাকছে।"
"ঠিকাছে।"
ফোন রেখে কাব্য হেসে ফেললো। আর ওদিকে তিরা ভাবতে লাগলো, কাব্য এসব কী বললো? কাব্যর বয়স ৩৬? তাহলে আরশি ঠিকই ধরেছিল? সে একটা ছেলে নয়, একটা লোক? এবার তিরার খেয়াল হলো কাব্য কখনো তাকে নিজ থেকে মেসেজ দেয়নি, ফোন দেয়নি। সে যেমন আগ্রহ নিয়ে অনেক কথা জিজ্ঞেস করতো কাব্য কখনো তার ব্যাপারে সেসব জিজ্ঞেস করেনি। মেয়ের চোখে দেখতো বলেই এতোদিন ধরে এরকম ছিল তাদের সম্পর্ক! আর সে এতো গাধা এই ব্যাপারটুকু বুঝতে পারলো না! সত্যিই তো মেয়ের চোখে না দেখলে তো আর দুবছরের বাচ্চা বলতো না। ভাগ্যিস তিরা কখনো মুখ ফসকে কাব্যকে ক্রাশ খাওয়ার কথাটা বলে ফেলেনি! গুলিটা একদম কানের পাশ দিয়ে গেছে!
বারান্দা থেকে তিরা যখন ঘরে এলো আরশি তখন চুলে তেল লাগাচ্ছিলো। তিরার গোমড়া মুখ দেখে জিজ্ঞেস করলো,
"কী হয়েছে? হঠাৎ মন খারাপ হয়ে গেল কেন? কোনো খারাপ খবর? কার সাথে কথা বলছিলি?"
তিরা আরশির সামনে বসে ঠোঁট উলটে বললো,
"আরু তোর কি মনে হয় কাব্যর বয়স কত হবে?"
"দ্যাখ ছেলেদের বয়স ধরা মুশকিল। শুকনা পাতলা ছেলেদের বয়স ধরা আরো মুশকিল। কিন্তু একথা জিজ্ঞেস করছিস কেন কী হয়েছে?"
"আমি অনেক বড় একটা ভুল করে ফেলেছি রে। যদিও কেউ জানেনা তবুও নিজের কাছে নিজেরই লজ্জা লাগছে।"
"কী হয়েছে সেটা তো বলবি।"
"ভাগ্যিস আমি কাব্যকে ক্রাশ খাওয়ার কথাটা বলিনি।"
"বললে কী হতো?"
"কেলেঙ্কারি হয়ে যেতো।"
"কীসের কেলেঙ্কারি?"
"কাব্য আমাকে মেয়ের চোখে দেখে। ওইযে দুবছরের বাচ্চা বলে? এজন্যই বলে।"
আরশি অবাক হয়ে বললো,
"কী যা তা বলছিস? মাথা ঠিকাছে তোর?"
তিরা এবার কাব্যর সাথে ওর পুরো কনভার্সেশনটা আরশিকে বললো। সব শুনে আরশি স্থির হয়ে বসে রইলো। তিরা বললো,
"আমি এখন কী করবো?"
"কিছুই করতে হবে না। খুলনা গিয়ে ঘুরে আয়। সব ঠিক হয়ে যাবে।"
"সত্যি?"
"কোচিং এর কেমিস্ট্রি স্যারের কথা ভুলে গেছিস?"
"কোন কোচিং?"
"নাইনে পড়ার সময় আমরা যে স্যারের কাছে কোচিং এ কেমিস্ট্রি পড়তাম? স্যারকে দেখে ক্রাশ খেয়ে ফেললি। স্যারও ভাব জমালো। দুদিন রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলো? তারপর জানলি সে বিবাহিত? তার বৌ এসে তোকে ঝাড়লো!"
"ওহ হ্যাঁ তুই সেই ফালতুটার কথা বলছিস? আমার খেয়াল ছিলো না।"
"তার বেলায়ও সব কথা জানার পর তুই লজ্জায় মরে যাচ্ছিলি। কিন্তু দুদিন পর তো ভুলে গেলি। এটাই স্বাভাবিক। এই লোকটাকেও ভুলে যাবি।"
"সত্যি?"
"হ্যাঁ।"
"আমি কালই খুলনা যাবো। দেখি অনলাইনে টিকিট আছে কিনা।"
"যাওয়ার আগে বইটা ওনাকে ফেরত দিয়ে যাস।"
"কেন তুই বরং ফেরত দিয়ে আরো বই নিয়ে আসিস। এখন তো ছুটিই।"
"কেন বাজারে কি বইয়ের অভাব?"
"তা না।"
"এটা কোথাও পাচ্ছিলাম না৷ ওনার কাছে পেয়ে এনেছি৷ তাই বলে সব বই আনতে হবে কেন?"
"আচ্ছা আমি দিয়ে দেব।"
তিরা অনলাইনে টিকিট খুঁজতে লাগলো।
আরশির মাথা ঝিমঝিম করছে। শরীরটা তিরতির করে কাঁপছে। সন্ধ্যে থেকে বাতি নিভিয়ে শুয়ে আছে সে। সে এতদিন ভেবেছে শুধু তিরা নয় কাব্যও তিরার প্রতি আগ্রহী। কাব্যর প্রথমদিনের চায়ের দাওয়াত থেকে শুরু করে বুয়া খোঁজার ছুঁতোয় দোতলায় আসা, বাজার তুলে দেয়া সবকিছুই তিরার সাথে দেখা করার জন্য করেছে বলে ভেবেছে। কিন্তু আজ সে যে নাটক করলো তা ভাবাচ্ছে আরশিকে। তিরা সহজ সরল মেয়ে, ওকে বোকা বানানো কাব্যর মতো ছেলের কাছে মামুলি ব্যাপার। কিন্তু আরশিকে বোকা বানানো এতো সহজ না। আরশি স্পষ্টই বুঝতে পেরেছে কাব্য সব বানিয়ে বলেছে। তিরা ইদানীং খুব বেশি এগ্রেসিভ হয়ে যাচ্ছিলো কাব্যর প্রতি। হয়তো সে কারণেই কাব্য আজ তাকে এসব আবোলতাবোল বুঝিয়ে দিলো। যাতে তিরা সরে যায়। তার মানে কাব্য তিরার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলো না। কিন্তু তাহলে এতদিন কাব্য কেন এসব করেছে? আরশির জন্য? কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব? তিরাকে রেখে কেউ তাকে কেন পছন্দ হবে? তিরা তার চেয়ে সুন্দরী, স্মার্ট, প্রাণবন্ত। তিরার সঙ্গ যেকোনো মানুষকে আনন্দ দেয়। অপরদিকে সে নিজেকে গুটিয়ে রাখা শামুকের মতো, অনুভূতি প্রকাশ করতে জানেনা, মানুষের সাথে মিশতে জানেনা। দেখতে খারাপ না হলেও তিরার মতো সুন্দরী তো নয়ই বরং কাউকে আকৃষ্ট করার মতো কিছু তার মধ্যে নেই। সেই চেষ্টাও সে কখনো করেনি। আজ পর্যন্ত জোর করেও কেউ তাকে সাজাতে পারেনি। গাঢ় কোনো রঙের জামাও তাকে কেউ পরাতে পারেনি কখনো। সে কখনো পার্লারে যায় না। সে চুল কাটে না, ব্রু প্লাগ করে না। এসবে তার লজ্জা লাগে৷ কলেজ, কোচিং সবখানে বন্ধুরা তাকে আম্মা, দাদী এসব নামে ডাকে। ঠিক বন্ধু নয়, আরশির নিজের কোনো বন্ধু নেই। তিরার বন্ধুরাই আরশির বন্ধু। আরশি যাদের সাথে প্রয়োজন ছাড়া কখনো কথা বলে না। তারাও বলে না। আরশির সঙ্গ তেমন কেউই পছন্দ করে না। কারণ সে বোরিং।
আরশিও নিজেকে উপন্যাসের নায়িকার জায়গায় ভাবতে পারেনি কখনো। বড়জোর নায়িকার বান্ধবী, বোন বা ননদের যে চরিত্র থাকে তার সাথে সে নিজেকে মেলাতে পারে। সাহিল, রশ্নি আর তিরা বাদে এই দুনিয়াতে আর কারো সাথেই কোনো সম্পৃক্ততা নেই আরশির। ১৮ বছর পেরিয়ে গেছে, আজ পর্যন্ত কোনো ছেলে তাকে পছন্দ করেনি। ভালোবাসার কথা বলেনি। রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে বখাটেরাও তার দিকে তাকায় না। অথচ তিরা যেখানেই যায় ভুরি ভুরি প্রোপোজাল পায়। সব ছেলেরা যেমন মেয়েকে সঙ্গী হিসেবে চায় তিরা ঠিক তেমন। সবাই তিরাকে পছন্দ করে। সেই তিরাকে গুটি হিসেবে ব্যবহার করে কাব্য তার সংস্পর্শে আসতে চেয়েছিলো এটা সে কেন যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। কিন্তু যুক্তি তো এটাই বলছে। সবকিছু কেমন অদ্ভুত লাগছে তার।
চলবে...


ভালবাসার কাহিনি গল্প 


কনফিউশন লেখকঃ মৌরি মরিয়ম পর্ব ১০

তিরা খুলনা চলে গেছে এক মাসের বেশি হয়ে গেলো। ভর্তির আগে সম্ভাবত আর আসবে না। সারাদিন আরশির একা একা কাটে। এখন রান্না খাওয়া ছাড়া আর কিছু যেন নেই আরশির জীবনে। ওহ হ্যাঁ আরেকটা কাজ আছে, রশ্নি ও তিরার সাথে ফোনে কথা বলা। কিন্তু কোথাও যেতে উচ্ছে করেনা। পাশেই চাচার বাসা। চাচাতো ভাইবোনেরা আছে তবুও সেখানে যেতে ইচ্ছে করে না। একমাত্র রশ্নির কাছে যেতে তার ভালো লাগে তবুও অন্যের বাসায় যাওয়াতেও তার অস্বস্তি। সেখানে গেলে রশ্নির সাথে ঘরের মধ্যে বসে থাকে। কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না৷ সবাই হয়তো অহংকারী ভাবে। তাই সেখানেও যাওয়া হয় না। নতুন যেসব বই ছিলো সেসবও পড়া শেষ। গতকাল অনলাইনে কিছু বই অর্ডার করেছে যা এখনো এসে পৌঁছোয়নি। বই অবশ্য নীলক্ষেতে গিয়ে কিনে আনা যেতো কিন্তু সে বের হতে চায় না৷ কেন যেন মনে হচ্ছে বের হলেই কাব্যর সামনে পড়তে হবে। এই লোকটার সামনে সে আর কখনো পড়তে চায় না। এমনকি এই কারণে সে গত একমাস ধরে বাজারেও যায় না। যা যা লাগবে সাহিলকে বলে ফেরার সময় নিয়ে আসতে। আরশি জানেনা এভাবে কতদিন আড়ালে থাকতে পারবে। একই বাসায় যখন থাকে কোনো না কোনোদিন তো দেখা হয়েই যাবে৷ তখন কী হবে? কীভাবে মুখোমুখি হবে তার? তার চেয়ে দেখা না হোক। আরশি একদম চায় না দেখা হোক!
দুপুরে রান্না করছিলো আরশি। আজ সাহিল সন্ধ্যেবেলায় ওকে নিয়ে রশ্নির কাছে যাবে। যাওয়ার সময় আরশি রশ্নির জন্য তার প্রিয় কিছু খাবার নিয়ে যাবে। এজন্যই এতো আয়োজন। রান্নার মাঝেই বেল বেজে উঠলো। এই অসময়ে আবার কে এলো! আরশি বারান্দা দিয়ে তাকিয়ে দেখে যে বইগুলো অর্ডার করেছিলো সেগুলো এসে গেছে। ডেলিভারি ম্যানকে দাঁড়াতে বলে ভেতরে এসে চুলা নিভিয়ে টাকা নিয়ে নিচে নামলো।
দোতলার বেলের আওয়াজ শুনেই কাব্য দরজা খুলে বের হলো। বের হওয়ার সময় ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বের হলো। ভানটা এমন করতে হবে যে সে বাইরে থেকে এসেছে। আরশি নিচে নামার আগেই কাব্য মূল ফটকের তালা খুলে দাঁড়িয়ে রইলো। গত একটা মাস কাব্য যতক্ষণ বাসায় ছিলো ততক্ষণই খেয়াল রেখেছে কখন দোতলার বেল বাজে। না এবাড়িতে সাহিল ছাড়া কেউ আসে! আর না আরশি বাসা থেকে বের হয়! এই এক মাসে একটা বারও আরশিকে দেখতে পায়নি সে। একদিন কাব্য বাসা ভাড়া দিতে গেলো। সাহিল তাকে ড্রয়িং রুমে বসিয়ে অনেকক্ষণ গল্প করলো। দুজন একসাথে বসে একটা ক্রিকেট ম্যাচের কিছু অংশও দেখলো কিন্তু আরশির সাথে দেখা হলো না। একবার গলার আওয়াজ শুনলো শুধু। আরশি সাহিলকে ডাকলো, সাহিল ভেতরে গিয়ে চা নাস্তা নিয়ে এলো। আরশিকে না দেখতে পেয়ে যে কাব্য মরে যাচ্ছে ব্যাপারটা এমন নয়। কিন্তু না দেখতে পেয়ে চোখের তৃষ্ণা বেড়েই চলেছে তাই বারবার তার চোখ খুঁজে ফিরেছে আরশিকে।
কাব্য যখন ডেলিভারি ম্যানের হাত থেকে বইয়ের কার্টুন টা হাতে নিয়ে ইনভয়েসে দেখছিল আরশি কি কি বই অর্ডার করেছে তখন আরশি এলো। কাব্যকে দেখেই কেমন একটা অস্বস্তি শুরু হয়ে গেলো তার ভেতরে। সে খুব করে চাইছে যেন সে স্বাভাবিক থাকতে পারে। আরশি ডেলিভারি ম্যানকে বললো,
"কত হয়েছে?"
"৯৩৯০। ম্যাম সরি 'গড অফ স্মল থিংস' বইটি দিতে পারিনি। একদম শেষ মুহুর্তে প্যাকিং এর সময় দেখি বইয়ের ভেতর একটা পাতা ছেঁড়া। এই মুহুর্তে আমাদের স্টকে বইটি নেই৷ আবার স্টক করলে আমরা যোগাযোগ করব।"
"ঠিকাছে।"
আরশি ডেলিভারি ম্যানকে ৯৫০০ টাকা দিলো। ডেলিভারি ম্যান বললো,
"চেঞ্জ নেই ম্যাম?"
"লাগবে না রেখে দিন।"
ডেলিভারি ম্যান চলে যেতেই আরশি গেটে তালা দিচ্ছিলো। এতক্ষণ পর্যন্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে আরশিকে দেখছিলো কাব্য। আজও সে এলোমেলো, কোঁচকানো সুতির জামা আর আধ কোঁকড়া চুল হাতখোপায় বাঁধা। ঘেমে-নেয়ে একাকার! ফরসা মুখ লাল হয়ে আছে। রান্না করছিলো বোধহয়। আরশি সবসময় থাকেই এমন যে দেখলেই ঘরের কেউ ঘরের কেউ অনুভূতি হয়। এতো মায়া কারো মুখে থাকে কী করে? কাব্যর চোখের তৃষ্ণা মিটেছে, মিলেছে মনের শান্তিও। এক মাস না দেখার অভাব যেন এক দেখাতেই পূরণ হয়ে গেলো। আরশি তালা দিয়ে ফিরে তাকাতেই কাব্য এবার কার্টুনের ইনভয়েসের দিকে তাকিয়ে বললো,
"গুড চয়েজ! বাই দ্যা ওয়ে 'গড অফ স্মল থিংস' বইটি আমার কাছে আছে। আপনি বরং নিয়ে পড়ুন।"
আরশি স্বাভাবিকভাবেই বললো,
"না থাক। আগে যেগুলো নিয়েছি সেগুলো পড়ে নিই। তাছাড়া বইটি আমি আমার কালেকশনে রাখতে চাই।"
"আচ্ছা।"
আরশি কার্টুনটার দিকে হাত বাড়াতেই কাব্য বললো,
"বইগুলো অনেক ভারী। আমি উপরে তুলে দেই?"
"থ্যাংকস, আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমিই পারবো।"
"আমি নিয়ে দিলে খুব কি ক্ষতি হয়ে যাবে?"
"আমি নিজের কাজ নিজে করতেই পছন্দ করি আঙ্কেল।"
কাব্যর মুখটা হা হয়ে গেলো। অবাক হয়ে বললো,
"হোয়াট! আমি আঙ্কেল?"
আরশি মুখটা স্বাভাবিক রেখে বললো,
"আপনি তিরার বাবার মতো হলে আমার তো আঙ্কেলই হবেন তাইনা?"
"ওয়েট ওয়েট!"
কাব্য বড় একটা নিশ্বাস নিয়ে বললো,
"শুনুন তিরা আমার সাথে কথা বলতো আমিও বলতাম। আমি প্রতিবেশি হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই ওর সাথে মিশতাম। বন্ধুত্বপূর্ণ একটা সম্পর্ক ছিলো। সেই বন্ধুত্বও তিরাই চেয়েছিলো। আমার দিক থেকে ব্যস এটুকুই। কিন্তু তিরা খুব দ্রুত আমার উপর ফল করছিলো। ও যে পরিমাণ ফাস্ট যেকোনো সময় আমাকে প্রোপোজ করে দিতো। এবং তখন না করা ছাড়া আমার কোনো উপায় থাকতো না। তখন কষ্ট কে পেতো? আমি? কষ্টটা তখন তিরা পেতো। ও যাতে সিরিয়াস হয়ে অনেকদূর এগিয়ে পরে কষ্ট না পায় সেজন্য কিছু মিথ্যে বলে আমি ওকে বুঝিয়ে দিয়েছি যে ওর সাথে বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি কিছু সম্ভব না। যখন কাউকে গ্রহণ না করা যায় তখন তাকে ভালোবাসার কথা বলার সুযোগই দিতে নেই।"
"বাহ! আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাকে এতো দারুন একটা জিনিস শেখাবার জন্য!"
আবারও অবাক কাব্য,
"আমি কী শেখালাম?"
"এইযে শেখালেন যখন কাউকে গ্রহণ না করা যায় তখন তাকে ভালোবাসার কথা বলার সুযোগই দিতে নেই। আমি ভালোবাসার ব্যাপারে একদমই অনভিজ্ঞ। এটা হয়তো ভবিষ্যতে আমার কাজে লাগবে!"
আরশি বইয়ের কার্টুন টা কাব্যর হাত থেকে নিয়ে সিঁড়ির দিকে চলে গেলো। কাব্য বিস্ময়ে সেখানেই স্থির হয়ে গেলো। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো এই অসম্ভব বুদ্ধিমতী মেয়েটির দিকে।

SHARE

Author: verified_user